kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

সুমাত্রা দ্বীপের ওরাংওটাং

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৯:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুমাত্রা দ্বীপের ওরাংওটাং

ওরাংওটাং দেখতে গিয়েছিলাম ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে। পৃথিবীতে দুই জায়গায় বন্য ওরাংওটাং দেখা যায়। এর মধ্যে সুমাত্রা একটি। সুমাত্রান ওরাংওটাং দেখতে প্রতিদিনই  ইন্দোনেশিয়া আসেন প্রচুর বিদেশি পর্যটক।

দ্বীপ দেশ ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের একটা ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের। ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে এখন বাংলাদেশিদের ভিসার প্রয়োজন হয় না তাই এ সুযোগটা নিলাম। জার্মানি থেকে থাইল্যান্ড হয়ে এয়ার এশিয়া বিমানে চড়ে ইন্দোনেশিয়ার কুয়ালানামু বিমানবন্দরে নামি। উত্তর সুমাত্রার মেদান শহর থেকে ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরে কুয়ালানামু বিমানবন্দর। লোকাল বাসে চেপে আসি মেদান শহরে। 

মেদান শহরে একদিন যাত্রা বিরতি শেষে আমরা রওনা হই বুকিত লাওয়াং গ্রামের উদ্দেশ্যে। পাকা-আধাপাকা রাস্তা  পেরিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে চললো আমাদের গাড়ি। যেতে যেতে সড়কের দুই পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে সারিসারি পামতেল গাছের বাগান দেখতে পেলাম। এ ছিলো দারুণ দৃশ্য।

ধুলোউড়া সড়ক পথ অতিক্রম করে আমরা পৌঁছে যাই বুকিত লাওয়াং গ্রামে। সুমাত্রান ওরাংওটাং এর বাড়ি বলা হয় এই গ্রামকে।একদম জঙ্গল ঘেষে পড়েছে এই গ্রামটি। পাহাড়ি জঙ্গল থেকে নেমে আসা নদী বয়ে গেছে গ্রামের মাঝ দিয়ে। বহু পহাড়ি ঝরনা ধারা এসে মিশেছে এখানে। নদীর দুই পাড়ে বুকিত লাওয়াং গ্রাম। ওরাংওটাং দেখতে আসা বিদেশি পর্যটকরা এই গ্রামেই থাকেন। বেশ কিছু হোটেল-রিসোর্ট ও খাবারের রেস্তোরাঁ ঘরে উঠেছে এখানে বিদেশি পর্যটকদের প্রয়োজনে। 

যারা দুই-তিনদিন বা তারও বেশি দিনের জন্য জঙ্গলট্যুর বুক করেন তাদেরকে বনেই রাত্রি যাপন করতে হয়। লম্বা ট্যুরে খরচও অনেক  বেশি। আমাদের জঙ্গলে রাত যাপনের ইচ্ছা নেই। সাপের ভয়ে। সুমাত্রান অজগর সাপ নাকি আস্ত মানুষ খেয়ে ফেলে। ট্যুর গাইড বললো, সুমাত্রান অজগর লম্বায় তিরিশ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ওরাংওটাং দেখার উদ্দেশ্যে আমরা সকাল সকাল রওনা হলাম বনে। আমরা বুক করেছিলাম ছোট ট্যুর। তিন চার ঘণ্টার মতো লাগবে ফিরতে। যদিও গাইড বলেছে ওরাংওটাং এর দেখা না পাওয়া পর্যন্ত ফিরব না। উত্তর সুমাত্রা ও আচেহ প্রদেশের মধ্যবর্তী জায়গায় একটি বিশাল বন। আয়তন ৭ হাজার ৯২৭ কিলোমিটার। নাম মাউন্ট গুনুং লেউসার ন্যাশনাল পার্ক। পুরো বনকে সুমাত্রা ও আচেহ প্রদেশের জাতীয় পার্ক হিসেবে ধরা হয়। ২০০৪ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত দেয় এই বনকে। 

চলছি আমরা সুমাত্রার বনে। বন্য ওরাংওটাং দেখব বলে। গাইড দুইজন । আমাদের সামনে  একজন। পেছনে আরেকজন। আমরা হাঁটছি মাঝে। আমার সঙ্গীর সাপের ভয়। সাপ যেন সামনে না পড়ে, কোনো সাপের যেনো দেখা না পাই, মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম। কারণ, সাপ দেখলে ফিরতে হবে নিশ্চিত। জীবনে এর আগে কখনও যাইনি এমন জঙ্গলে। মনে স্বাভাবিক একটু ভয়তো থাকবেই। চলতে চলতে অনেকবার থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। গাইড বললো, সামনে বন্য শূকরের দল,  হামলা করতে পারে ওরা। অনেকসমতো গাইড বলতেও চায়নি, কেমন হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা। সুমাত্রান চিতাবাঘ, সুমাত্রান টাইগার, কি নেই এই বনে!

বনের গভীরে কিছু বিপদজনক জায়গা আছে সেখানে পৌঁছুলে খুব সতর্কতার সাথে সে পথ অতিক্রম করতে হয়েছে আমাদের। আমাদের গাইড দুজনই ছিলেন অভিজ্ঞ। এর মধ্যে একজন তিরিশ বছর ধরে বনে গাইডের কাজ করেন। গাইডরা ব্যাগ ভর্তি করে কলা ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল নিয়ে গিয়েছিলেন। কিছু আক্রমণাত্মক বানর আছে বনে। এদের আক্রমণে পড়লে ফলমূল দিলে ছাড়া পাওয়া যায়।

রয়েছে আক্রমণাত্মক ওরাংওটাংও। কেউ কেউ ওরাংওটাংকে বানর জাতীয় বলে থাকেন। কোথায় পিচ্চি বানর, আর কোথায় ওরাংওটাং। ওদের সাতানব্বই ভাগ ডিএনএ মানুষের মতো। বলা হয় ওরাংওটাং সাতানব্বই ভাগ মানুষের মতো। শক্তিতে মানুষের চেয়ে সাত গুণ বেশি। মানুষ যা করে তা দেখে তাড়াতাড়ি শিখে ফেলতে পারে। মানুষের কাজকর্ম খুব নকল করতে পারে ওরা। সুমাত্রান ওরাংওটাং লম্বায় চার ফুট পর্যন্ত হয়।  কাছে থেকে ওরাংওটাং এর ছবি তুলতে চেষ্টা করছিলাম। গাইড বললো, এতো কাছে না যেতে। মানুষকে নিয়ে গাছের আগায় চড়ার মতো শক্তি রাখে ওরা। একবার এক পর্যটককে নাকি টেনে নিয়েছিল গভীর বনে।
 
আধা বন্য অনেক ওরাংওটাং রয়েছে এই বনে। এর মধ্যে এক ওরাংওটাং এর নাম মিনা। মিনার তিনটি বাচ্চা আছে। মিনা একটি আক্রমণাত্মক ওরাংওটাং। মিনা সম্পর্কে আমরা সেখানে পৌঁছার আগেই পড়েছিলাম, আশা করেছিলাম মিনার সঙ্গে দেখা না হওয়ার। কিন্তু যা আশা করেছিলামনা তাই ঘটল। মধ্যবনে মিনার আক্রমণে পড়তে হলো আমাদের, ভাগ্যিস আমাদের গাইডরা ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ। মিনা আক্রমণ করলে সহজে ছাড়েনা। যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি সঙ্গে থাকা সব খাবার দিয়ে দেবেন। একেবারে বন্য যেসব ওরাংওটাং রয়েছে ওরা কাছে আসেনা। নিছে নামেনা। ওরা তাকে দূরে দূরে। গাছের উপরে। 

১৯৭২ সালের আগের সময়ে সুমাত্রানরা বন থেকে ওরাংওটাং এর বাচ্চাদের খুব ধরতো। বনের ওরাংওটাং তখন পরিণত হয় মানুষের পোষা প্রাণীতে। কেউ কেউ এদের বিক্রি ও পাচার করে দেয় বিভিন্ন দেশে। ধরাধরি অনেক বেড়ে গেলে পরে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। শুরু হয় মানুষের কাছ থেকে ওরাংওটাং উদ্ধারের কাজ। বনের প্রাণীদের বনে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন মানুষের সাথে বসবাসের কারণে বনজীবন সম্পর্কে এসব ওরাংওটাং এর ছিলনা কোনোই ধারনা। কিভাবে বনে বেঁচে থাকতে হয়, কিভাবে গাছে চড়তে হয়, কিভাবে বনে খাদ্য সংগ্রহ করতে হয়,এসবের কিছুই জানা ছিলনা উদ্ধার হওয়া এসব ওরাংওটাং এর। 

১৯৭২ সালে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক একটি সংগঠনের উদ্যোগে সুমাত্রায় খোলা হয় দুইটা ওরাংওটাং পূর্ণবাসন কেন্দ্র। যার একটি ছিল বুকিত লাওয়াংয়ে। মানুষের কাছে থেকে ওরাংওটাং উদ্ধারের পর গাছে চড়া, বনে খাবার সংগ্রহ করাসহ নানান বিষয়ে ওরাংওটাংদের প্রশিক্ষণ দিতেন বনরক্ষীরা এসব পূর্ণবাসন কেন্দ্রে। আর তখন থেকেই বুকিত লাওয়াং গ্রামটি পরিচিত পেয়ে যায় সারা পৃথিবীতে।

২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় ওরাংওটাং পূর্ণবাসন কেন্দ্র। সুমাত্রার বনে এখন ৭ হাজার ৫শ'টির মতো ওরাংওটাং রয়েছে। বন গবেষকদের ধারণা, একদিন হারিয়ে যাবে ওরাংওটাং পৃথিবী থেকে। 

 

লেখক : নাঈম হাবিব,  জার্মানি প্রবাসী বাংলাদেশি।

(প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা