kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

খেলা হবে ক্লাউডে

স্মার্টফোন গেইমারের সংখ্যা বাড়লেও উচ্চমানের গেইম সরাসরি ফোনে খেলা এখনো সম্ভব নয়। তবে সেটি বদলে দিতে আসছে গেইম স্ট্রিমিং বা ক্লাউড গেইমিং। বেশ কিছু ক্লাউড গেইমিং সেবা এবং গেইম স্ট্রিমিং প্রযুক্তি এর মধ্যেই হয়ে উঠেছে সমাদৃত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



খেলা হবে ক্লাউডে

ক্লাউড গেইমিংয়ের কল্যাণে মোবাইলেই খেলা যাচ্ছে ‘জিটিএ৫’-এর মতো গেইম ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

যেভাবে কাজ করে

পিসি বা কনসোলে গেইম খেলার সময় গেইমের দৃশ্য এবং সাউন্ড মনিটর ও স্পিকারে যথাক্রমে দেখা ও শোনা যায়। আর গেইমার ইনপুট দিয়ে থাকে কিবোর্ড-মাউস বা কন্ট্রোলারের মাধ্যমে। মনিটর, কন্ট্রোলার, কিবোর্ড, মাউস ও পিসি বা কনসোল একটি অপরটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে সরাসরি কেবলের মাধ্যমে কিংবা স্বল্পদূরত্বের তারহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। 

স্ট্রিম করার সময় ইনপুট ও আউটপুট—দুটিই পিসি বা কনসোল থেকে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কাজ করে। গেইমের ভিডিও ও অডিও ওয়াই-ফাই বা সরাসরি ইথারনেটের মাধ্যমে আউটপুট দেওয়া হয়, গেইমারের ইনপুটও সেভাবেই পিসি বা কনসোলে পৌঁছে যায়। যেহেতু গেইমটি চলছে পিসি বা কনসোলেই, তাই ইন্টারনেট সংযুক্ত যেকোনো ডিভাইসই আউটপুটগুলো রিসিভ করে দেখানো ও ইনপুট নিয়ে পিসি বা কনসোলে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করতে পারে। সেটি হতে পারে আরেকটি পিসি, স্মার্টফোন, এমনকি স্মার্ট টিভিতেও।

যাঁরা টিমভিউয়ার বা রিমোট ডেস্কটপ ব্যবহার করেছেন তাঁদের কাছে প্রযুক্তিটি নতুন নয়। কিন্তু এই প্রযুক্তির মূল সীমাবদ্ধতা ছিল লেটেন্সি বা মূল পিসি ও নিয়ন্ত্রক পিসিতে ভিডিও বা ইনপুট পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া। আজ অত্যন্ত কম লেটেন্সির অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তি, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং দ্রুত ভিডিও এনকোডিং ও ডিকোডিং প্রযুক্তি গেইমিংকেও স্ট্রিম করার পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

 

ক্লাউড গেইমিং কী

স্ট্রিম করে গেইম খেলার ক্ষেত্রে কনসোল বা পিসি—দুটিই নিজের থাকতে হবে। তবে চাইলে অনলাইনে সার্ভার ভাড়া করেও গেইম স্ট্রিম করা যেতে পারে, যার নাম ‘ক্লাউড গেইমিং’। এ ক্ষেত্রে কোনো ক্লাউড গেইমিং সেবার থেকে সাবস্ক্রিপশন নিয়ে বা অ্যাডভান্সড ইউজাররা ভিপিএস ভাড়া নিয়ে নিজস্ব ক্লাউড গেইমিং কম্পিউটার তৈরি করেও স্ট্রিম করে গেইম খেলতে পারবেন।

 

গেইম স্ট্রিমের প্রয়োজনীয়তা

এ পর্যায়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, নিজস্ব পিসি বা কনসোলই যদি প্রয়োজন হয় তাহলে গেইম স্ট্রিম করে ফোনে খেলার প্রয়োজন কি। পিসির সামনে বসে না থেকে টিভিতে, অন্যরুমে বা বিছানায় শুয়েও খেলার জন্য স্ট্রিমিং ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে আসল মজা হচ্ছে ঘরের গেইমিং পিসিতে যে গেইম খেলা যায় সেই গেইম রাস্তার জ্যামে বসেই খেলার সুবিধা। ফোরজি ও ভবিষ্যতে ফাইভজির কল্যাণে দেখা যাবে লেটেন্সি ও স্পিড নিয়ে কোনো সমস্যাও থাকবে না। চলার পথেই খেলা যাবে উচ্চমানের গেইম। এ ছাড়া, নিজের পিসি বা কনসোল না থাকলে বন্ধুর হার্ডওয়্যারে গেইম চালিয়ে ফোন থেকেই সেটি খেলে ফেলা যাবে। ক্লাউড গেইমিং ব্যবহার করে নিজস্ব পিসি বা কনসোল না কিনেও খেলা যাবে গেইম, প্রয়োজন হবে শুধু স্মার্টফোন।

 

স্ট্রিম করতে যে হার্ডওয়্যার লাগবে

গেইম স্ট্রিম করার জন্য পিসি বা কনসোল, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের প্রয়োজন। তবে অন্তত ১০ মেগাবিট গতির নিচে ইন্টারনেট সংযোগ হলে স্ট্রিমে সমস্যা হবে। ইনপুটের জন্য সরাসরি টাচ স্ক্রিন ব্যবহার করা গেলেও, একটি ব্লুটুথ কন্ট্রোলার হলে গেইম খেলতে আর কোনো সমস্যা হবে না। ওটিজির মাধ্যমে কিবোর্ড ও মাউসও ব্যবহার করা যেতে পারে।

সাধারণ ২.৪ গিগাহার্জ বা ৮০২.১১বি/জি বা এন ওয়াই-ফাইয়ের লেটেন্সি গেইম স্ট্রিম করতে ল্যাগ সৃষ্টি করবে। সে ক্ষেত্রে ৫গিগাহার্জ বা ৮০২.১১এসি ওয়াই-ফাই রাউটার ব্যবহারে লেটেন্সি কমে যাবে।

স্ট্রিমিং করার জন্য উচ্চ ক্ষমতার স্মার্টফোনের প্রয়োজনও নেই। অন্তত ডুয়ালকোর, ২ গিগাবাইট র‌্যাম ও অ্যানড্রয়েড ৬ বা ততোধিক সংস্করণে চালিত ডিভাইসই আদর্শ। এ ছাড়া অ্যানড্রয়েড চালিত স্মার্ট টিভিতেও স্ট্রিম করে গেইম খেলা যাবে, সে ক্ষেত্রে টিভির সঙ্গে একটি কন্ট্রোলার সংযুক্ত করলেই চলবে। গেইমিং প্ল্যাটফর্ম ‘স্টিম’ একটি দ্রুতগতির ডিকোডার ও এনকোডার বাজারে এনেছে শুধু গেইম স্ট্রিম করার জন্যই। স্টিম লিঙ্ক নামের এ হার্ডওয়্যারটির সঙ্গে টিভি, কন্ট্রোলার ও ইন্টারনেট সংযোগ যুক্ত করে পিসিতে না বসেই বড় পর্দায় গেইম খেলা যাবে।

গেইম স্ট্রিম করার মূল অন্তরায় লেটেন্সি বা পিং। তাই ক্লাউড গেইমিং সেবা নেওয়ার আগে অবশ্যই সার্ভারের সঙ্গে লেটেন্সি কত তা মেপে দেখতে হবে। তবে বেশির ভাগ ইন্টারনেট সংযোগেই আজকাল অন্তত সিঙ্গাপুরের সঙ্গে লেটেন্সি কম পাওয়া যায়। তাই ক্লাউড গেইমিংয়ে সমস্যা দেখা যায় না।

 

প্রয়োজন যেসব সফটওয়্যার

গেইম স্ট্রিম করার জন্য জনপ্রিয় গেইমিং প্ল্যাটফর্ম স্টিমের রয়েছে স্টিম লিঙ্ক।  সেটি ব্যবহার করতে পিসিতে থাকতে হবে স্টিম, আর ফোনে স্টিম লিঙ্ক অ্যাপ। ফোনের টাচস্ক্রিনকেই কন্ট্রোলার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, তবে ব্লুটুথ কন্ট্রোলার ব্যবহার করাই শ্রেয়। অনলাইনেও ঘরের পিসি ব্যবহার করে গেইম খেলা যাবে স্টিম লিঙ্কের মাধ্যমে। ক্লাউড এবং পিসি থেকে স্ট্রিম করার জন্য আছে ‘পারসেক’। পিসিতে পারসেক ইনস্টল করে ফোনে পারসেক ক্লায়েন্ট ইনস্টল করলেই গেইম স্ট্রিম করা যাবে ঘরে বা বাইরেও।

প্লেস্টেশন ৪ ব্যবহারকারীরা ‘রিমোট প্লে’ অ্যাপ ফোনে ইনস্টল করে গেইম খেলতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে নিজস্ব পিএস৪ এবং ফোনের সঙ্গে থাকতে হবে প্লেস্টেশন কন্ট্রোলার। পিসিতেও কাজ করবে এ সুবিধা।

এনভিডিয়া জিপিউ ব্যবহারকারীরা পিসি থেকে ফোনে গেইম স্ট্রিম করতে পারবেন ‘মুনলাইট’ অ্যাপ ব্যবহার করে। এটিও টাচস্ক্রিন বা কন্ট্রোলার, দুটির মাধ্যমেই গেইম নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দিয়ে থাকে। তবে একই নেটওয়ার্কে মুনলাইট না থাকলে ব্যবহার করা যাবে না।

 

কিছু ক্লাউড গেইমিং সেবা

সার্ভার ভাড়া নিয়ে গেইম খেলতে চাইলে কিনতে হবে সাবস্ক্রিপশন। অথবা যাদের শক্তিশালী ভিপিএস কেনা আছে, তারা পারসেক ইনস্টল করে সেটা থেকেই গেইম খেলতে পারবেন। পারসেকের মধ্যেই সার্ভার ভাড়া নেওয়ার সুবিধাও আছে। ঘণ্টা হিসেবে এসব সার্ভার ভাড়া নিয়ে গেইম খেলা যাবে যখন-তখন। ফোন ছাড়াও যাঁদের গেইমিং কম্পিউটার নেই তাঁরা এ সেবার মাধ্যমে হাই গ্রাফিকসের গেইমগুলো খেলতে পারবেন।

‘ভর্টেক্স’ সেবাটি মূলত স্মার্টফোনকে লক্ষ্য করেই তৈরি। খুব সহজেই ভর্টেক্স সাবস্ক্রিপশন নিয়ে পিসির সব জনপ্রিয় গেইম খেলা যাবে ফোনে। বিশেষ করে টাচস্ক্রিন কন্ট্রোল দেওয়ায় কন্ট্রোলার সব সময় ব্যবহার না করলেও চলবে ভর্টেক্সের সঙ্গে।

‘শ্যাডো ক্লাউড’ গেইমিং সেবাটিও দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে। বিশেষ করে উচ্চ ক্ষমতার সার্ভারের মাধ্যমে তারা আল্ট্রা গ্রাফিকসে গেইম খেলার সুযোগ দিচ্ছে গেইমারকে, তাও সরাসরি স্মার্টফোনেই। তাদের স্মার্টফোন অ্যাপ কন্ট্রোলারের পাশাপাশি কিবোর্ড মাউস ব্যবহারের সুযোগও দিচ্ছে গেইমারদের।

 

ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি এনভিডিয়াও ক্লাউড গেইমিং সেবা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। প্রতিটি দেশে গেইমিং সার্ভার বসিয়ে ক্লাউড গেইমিংকে সহজলভ্য করাই তাদের লক্ষ্য। আগামী বছরের মধ্যেই সেবাটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু করবে। গুগলও গেইম স্ট্রিমিং সেবা নিয়ে কাজ করছে। তাদের সেবাটি সম্ভবত সরাসরি ক্রোম ব্রাউজারের মাধ্যমেই ব্যবহার করা যাবে, অ্যানড্রয়েড অ্যাপেরও প্রয়োজন হবে না।

ভবিষ্যতে ফাইভজি ইন্টারনেট সেবার ফলে ক্লাউড গেইমিংয়ের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। হয়তো এমনটাও দেখা যাবে, ফোনের জন্য আলাদা করে আর গেইম তৈরি করতে হচ্ছে না, সরাসরি পিসি বা কনসোলের গেইমই সবাই খেলছেন চলার পথে। যেভাবে ইউটিউব হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে ভিডিও দেখার সুবিধা, সেভাবে ক্লাউড গেইমিং সবার জন্য উচ্চ গ্রাফিকসের গেইম খেলা করে দেবে একেবারেই সহজ।

সম্প্রতি মাইক্রোসফটও ঘোষণা দিয়েছে ক্লাউড গেইমিং সেবা নিয়ে কাজ করার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা