kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

রেপটোর ওয়ার্ল্ড কাপ যাত্রা

১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৯’। প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে ৩৯ দেশের শীর্ষ নতুন সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এতে প্রথমবারে মতো অংশ নেবে বাংলাদেশ। ‘ইজেনারেশন প্রেজেন্টস স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৯, বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ‘রেপটো’। বিস্তারিত জানিয়েছেন তুসিন আহম্মেদ

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রেপটোর ওয়ার্ল্ড কাপ যাত্রা

রেপটো বাহিনী

কলেজে পড়ার সময় ইশতিয়াক সিয়াম দেখলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ক্লাসে ১০ বছর পুরনো উইন্ডোজ এক্সপিতে নোট প্যাড ওপেন করা শেখানো হচ্ছে। এ ধরনের বিষয়গুলো সিয়াম অনেক আগেই শিখেছিল। তাঁর মনে প্রশ্ন এলো—নতুন সব প্রযুক্তি না শিখিয়ে কেন ১০ বছরের পুরনো প্রযুক্তি শেখানো হচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার সময় অনলাইনে বিভিন্ন কোর্সের খরব পান সিয়াম। সেখানে আইসিটির বিভিন্ন কোর্স করেন ‘ইউডেমি’ নামে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

২০১৪ সালের শেষ দিকে অঙ্কের ওপর ‘ম্যাথমেটিকস ফর প্রগ্রামিং’ নামে একটি কোর্স তৈরি করে ফেলেন সিয়াম। তারপর ইউডেমিতে সেটি আপলোডও করেন। তিন মাসের মধ্যে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী এই কোর্সে যোগ দেয়। ইউডেমি দেখাল যে ওই প্রগ্রামের অর্ধেক শিক্ষার্থীই যুক্তরাষ্ট্রের, ৩০ ভাগ ভারতের, বাকিরা পাকিস্তানসহ অন্য দেশের; কিন্তু বাংলাদেশের একজনও ছিল না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একজন শিক্ষার্থী ১২৩ ডলার দিয়ে কোর্সটি কিনে পড়ছেন, সেখানে ফেইসবুক টাইমলাইনে ফ্রিতে জয়েন করার আহ্বান জানানোর পরও দেশের কারো কাছ থেকে সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি সিয়ামকে ভাবিয়ে তোলে। সে সময় ওই কোর্সের সুবাদে তাঁর হাতে ভালো অঙ্কের কিছু টাকাও চলে আসে। আর এ টাকা দিয়ে কী করা যায় সেটা ভাবতে থাকেন। পত্রিকায় বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন স্নাতক যুবকের মধ্যে ছয়জনই বেকার থাকার খবর পড়ে কিছু করার চিন্তায় নতুন মাত্রা পায়। ভাবতে থাকেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা, যেথানে নানা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নিজেদের বিষয়ের ওপর একটি কোর্স তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো ছাত্র ঘরে বসে শিক্ষা লাভ করতে পারবে। তাহলেই অনেক বাধা কেটে যাবে। আর এ ভাবনা থেকেই ‘রেপটো এডুকেশন’-এর পথচলা শুরু। প্রথাগত অন্য ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রেপটোর পার্থক্য হচ্ছে, এখানে যে কেউ প্রশিক্ষণ দিতে পারে আবার যে কেউ প্রশিক্ষণ নিতেও পারে। তা ছাড়া রেপটোর রয়েছে নিজস্ব ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস প্ল্যাটফর্ম।

মাত্র ৩টি কোর্স দিয়ে শুরু হলেও এখন রেপটোতে রয়েছে ১৫০টিরও বেশি কোর্স। আর প্রথম মাসে ৫২ জন শিক্ষার্থী দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। যার বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের। পাশাপাশি এটি অনেকের আয়ের উৎসও হয়ে উঠেছে।

 

রেপেটোর শিক্ষা পদ্ধতি

ওয়েবসাইটে ঢুকে পছন্দের বিষয় নির্বাচন করে নির্ধারিত ফি দিয়ে যে কেউ পড়তে পারবে। তবে ঢাকার বাইরের ব্যবহারকারীদের জন্য রেপটো একটু ভিন্ন রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। এ জন্য তারা একটি ডেক্সটপ অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে, যেটি অফলাইনে ব্যবহার করা যায়। এতে ডিভিডির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কনটেন্ট দেওয়া হয়। তবে ওই কনটেন্ট চালানোর প্রয়োজন হয় রেপটোর প্লেয়ার। কনটেন্টটা লোড হবে ডিভিডি থেকে তবে প্রগ্রেস টেকিং, কমেন্টিং মাত্র ১০০ কেবিপিএস ইন্টারনেট দিয়েই করা যাবে। এটি অনেকটা ম্যাসেঞ্জারের মতো কাজ করে। একেকটা কোর্সে লেকচার থাকে ৩০ থেকে ৫০টা। গড়পড়তায় একেকটি কোর্সের দাম ৯৫০ টাকা। চাইলে শিক্ষার্থীরা ধাপে ধাপেও এটি পরিশোধ করতে পারেন। আবার অনেক বেসিক কোর্স আছে, যা শিখতে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না।

 

ভবিষ্য পরিকল্পনা

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখেই কাজ করছে রেপটো। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো দক্ষতানির্ভর বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি যারা পেশা হিসেবে চাকরি বেছে নিতে চায়, তাদের জন্যও রয়েছে নানা কোর্স। রেপটোর উদ্যোক্তা ইশতিয়াক সিয়াম বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে অনলাইন এডুকেশনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত, চীনসহ এই উপমহাদেশের দেশগুলো; কিন্তু একদিন বাংলাদেশও এ তালিকায় নাম লেখাবে। তৈরি হবে বিশাল দক্ষ জনগোষ্ঠী। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আধুনিক সব বিষয়ে দক্ষ করে চাকরির বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ করতে চায় রেপটো।’

 

রয়েছে আরো স্বীকৃতি

রেপটোর স্বীকৃতি হিসেবে ইশতিয়াক সিয়াম পেয়েছেন ‘ডিজিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৬’, ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৬’, ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’, ‘সিডস্টারস ঢাকা ২০১৭’, ‘সুইস এমবাসি অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’, ‘ব্র্যাক ম্যারাথন ডিজিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৬’।

 

একনজরে স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ

সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ‘ফেনক্স ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’। তারা আয়োজন করতে থাকে ‘স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৯’। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে এমন একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করার জন্য প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় ‘ইজেনারেশন প্রেজেন্টস স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৯, বাংলাদেশ’।

সিলিকন ভ্যালির চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশের ৩৯ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরা অংশগ্রহণ করবেন। তাঁরা লড়বেন এক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পুরস্কারের জন্য।

ইজেনারেশন লিমিটেড সর্বশেষ প্রযুক্তি যেমন ব্লকচেইন, ডাটা অ্যানালাইটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং নিয়ে কাজ করছে।

প্রতিযোগিতার সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম (বিআইএফ)। এ ছাড়া অংশীদার হিসেবে ছিল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইক্যুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশে (ভিসিপিয়াব), টাই ঢাকা এবং ইও বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পর্বের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

ফেনক্স ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জেনারেল পার্টনার ও ইজেনারেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান শামীম আহসান বলেন, “এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে বাংলাদেশে স্টার্টআপের নতুন মাত্রা দেখতে পেরেছি। স্থানীয় স্টার্টআপগুলো প্রাযুক্তিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছে এবং সফলতার সেরা অবস্থানে যাচ্ছে। আমরা স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ‘রেপটো’-এর বিষয়ে খুবই আশাবাদী।”

৬ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত আরটিভি বেঙ্গল স্টুডিওতে তাঁরা উপস্থিত দর্শক ও বিচারকদের সামনে নিজেদের ব্যবসাকে তুলে ধরেন। বিজয়ী নির্বাচন করতে বিচারকদের মধ্যে ছিলেন ইনফ্লেকশন ভেঞ্চারের পার্টনার তানভীর আলী, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও লাওসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবির, আইপিডিসি ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম এবং ‘সহজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা কাদির।

মন্তব্য