kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

আক্ষেপ ঘুচল অস্ট্রেলিয়ার, ওয়ার্নার সেরা

মাসুদ পারভেজ, দুবাই থেকে   

১৫ নভেম্বর, ২০২১ ০৮:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আক্ষেপ ঘুচল অস্ট্রেলিয়ার, ওয়ার্নার সেরা

নিউজিল্যান্ড : ২০ ওভারে ১৭২/৪

অস্ট্রেলিয়া : ১৮.৫ ওভারে ১৭৩/২ 

ফল : অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে জয়ী 

ইতিহাস বদলানোর ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু উঁকি দেওয়া সেই সম্ভাবনাও শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকল মরুর মরীচিকাই। ইতিহাস না বদলে বরং এর পুনরাবৃত্তিতে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কাল রাতের চোখধাঁধানো আতশবাজির ফোয়ারার মধ্যেও অন্ধকার মুখ নিউজিল্যান্ডের। সেই সঙ্গে তাদের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনেরও।

বারবার যে সীমিত ওভারের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে গিয়েও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বিনীল হওয়ার নিয়তি তাঁর। এ রকম ভাগ্য বঞ্চনার শুরু সেই ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ দিয়ে। মেলবোর্নের সেই ফাইনালের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই এবার যখন আবার সামনে, তখন ভাগ্য বদলের শপথই যেন ঘোষিত হলো উইলিয়ামসনের ব্যাটেও। ব্যাটিং শুদ্ধাচারের প্রতীক এই কিউইর ৪৮ বলে ৮৫ রানের ইনিংসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাস দেখল সর্বোচ্চ রানও।

কিন্তু শুদ্ধাচারী উইলিয়ামসনের মতো ডাকাবুকো ডেভিড ওয়ার্নারও তো আগে কখনো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খাননি। এই বাঁহাতির ব্যাটও তাই পাল্টা জবাবের হাতিয়ার হয়ে উঠতে সময় নিল না একদমই। একেকটি বিগ শট খেলার পর তাঁর দাঁতে দাঁত কামড়ানো প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছিল, যেকোনো মূল্যে শিরোপাটা তাঁর চাই-ই চাই। ৩৮ বলে ৫৩ রানের ঝড়ে সেটি এমন নাগালের মধ্যে এনে দিয়ে গেলেন যে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার দুটো সেমিফাইনালের পর ফাইনালটি বড্ড একপেশেই হয়ে গেল।

ওয়ার্নার যতক্ষণে গিয়েছেন, ততক্ষণে উইকেটে জমে গিয়ে মারতে শুরু করা মিচেল মার্শও ফিফটির কাছাকাছি। এই অলরাউন্ডার ফিফটি তো করলেনই, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে সঙ্গে নিয়ে নিশ্চিত করলেন ছয় বছরের পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও। যেন মেলবোর্নই ফিরল দুবাইতে। আবারও সেই অস্ট্রেলিয়ার সামনে মাথা নত কিউইদের। ৭ বল বাকি থাকতে ৮ উইকেটের হারে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফিও তাদের জন্য হয়ে থাকল ‘দূরের বাতিঘর’ই। আর ২০১০ সালে টি-টোয়েন্টির তৃতীয় বিশ্ব আসরের ফাইনালে পল কলিংউডের ইংল্যান্ডের কাছে হারা অস্ট্রেলিয়াও প্রায় এক যুগ পর প্রথমবারের মতো অধরা ট্রফিতে হাতই রাখল না শুধু, পেয়ে গেল এই সংস্করণে শ্রেষ্ঠত্বের সনদও। ৭ ম্যাচে ২৮৯ রান করে ডেভিড ওয়ার্নার জিতলেন টুর্নামেন্ট-সেরার পুরস্কারও।

তা পাওয়ার আগে দুবাইতে মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা টসও জিতলেন অ্যারন ফিঞ্চ। ফাইনালের আগ পর্যন্ত হওয়া ১১ ম্যাচের ১০টিতেই যেখানে রান তাড়া করা দল বিজয়ী, তখন ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কও ঝুঁকি নিলেন না কোনো। এখানেই সেমিফাইনালে রান তাড়ায় পাকিস্তানকে হারানোর প্রবল বিশ্বাসও ছিল সঙ্গী। তাই শুরু থেকেই চেপে ধরা গেল কিউইদেরও। এই বিশ্বকাপে এসেই প্রথমবার ওপেন করতে নেমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে হৈচৈ ফেলে দেওয়া ড্যারেল মিচেলকে (৮ বলে ১১) দ্রুতই উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানালেন জশ হ্যাজেলউড। টিকে গেলেও খুব স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন না মার্টিন গাপটিলও। তাঁকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ৪৮ রান যোগ করা উইলিয়ামসনকেও মনে হচ্ছিল নড়বড়ে।

এরই প্রভাবে এই আসরে পাওয়ার প্লেতে নিউজিল্যান্ডের সর্বনিম্ন রান (৩২/১)। ১০ ওভার শেষে ১ উইকেটে করা ৫৭ রানেও ছিল লড়াই একদমই জমিয়ে তুলতে না পারার ইঙ্গিতও। কিন্তু এরপর যা যা ঘটতে শুরু করল, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, নিয়তিরও নিশ্চয়ই দায় শোধ করার কিছু আছে। তাই ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান উইলিয়ামসন। মিচেল স্টার্কের বলে তাঁর ক্যাচ ধরতে গিয়ে উল্টো বাউন্ডারি বানিয়ে দেওয়া জশ হ্যাজেলউড (৩/১৬) অবশ্য ফাইনালের সেরা বোলারই। সুযোগ পেয়ে নিউজিল্যান্ড অধিনায়কও এমন জ্বলে ওঠেন যে রাতে কিউইদের জয়োৎসবে না আবার হ্যাজেলউডকে ভিলেন হয়ে যেতে হয়, জেগেছিল সেই সংশয়ও।

যখন জীবন পান, তখন ২১ বলে ২১ রান উইলিয়ামসনের। পরের ৬৪ রান করতে তাঁর লাগে মোটে ২৭ বল। ১০ বাউন্ডারির চারটিই স্টার্ককে মারেন এক ওভারে। ওই ওভারেই ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে মারা ছক্কায় ২২ রান তুলে নেওয়া উইলিয়ামসনকে ফিরিয়ে হ্যাজেলউড প্রায়শ্চিত্ত করলেও ততক্ষণে বড় সংগ্রহ করা নিশ্চিত হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ডেরও। শেষ ১০ ওভারে ১১৫ রান তোলা কিউইদের চোখও তখন শিরোপায়।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ফিঞ্চকে দ্রুতই ফিরিয়ে তাঁদের স্বপ্নে রংও লেগেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের রংও চটে যেতে সময় লাগে না। ফর্ম হারিয়ে ও রানে না থেকে আইপিএল ফ্রাঞ্চাইজি সানরাইজার্স হায়দরাবাদের একাদশেও জায়গা হারানো এই বাঁহাতি ওপেনার যে পাল্টা আঘাতে ছিন্নভিন্ন করতে থাকেন কিউই বোলারদের। এই যজ্ঞে তাঁর সঙ্গী হয়ে যান মিচেল মার্শও। তাঁরা দুজন মিলে ১০ ওভারে ৮২ রান তুলে দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তাও এক রকম উবে যায়। দ্বিতীয় উইকেটে ৯২ রানের পার্টনারশিপ গড়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ওয়ার্নার বাঁহাতি পেসার ট্রেন্ট বোল্টের বলে বোল্ড হয়ে যাওয়ার পর দলকে পথ হারাতে দেননি মার্শও। ম্যাক্সওয়েলকে (১৮ বলে ২৮*) নিয়ে বাকি পথটা নির্বিঘ্নই রাখেন ৫০ বলে ৬ চার আর ৪ ছক্কায় ৭৭ রানের হার না মানা ইনিংসে ফাইনাল সেরা হওয়া এই অলরাউন্ডারই।

তাই ইতিহাসও না বদল ঘটে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই!



সাতদিনের সেরা