kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তবু কোথায় যেন বাজছে ’৯২-এর সুরও

মাসুদ পারভেজ, দুবাই থেকে   

১০ নভেম্বর, ২০২১ ১০:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তবু কোথায় যেন বাজছে ’৯২-এর সুরও

সেবার ‘অলৌকিক’ কিছু ঘটা জরুরি হয়ে পড়েছিল ভীষণ। ব্যাটারদের ব্যাটে রানের দেখা মিলছিল না। বোলাররাও ছন্দে ছিলেন না তেমন। দুয়ে মিলে ব্যর্থতার বৃত্তবন্দি দল বিদায়ের দুয়ারে গিয়েও দাঁড়িয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইমরান খানের দলের বিশ্বকাপ জিতে নেওয়ার সাফল্য ক্রিকেট ইতিহাসে সোনার অক্ষরে খোদাই হয়ে আছে ‘মিরাকল অব নাইন্টি টু’ নামেই।

এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পাকিস্তান দলের জন্য তেমন কিছু ঘটারই দরকার নেই কোনো। বরং বাবর আজমের দল এবার এমন দুরন্ত গতিতে ছুটছে যে আসরের প্রথম ম্যাচ থেকে খুঁজে নেওয়া ছন্দটা ধরে রাখলেই আর কিছুর দরকার হয় না। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে ধসিয়ে, নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে রাখার পথে একাধিক ক্রিকেটার পারফরম্যান্সের আলোয় এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন যে পাকিস্তানই আসরের একমাত্র অপরাজিত দল। টানা পাঁচ ম্যাচ জেতা দলের সামনে এখন শিরোপার হাতছানি। আর মাত্র দুটো ম্যাচ জিতলেই...।

ইমরানের পাকিস্তানের সঙ্গে এই পাকিস্তানকে মেলানোর কোনো অবকাশই নেই তাই। তবু এবারের দলেরও কোথায় যেন বেজে চলেছে সেই ’৯২-এর সুরই। বিশেষ করে বাবরের কথায় ২৯ বছরের পুরনো সেই ঝংকার আবিষ্কার করা অমূলকও নয়। ফর্মহীন সতীর্থের পিঠে আস্থার হাত রাখায়, তাঁর ওপর করা পরম ভরসায় এবং ফর্মে ফেরার জন্য অনুপ্রাণিত করে যাওয়ার প্রচেষ্টায় তরুণ বাবরে যে এখন অনেকটাই ফুটে উঠছে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সেই ৪১ বছরের ইমরানের ছবিও।

রানে না থাকা ব্যাটসম্যানকে কাছে ডেকে যেমন ইমরান বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান আর কে আছে?’ তরুণ কোনো ক্রিকেটারও তাঁর মুখ থেকে এমন কথা শুনে মাঠে নিজের শেষটা নিংড়ে দিতেও তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন, ‘তোমার চেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তো এই বিশ্বে আমি আর দেখি না। ’ মাত্র ১৫ মিনিটের বক্তব্যে আকিব জাভেদের ভেতরের আগুনও ইমরান এমন উসকে দিয়েছিলেন যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেকে উজাড়ই করে দিয়েছিলেন এই সাবেক পেসার, ‘ম্যাচ শুরুর আগে ১৫ মিনিট তাঁর কথা শুনে যে অনুভূতি নিয়ে আমি সেদিন মাঠে নেমেছিলাম, সেরকম অনুভূতি আমার আগেও কখনো হয়নি, পরেও নয়। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। ’

সেই পাকিস্তানকে কেউ আর থামাতেও পারেনি। বাবরের পাকিস্তানও এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্যই। আগামীকাল দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আসরের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। শিরোপার পথে আরেক ধাপ এগোনোর লক্ষ্যে অবিচল পাকিস্তান শিবিরে পারফরমারেরও অভাব নেই কোনো। বাবর নিজেই পথ দেখানো অধিনায়ক। পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছে ফিফটি। অথচ একবারও ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠেনি তাঁর হাতে। পাঁচ ম্যাচে পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন ক্রিকেটারের ম্যাচসেরা হওয়াই জানান দিচ্ছে এই পাকিস্তান দলের শক্তি-সামর্থ্যের গভীরতা।

তবু পারফরম্যান্সের আলোর নিচেও কিছু অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে। সেই সমস্যার কিছুটা আছে এই দলেরও। পেসার হাসান আলী যেমন ছন্দেই নেই। তবু একাদশ বদলায়নি পাকিস্তান। ফখর জামান রানে না থাকার পরও তাঁকে বাদ দিয়ে মাঠে নামার চিন্তাও করেনি টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু সেমিফাইনালের মতো মহা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই যখন সামনে, তখন একাদশ ভাবনায় বদলের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সংবাদমাধ্যম তা জানতে চাইলোও। তখনই যেন ’৯২-এর ইমরানের মোড়ক পরে বেরিয়ে এলেন বাবর, জানালেন দলের এই দুই ক্রিকেটারকে নিয়ে আস্থার সংকট অন্তত তাঁর নেই।

যা আছে, তা কেবলই হাসান আর ফখরের কাছ থেকে সেরাটা বের হয়ে আসতে দেখার আশা ও নির্ভরতা। সেমিফাইনালেই ব্যাটে-বলে তাঁদের ঝলসে উঠতে দেখার প্রতীক্ষাও বাবরের। কারণ এই দুজনই তাঁর চোখে ‘বিগ ম্যাচ প্লেয়ার’। ২০১৭ সালে ওভালে ভারতের বিপক্ষে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালই হয়ে আছে এর সবচেয়ে বড় দলিলও। ওপেনিংয়ে নেমে ফখরের ১০৬ বলে ১১৪ রানের ইনিংসই পাকিস্তানকে দিয়েছিল ৪ উইকেটে ৩৩৮ রানের বিশাল সংগ্রহের ভিত। এই পুঁজি নিয়ে মোহাম্মদ আমিরের মতো প্রতিপক্ষের ব্যাটিং ধসিয়ে দেওয়া বোলিং করেছিলেন হাসান আলীও। আসরজুড়েই দারুণ পারফরম করে টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাওয়া হাসান এবার বিশ্ব আসরে নিষ্প্রভ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ‘প্লেয়ার অব দ্য ফাইনাল’ ফখরও তা-ই। বাবর এত সহজেই তা ভুলে যান কী করে?

তিনি ভুলছেনও না। বরং বলে দিচ্ছেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে হাসানকে বাদ (একাদশ থেকে) দেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারি না। হ্যাঁ, ও ভালো করছে না। কিন্তু সে ম্যাচ উইনার। অনেক ম্যাচই সে আমাদের জিতিয়েছে। এবং আমি এটাও জানি যে সে বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। একই কথা প্রযোজ্য ফখরের ক্ষেত্রেও। তা ছাড়া এক ম্যাচেই তো আর ১১ জন পারফরম করবে না। আশা করছি, সেমিফাইনালেই ওরা খেলে দেবে। ওরা এমন খেলোয়াড়, নিজেদের দিনে যারা ম্যাচ ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে জানে। ’

ইনজামাম-আকিবরা ম্যাচ ভাগ্য ঘুরিয়েছিলেন। ’৯২-এর সুরের ঝংকার তুলে কি হাসান-ফখররাও পারবেন?



সাতদিনের সেরা