kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

অনেক হয়েছে মোবাইল দেখা!

ক্ষতিকর জেনেও অভিভাবকরাই মোবাইল তুলে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে। স্ক্রিন টাইম দীর্ঘ হওয়ায় শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি। কিভাবে এসব থেকে নিরাপদ থাকা যাবে? জানাচ্ছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



অনেক হয়েছে মোবাইল দেখা!

মডেল : প্রতিতি ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

স্ক্রিন টাইম, এই সময়ের আলোচিত একটি বিষয়। শিশু, বড় সবাই বিভিন্ন ডিভাইসের পর্দার সঙ্গে আটকে থাকছে। তবে এটা বড়দের চেয়ে শিশুদের ক্ষতি করছে বেশি এবং সেটা দীর্ঘমেয়াদি। শিশুদের বেড়ে ওঠার ওপর টেলিভিশন ও মোবাইলের পর্দার অতি ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নির্ণয় করতে তাই শুরু হয়েছে গবেষণা।

শিশুদের স্ক্রিন টাইমের ক্ষতি নিয়ে চালানো এক গবেষণায় অংশ নিয়েছিল ১১ হাজার শিশু। এটির প্রাক ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব শিশু দৈনিক শুধু দুই ঘণ্টা সময় পর্দার সামনে ব্যয় করে তারা কয়েক ধরনের পরীক্ষায় খারাপ করছে।

বিশেষ করে যেসব পরীক্ষা চিন্তা ও ভাষাকেন্দ্রিক। ভার্চুয়াল ও বাস্তবের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করতেও তাদের বেশ কষ্ট হয়।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডা. দিমিত্রি ক্রিস্টাকিসের মতে, শিশুরা পর্দার দ্বিমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে বাস্তব ত্রিমাত্রিক জীবনে লাগাতে পারে না। তিনি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে স্ক্রিন টাইম গাইডলাইন প্রণয়ন করেন।

তিনি বলেন, যদি একটি শিশুকে ভার্চুয়াল লেগো খেলা শেখান সেটি বাস্তব লেগো খেলায় কোনো কাজে আসে না। কারণ শিশুরা এর ফারাক বুঝতে পারে না।

 

খাওয়ার সময় মোবাইল নয়!

অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চারা টিভি দেখছে অথবা মোবাইল টিপছে আর খাচ্ছে। টিভি শো শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়তো খেয়েই চলেছে অথবা একেবারে খাচ্ছেই না। আপাতদৃষ্টিতে অভ্যাসটা খুব নিরীহ মনে হলেও এর ফলাফল মোটেও তেমন নয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ টেলিভিশন, ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনের ব্যবহারের সঙ্গে স্থূলতার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে সুস্থভাবে শিশুদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে থাকে ‘চিলড্রেন অ্যান্ড স্ক্রিনস’ নামের একটি সংস্থা। তাদের সূত্র থেকে জানা যায়, স্ক্রিনের সামনে থাকলে খুব স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক পরিশ্রম হয় না। বরং এসব ব্যবহারের সময় অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া, বিভিন্ন লোভনীয় খাবারের বিজ্ঞাপনের প্রভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি ঝোঁক এবং ঘুমের সমস্যা সৃষ্টির ফলে খাবারের রুটিনে গোলযোগ হয়। আর এতে করে শিশুরা মুটিয়ে যায়। অন্যদিকে পরিসংখ্যানও কিন্তু খুব ভয়ানক পরিস্থিতির জানান দিচ্ছে। ‘জার্নাল অব পেডিয়াট্রিকস’ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে কাটালে স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৭৮ শতাংশ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. এরিকা কেনির মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলে। তিনি মনে করেন, শুধু টেলিভিশন নয়, অন্যান্য স্ক্রিন ডিভাইসও ব্যবহারকারীদের স্থূলতার দিকে ঠেলে দেয়। বিবিসি থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের প্রধান চারজন মেডিক্যাল কর্মকর্তা খাওয়ার টেবিলে মোবাইল রাখার অভ্যাস একেবারেই বাদ দিতে বলেছেন।

 

ঘুমের সময়ও মোবাইল থাকুক দূরে!

খাওয়ার সময় মোবাইলের অনধিকার প্রবেশের মতো অনেক শিশুর বিছানায়ও মোবাইলসহ বিভিন্ন ডিভাইসের প্রবেশাধিকার থাকে। ‘দ্য আটলান্টিক.কম’ থেকে জানা যায়, স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট ঘুমাতে সমস্যা করে। কেননা এগুলোর স্ক্রিন থেকে নীল আলো নিঃসরণ করে। অক্ষিগোলকের পেছনের বিশেষ কোষ এই আলো গ্রহণ করে মস্তিষ্ককে সকাল হয়ে গেছে বলে বার্তা দেয়! চিন্তা করুন কী সাংঘাতিক এক ব্যাপার! এ ক্ষেত্রে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি উল্লেখযোগ্য। সেখানকার গবেষকরা মানুষের ঘুমের ওপর নীল আলো এবং সমান সময় উজ্জ্বল সবুজ আলোর প্রভাব লক্ষ্য করেন। সেই গবেষণায় দেখা যায় যে সেই নীল আলো ঘুমের সময় তিন ঘণ্টা পিছিয়ে দেয় আর উজ্জ্বল সবুজ আলো পিছিয়ে দেয় প্রায় দেড় ঘণ্টা। ঘুমের সময় তিন ঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়া কিন্তু মারাত্মক ব্যাপার। সাম্প্রতিককালে ম্যাসাচুসেটসের চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে পেডিয়াট্রিকসে, সেখানে বলা হয় যেসব শিশু স্মার্টফোনের ছোট স্ক্রিনে বেশিক্ষণ চোখ রাখে তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম হয় না। শুধু তা-ই নয়, কিছু ডিভাইসের সাউন্ড অ্যালার্টও আপনার শিশুর ঘুমের ব্যাপক ক্ষতি করে। অনেক সময় অ্যালার্মের অজুহাতেও বিছানায় মোবাইল থেকে যায়। তাই অ্যালার্ম ক্লক হিসেবে কখনোই ফোন ব্যবহার করবেন না। এর জন্য আপনার সন্তানকে আলাদা একটা অ্যালার্ম ঘড়ি কিনে দিন। জমা নিন সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তা ছাড়া শোয়ার ঘরে কখনোই টিভি ঠাঁই দেবেন না। এর বদলে তার বয়সের উপযোগী বই কিনে দিতে পারেন। এতে তার বিনোদনের অভাব ঘুচে যাবে এবং কল্পনাশক্তিও বৃদ্ধি পাবে।

 

বাকিটা সময়?

স্মার্টফোন, টিভি ব্যবহারের বাইরের সময়টাও কিভাবে সামাল দিতে হবে তা জানাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) একটি চলমান গবেষণার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা শিশুর মস্তিষ্কের ওপর স্ক্রিন টাইমের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা চালাচ্ছে। সিবিএস নিউজ থেকে জানা যায়, এনআইএইচে বর্তমানে ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী এমন এগারো হাজার শিশুর মস্তিষ্ক ও স্ক্রিন টাইমের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণা হচ্ছে। এই গবেষণার একটি রিপোর্ট এরই মধ্যে স্ক্রিন টাইমের খুব ভয়ংকর একটি দিক তুলে ধরেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার বেশি হলে শিশুর মস্তিষ্কে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। গবেষণায় এ ধরনের শিশুদের চিন্তন ও ভাষাগত দক্ষতার পরীক্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম নম্বর পেতে দেখা যায়। তা ছাড়া চোখের সমস্যাও কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের আরেকটি অভিশাপ। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪২ শতাংশের বেশি শিশু ট্যাবলেট ব্যবহার করে এবং এর অতিরিক্ত ব্যবহার চোখে চাপ সৃষ্টি এবং ক্ষীণদৃষ্টির মতো নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস তাই বাচ্চাদের স্ক্রিন থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার জন্য জোর দিয়েছে। তাদের মতে, ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সী বাচ্চাদের জন্য কোনো স্ক্রিন টাইম নয়। তবে ভিডিও কলের মাধ্যমে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগে কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁরা আরো বলেন, দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুর জন্য প্রতিদিন এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম বরাদ্দ রাখতে হবে। আর বয়স ছয়ের বেশি হলে তার অভিভাবকের বেঁধে দেওয়া স্ক্রিন টাইম অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক যদি তার সন্তানদের সঙ্গে একসঙ্গে টেলিভিশন দেখে, তবে স্ক্রিন টাইম যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকে ঠিক তেমনিভাবে তারা কী দেখছে এবং সেটা শিক্ষণীয় কি না তাও জানা যায়। এই যেমন দ্য ইনসাইডারের রিপোর্টার জেসন স্টাহলের কথাই বলা যায়। তাঁর ছেলের বয়স যখন তিন, তখন ‘কিউরিয়াস জর্জ’ এবং ‘থমাস অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ নামক শিক্ষণীয় কার্টুনগুলো ল্যাপটপে দেখানো শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে তার বয়সোপযোগী সিনেমা দেখানো শুরু করেন। আপনিও আপনার সন্তানের টিভি দেখার সঙ্গি হতে পারেন। দ্য ইনসইডার থেকে জানা যায়, টিভি দেখার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নির্ভর করে—টিভি প্রগ্রামটি আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে দেখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন কি না এবং তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন কি না। আপনার সন্তানের সঙ্গেই টেলিভিশন দেখুন এবং তাকে উপহার দিন চমৎকার কিছু সময়।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকুক নাগালের মধ্যে

হতাশা, দুশ্চিন্তা, দুর্বল চিত্ত, সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহত্যা ইত্যাদির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। বিবিসি থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের ১৪ বছর বয়সী মলি রাসেলের আত্মহত্যার পেছনে ইনস্টাগ্রামের ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল। জন হপকিন্স সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রগ্রামসের সাবেক উপদেষ্টা এবং স্প্রিহা বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনের জেনারেল ম্যানেজার এহসান রহমান জিয়া তাঁর সাড়ে ছয় বছর বয়সী কন্যাসন্তানের জন্য এক অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেন—তিনি তাঁর মেয়েকে সরাসরি ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে না দিয়ে ইন্টারনেটে যেসব আকর্ষণীয় কিংবা শিক্ষণীয় শিশুতোষ মজার মজার কনটেন্ট দেখা যায় তা নিজের একটি ফেইসবুক পেইজে কাজের ফাঁকে পোস্ট করে রাখেন। আর প্রতি সপ্তাহে তারা দুজন মিলে সেগুলো উপভোগ করেন। এতে তাঁর সন্তান বর্তমান যুগের সঙ্গে যেমন তাল মিলিয়ে চলতে পারছে ঠিক তেমনিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও থাকছে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তাঁর মতে, এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্ধারিত বয়সসীমা পার করলে শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া শিশুর সঙ্গে একেবারে ছোটবেলা থেকেই এমন সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, যাতে সে নির্দ্বিধায় মা-বাবার সঙ্গে যেকোনো ঘটনা শেয়ার করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবার কোনোমতেই রাগারাগি বা বকাবকি করা চলবে না। বরং ধৈর্য ধরে তার কথাগুলো শুনতে হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে যে ব্যবধান আছে তা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। শিশুর মধ্যে তৈরি হবে মূল্যবোধ, সততা ও নৈতিকতা, যা তার সারা জীবন কাজে লাগবে।

 

স্ক্রিন টাইম কমানোর জন্য কিছু সহজ টিপস

♦ যেসব শিশু স্মার্টফোনে খুবই আসক্ত, তাদের রাতারাতি মুক্ত করাটা কঠিন। তাই এক দিনে সব পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে তাকে স্মার্টফোন থেকে দূরে আসতে সাহায্য করুন।

♦ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাপগুলোর নোটিফিকেশন ডিজেবল করে রাখুন। এতে মোবাইল ফোন বারবার দেখার প্রবণতা কমবে।

♦ আপনার সন্তানকে এমন কাজ করতে দিন, যেখানে মোবাইলের প্রয়োজন নেই। যেমন—খেলাধুলা করানো, বই পড়তে দেওয়া ইত্যাদি।

♦ স্মার্টফোনের অ্যাপগুলো এলোমেলো করে রাখলে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে বারবার ঢুকে সময় নষ্ট করার প্রবণতা কমে।

♦ স্মার্টফোনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাপগুলো আনইনস্টল করে শুধু ল্যাপটপের মাধ্যমে দেখার সুযোগ রাখলে স্ক্রিন টাইম অনেক কমে যাবে।

♦ তা ছাড়া স্ক্রিন টাইম কমাতে ডাউনলোড করতে পারেন প্যারেন্টাল গাইড্যান্স অ্যাপ। কুস্টোডিও নামক চমৎকার এই অ্যাপটি ব্যবহার করে আপনি আপনার সন্তানের ডিভাইসের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ, বয়সের অনুপযোগী কনটেন্ট ব্লকিং, ওয়েব এবং সার্চ অ্যাক্টিভিটি মনিটর করতে পারবেন। এই ফ্রি অ্যাপটি ডাউনলোড করতে নিচের লিংকে যেতে হবে—https://goo.gl/oqV1B1

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা