kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

সেবার সেবা

ব্যস্ততার কারণে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে নাগরিক জীবনের লাইফস্টাইল। সময় করে গাড়ির চালক, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, কাজের বুয়া কিংবা ক্লিনার খোঁজার সময় কোথায়? আর এসব যদি একটি অ্যাপের মধ্যে পাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। সে রকম একটি সেবা দিয়ে যাচ্ছে অনলাইন সার্ভিস মার্কেট ‘সেবা এক্সওয়াইজেড’। জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সেবার সেবা

প্রায় এক যুগ টেলিযোগাযোগ খাতে কাজ করেছেন আদনান ইমতিয়াজ হালিম। সেই সূত্রে বাংলাদেশের প্রযুক্তিক্ষেত্র সম্পর্কে ভালোই জানাশোনা। টেলিযোগাযোগ খাতে কাজ করলেও দেশে ডিজিটাল পরিষেবা নিয়ে কাজ করার জন্য মনে মনে বেশ আগ্রহী ছিলেন। অবশেষে ২০১৫ সালে শুরুই করে দেন ‘সেবা ডটএক্সওয়াইজেড’। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে পরিষেবা দেওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু করছিলাম সেবা ডটএক্সওয়াইজেডের কার্যক্রম। আর এটির শুরু দীর্ঘদিনের বাজার গবেষণা থেকে। যেকোনো পণ্য বা সেবা বাজারে আনার আগে সেটি মানুষ কিভাবে গ্রহণ করতে চায়, তাদের চাহিদা এবং সেটা তার জীবনকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে বা সহজ করতে পারে, সেটা জানা খুব দরকার। তাই সেবা ডটএক্সওয়াইজেড বাজারে আসতে যতটা সময় নিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বাজার গবেষণা করেছে।’

বাজারে কাজ শুরু করলেও প্রথমেই সবার কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি সেবার। তাই নিজেদের আত্মীয়-স্বজন,   বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে এই পরিষেবা দিয়ে তাদের মনোভাব ও অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেছে সেবা।

এই সময়ই ২০১৬ সালে মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন চালু করে তাদের স্টার্টআপ প্রগ্রাম। সাড়ে তিন শ আবেদনপত্র জমা পড়ে। প্রথমবারই সেরা পাঁচে জায়গা করে নেয় সেবা ডটএক্সওয়াইজেড।

তারপর শুধু নিজেদের উদ্যোগকে বড় করার দিকেই মনোযোগী হয় সেবা। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের আগস্টের মধ্যেই সেবা এক হাজার অর্ডার নেওয়ার মাইলফলকে পৌঁছে যায়।

শুরুর চ্যালেঞ্জ

শুরুটা হয় বাসাবাড়ির কিছু সার্ভিস দেওয়ার মাধ্যমে। এর মধ্যে ছিল ইলেকট্রিক কাজ, এসি, প্লাম্বিং, ক্লিনিং প্রভৃতি। কিন্তু প্রথম যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় সেটি হচ্ছে, এসব কাজের জন্য নিবেদিত কর্মী কিভাবে পাওয়া যাবে? কারা সবার আগে ‘সেবা’র কাজটি করে দেবে? এসব নিয়ে খুব বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল বলেও জানান আদনান ইমতিয়াজ, ‘সে সময় ভয় ছিল, আমাদের লোকবল কম, যারা সেবাগুলো নিশ্চিত করবে, সেই টেকনিশিয়ান বা কারিগররা এটা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করবে, সেটাও ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।’

সেবার প্রথম গ্রাহক হয় গ্রামীণফোন। গ্রাহক হিসেবে এটির কর্মী এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই তাদের সঙ্গে চুক্তি করে। এরপর গ্রামীণফোনের জিপি হাউসে এক বছর অফিস চালানোর সুযোগ পায় প্রতিষ্ঠানটি।

পরিষেবা মিলবে অ্যাপ ও ওয়েবে

মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ সেবার পরিষেবাগুলো নিতে পারবেন। অ্যাপের মাধ্যমে পরিষেবা নিতে হলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকা সাপেক্ষে প্রথমে গুগল প্লেস্টোর (http://bit.ly/2vMou66) বা অ্যাপলের অ্যাপস্টোর (https://apple.co/2Jr06in) থেকে মোবাইল অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। পরে অ্যাপে নাম, ঠিকানা দিয়ে লগইন করতে হবে।

এ সময় ব্যবহারকারীর ডিভাইসের লোকেশনও চাইবে অ্যাপটি। সেটাতে সম্মতি দিলে সহজেই সেবার পরিষেবা পৌঁছে যাবে। অ্যানড্রয়েড ও আইওএস মিলিয়ে আড়াই লাখেরও বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে সেবার অ্যাপ। আর ওয়েবসাইটের (www.sheba.xyz) মাধ্যমে সেবা নিতে হলে কোন ধরনের পরিষেবা নিতে চান সেটি নির্ধারণ করতে হবে।

এরপর তার লোকেশন ও ঠিকানা দিলে সেখানে পৌঁছে যাবে সেবা দেওয়ার লোকজন।

এসবের বাইরেও দুটি অ্যাপ রয়েছে সেবা ডটএক্সওয়াইজেডের। এর একটি রেফারেন্স অ্যাপ সেবা বন্ধু, আরেকটি সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন মার্চেন্ট বা ইলেকট্রিশিয়ানসহ অন্য উদ্যোক্তাদের জন্য, যেখানে সব কিছুই অ্যাপের মাধ্যমে জানতে পারেন ওই সব উদ্যোক্তা।

কী আছে সেবার অ্যাপে

অ্যাপ ডাউনলোড করে সেটি ওপেন করলে সেবার সব পরিষেবার তালিকা দেখা যাবে অ্যাপে। সেই তালিকা অনুসারে সেসব সার্ভিস নিতে পারবেন গ্রাহকরা। অ্যাপে রয়েছে ব্যবহারকারীর নামে একটি অ্যাকাউন্ট, যেখানে ওপরের বাঁ দিকে রয়েছে মেন্যুবার। সেখানে ট্যাপ করলে দেখা যাবে বিভিন্ন সেবার অর্ডার, ছাড় পেতে প্রোমো কোড ব্যবহারের সুবিধা, ফ্রি সার্ভিসসমূহ, নোটিফিকেশন দেখার সুবিধা, বিভিন্ন অফারের তালিকা।

মোবাইলে অ্যাপটি ব্যবহার করার সময় একেবারে নিচের দিকে দেখা যাবে হোম, অর্ডার, ক্রেডিট ও হেল্প মেন্যু। হোম মেন্যুতে রয়েছে ‘সেবা’র সব পরিষেবার তালিকা। সেসব পরিষেবা নিতে হলে ক্লিক করতে হবে অর্ডার মেন্যুতে। আর যেকোনো সহায়তার জন্য হেল্প মেন্যুতে ক্লিক করে কাস্টমার কেয়ারে কথা বলা বা চ্যাট করা যাবে। সেখানে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া সম্ভব।

সেবার যত পরিষেবা

সেবা ডটএক্সওয়াইজেড মূলত ঘর-গৃহস্থালির কাজের সব ধরনের পরিষেবা দিয়ে থাকে। তবে সেবা ডটএক্সওয়াইজেডের পরিষেবা বাসাবাড়ি ছাড়াও করপোরেট অফিসের জন্য দেওয়া হয়। করপোরেট সাইটে রয়েছে ডিজিটাল সিকিউরিটি সার্ভিস, অফিস শিফট, লিফট অ্যান্ড জেনারেটর সার্ভিস, অফিস ক্লিনিং, আইটি অ্যান্ড গ্যাজেট সার্ভিস। এ ছাড়া রয়েছে অন ডিমান্ড গাড়ি সার্ভিস, কার ওয়াশের মতো পরিষেবাও।

বাসাবাড়ির জন্য এয়ারকন্ডিশন সার্ভিস, ইলেকট্রিক অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস, প্লাম্বিং ও স্যানিটারি, ফার্নিচার তৈরি ও মেরামত, ওয়াল পেইন্টিং, বাসাবাড়ি পরিষ্কারসহ বেশ কিছু সার্ভিস দিয়ে থাকে সেবা ডটএক্সওয়াইজেড। এসব সার্ভিস ছাড়াও কিছু ট্রেন্ডিং সেবা চালু করেছে তারা। এসবের মধ্যে আছে বিউটি সার্ভিস, অন ডিমান্ড গাড়ি, অন ডিমান্ড ড্রাইভার, ক্লিনিং, লন্ড্রি সার্ভিস।

আছে সরকারি পরিষেবাও

ওপরের সব ধরনের পরিষেবা ছাড়াও সেবার অ্যাপে পাওয়া যাবে সরকারের ১৫০ ধরনের সেবা। এসব সরকারি পরিষেবা সেবা ডটএক্সওয়াইজেড দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন বা এটুআইয়ের সঙ্গে মিলে। এসবের মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-টিন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, হজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাপ্লিকেশন, জন্ম নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা। সেবা এক্সওয়াইজেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ইলমুল হক সজীব বলেন, ‘দেশের প্রতিটি মানুষ যেন তাদের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাসমূহ নির্ঝঞ্ঝাটে পেতে পারে, তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

যেভাবে কাজ করে সেবা

সেবা ডটএক্সওয়াইজেডের কাছ থেকে কোনো সার্ভিস নিতে গেলে অবশ্যই মোবাইল অ্যাপ বা সাইটের মাধ্যমে অর্ডার দিতে হবে। এরপর সেবা ডটএক্সওয়াইজেড সেই অর্ডারটি কনফার্ম করবে সেবাগ্রহীতাকে। এরপর তাঁর বাসা বা অফিসের ঠিকানায় একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লোক পৌঁছে যাবে সেবার পক্ষ থেকে। সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে নগদ অর্থে অথবা বিকাশ, রকেটের মাধ্যমেও বিল পরিশোধ করতে পারবেন সেবাগ্রহীতা।

আয় করতে পারে শিক্ষার্থীরাও

আদনান ইমতিয়াজ জানান, তাঁদের সাধারণ অ্যাপের পাশাপাশি রয়েছে ‘সেবা বন্ধু’। এই অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই অর্থ আয় করতে পারবেন।

ধরুন, কেউ কোনো একটি সার্ভিস নেওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে বা কোথাও পোস্ট করলেন যে আমার বাসায় এসি নষ্ট, আমি কিভাবে অনলাইনের মাধ্যমে ইলেকট্রিশিয়ানের খোঁজ পাব? সে সময় কোনো শিক্ষার্থী যদি ওই ব্যক্তিকে সেবা বন্ধু অ্যাপ ব্যবহার করে সেবা ডটএক্সওয়াইজেডের রেফারেন্স দেয়, তাহলে কাজটি করার পর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে কমিশন পাবে শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে সেবা বন্ধু অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৬ হাজার।

নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা ১৬ হাজার

সেবা থেকে যেসব পরিষেবা দেওয়া হয় তার জন্য কাজ করেন অনেক কর্মী। যাঁরা কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের টেকনিশিয়ান বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারী। বর্তমানে সেবা ডটএক্সওয়াইজেডে এমন নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা রয়েছে ১৬ হাজারের বেশি। অর্ধশতাধিক কম্পানির অধীনে এসব কর্মী কাজ করেন সেবার পরিষেবা দিতে।

লক্ষ্য উদ্যোক্তা তৈরি

দেশের সব জেলায় উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য সেবা ডটএক্সওয়াইজেড অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিটি জেলা শহরে তাদের কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করবে। শুধু তা-ই নয়, ঢাকার অভ্যন্তরে নারীদের উদ্যোক্তা তৈরিতে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণও। এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে সেবা। এখন ঢাকা শহরের ভেতরে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নারী সেবার মাধ্যমে বিউটিশিয়ান, ঘরে বসেই খাবার তৈরি করে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

আদনান ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে সেবার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তাসহ অন্তত ২০ লাখ মানুষ যাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। আর ২০২০ সালের মধ্যে ১০ লাখ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চাই।’

অর্জনের ঝুলিতে যা কিছু

পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগ নিয়ে অনেক কিছুই এখন পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে সেবা ডটএক্সওয়াইজেড। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ও তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড, দৈনিক পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের স্টার্টআপ অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কিছু পুরস্কার নিজেদের ঝুলিতে ভরেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা