kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

এই হচ্ছে কেটি বুম্যান

প্রথমবারের মতো যে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোলের ছবি দেখা গেল, তার কৃতিত্ব ড. কেটি বুম্যানের। আর এই ছবি তোলার জন্য বিশেষ কম্পিউটার প্রগ্রাম তৈরি করেছেন। বিস্তারিত লিখেছেন মিজানুর রহমান

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এই হচ্ছে কেটি বুম্যান

এই হার্ডডিস্কগুলোতেই আছে ব্ল্যাকহোলের ছবি

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশের পর থেকেই কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের অন্ত নেই। তত্ত্বীয় ও শিল্পের মিশেলে নানা ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের ছবি এর আগে দেখা গেলেও কেউই জানত না আসলে কৃষ্ণগহ্বর দেখতে কেমন। কারণ কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা এতটাই কঠিন যে সেটাকে অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে করেছে। কারণ টেলিস্কোপের থিওরি অনুযায়ী একটি ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে হলে এমন একটি টেলিস্কোপ নির্মাণ করতে হবে, যার আকার হতে হবে পৃথিবীর আকারের সমান। এত বিশাল টেলিস্কোপ নির্মাণের কথা চিন্তাও করা যায় না। তবে বিজ্ঞানীরা হাল ছেড়ে দেননি। তাঁরা বিকল্প একটি ধারণা নিয়ে আসেন। তাঁরা উপলব্ধি করেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কৌশলগতভাবে আটটি টেলিস্কোপ বসানো গেলে সেগুলোই যুগ্মভাবে একটি পৃথিবীর আকারের টেলিস্কোপের কাজ করতে পারে। এই থিওরিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আটটি টেলিস্কোপ বসিয়ে একটি কৃষ্ণগহ্বরের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০১৭ সালে। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এসব তথ্য প্রসেস করার পদ্ধতি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্রী কেটি বুম্যানের ওপর দায়িত্ব পড়ে এই সমস্যা সমাধানে একটি অ্যালগরিদম বানানোর।

প্রশ্ন জাগতে পারে, ছবি তো ছবিই, এতে বিশেষ অ্যালগরিদমের প্রয়োজন কী? কেনই বা কেটি বুম্যানকে এত বাহ্বা দেওয়া হচ্ছে? আসলে এই ছবি সাধারণ কোনো ছবি নয়। বিশেষ করে যেই ব্ল্যাকহোলটির ছবি সবাই দেখেছে, সেটি মেসিয়ার ৮৭ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত। এই গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আর ব্ল্যাকহোলটি ৫০০ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এত বিশাল দূরত্ব ব্যাখ্যা করা একটু জটিলই বটে। তবে সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে—আমরা জানি, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। আর মেসিয়ার ৮৭ গ্যালাক্সির সীমারেখা পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ বছর। অন্যভাবে বলতে গেলে—যদি বলা হয়, আমরা আসলে ছবিতে এই কৃষ্ণগহ্বরের পাঁচ কোটি ৩০ লাখ বছর পুরনো অবস্থা দেখতে পেয়েছি। যা হোক, এত দূরে অবস্থিত কৃষ্ণগহ্বরের ছবি একেবারে পাওয়া সম্ভব ছিল না। প্রতিবারের প্রচেষ্টায় পূর্ণ ছবিটির ব্ল্যাকহোল থেকে ছুটে আসা কিছু অতিসূক্ষ্ম বিকিরণের অংশবিশেষের ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। পৃথিবীর আহ্নিক গতির ধরনকে কাজে লাগিয়ে এভাবে বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি পিক্সেল করে সংগ্রহের পর সেগুলো জোড়া দিয়ে ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। কেটি বুম্যানের বিশেষ অ্যালগরিদম নির্ভুলভাবে এই জোড়া দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে। এ কারণেই তাঁকে এত বেশি বাহ্বা দেওয়া হচ্ছে।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, ব্ল্যাকহোল যে এমনই হবে এটি বুঝব কিভাবে? ছবিটি তৈরিতে যে ভুল হয়নি তারই বা প্রমাণ কী? প্রশ্নগুলো একেবারে অযৌক্তিক নয়। তবে কৃষ্ণগহ্বরের ছবিটি তত্ত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য। তাই আরেকটি অধিকতর নির্ভুল ছবি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ধরে নেওয়া যায়, ব্ল্যাকহোলের ছবিটি অনেকাংশেই নির্ভুল। কেটি বুম্যান তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) স্নাতক শিক্ষার্থী থাকাকালীন অ্যালগরিদমটি নির্মাণ করেন। তিনিই কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তৈরিতে অ্যালগরিদম দলের নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কম্পিউটিং অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন কেটি। কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তৈরিতে একক কৃতিত্ব নিতে নারাজ তিনি। তিনি মনে করেন, কোনো একটি অ্যালগরিদম বা একজন ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এমন একটি কাজ সম্ভব নয়। এই ছবি নির্মাণে কয়েকটি আলাদা অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০০ বিজ্ঞানী নিরলস কাজ করেছেন।

মন্তব্য