kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ধর্ষণ মামলার বিচার ও দণ্ড দ্রুত কার্যকর করা দরকার

মিল্টন বিশ্বাস

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ধর্ষণ মামলার বিচার ও দণ্ড দ্রুত কার্যকর করা দরকার

নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। কালের কণ্ঠে ১০ জুন (২০১৯) প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, শুধু শেরপুর জেলায় গত পাঁচ মাসে ৫৫ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরা; বাদ যাচ্ছে না প্রতিবন্ধী নারীরাও। ধর্ষণ করা হচ্ছে প্রথম থেকে শুরু করে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে। যেমন—ঈদুল ফিতরের উৎসব চলাকালে গত ৫ জুন শ্রীবরদী উপজেলায় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। অন্য একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়া মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। কোমলমতি শিশুরা প্রতিবেশী, উত্ত্যক্তকারী, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন বা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে উত্ত্যক্তকারী দ্বারা ধর্ষণের শিকার ১১০ জন আর প্রতিবেশী দ্বারা ১০২ জন; গণধর্ষণের শিকার ৩৭ জন, শিক্ষক দ্বারা ১৭ জন। ২০১৭ সালে ৫৩টি শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়, যাদের প্রত্যেকেই আহত হয়েছিল। নারী শিশুর প্রতি যৌন সন্ত্রাসের এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে মা-বাবার সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতবিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি রায় কার্যকর করা এবং গণমাধ্যমে শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ফলোআপ প্রকাশ করা দরকার। অন্যদিকে ধর্ষকের ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছর (২০১৯) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর আইনিব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের নাম-পরিচয়, চেহারা ভালোভাবে প্রচার করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রায়ই দেখি শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, এটা অত্যন্ত গর্হিত একটা কাজ। যারা এসব করে তারা সমাজের শত্রু, তাদের প্রতি ঘৃণা। সেদিন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আরো বেশি সচেতনতা ও জনমত সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্যাতিত নারীদের নয়, যে ধর্ষক তার পরিচয়, চেহারা এমনভাবে প্রচার করা যাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যেন তাকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং এভাবে তাকে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, শুধু আইন করলে নারীর প্রতি সহিংসতা বা বৈষম্য দূর হবে না। এ জন্য সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে দরকার। সমাজকে গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষ সবারই একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

জনসচেতনতা ধর্ষণ নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন— একসময় দেখা গেছে, বেকার সমস্যা এবং গৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও অফিসে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা না চালানোর কারণে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে ছিল বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক ব্যর্থতাও। তরুণসমাজের যে বিরাট অংশ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের আচরণ ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও ধর্ষণকারীকে উৎসাহী করেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ধর্ষিতার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও অপরাধীকে শাস্তি দিতে না পারার ব্যর্থতা এ ধরনের তৎপরতা বৃদ্ধির আরো একটি কারণ। তবে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সরকারের নারী নেতৃত্বের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ধর্ষণকারীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে নারী বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমাদের সামনে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সব মিলে বলা যায়, এ দেশ ধর্ষকমুক্ত করার জন্য ও ধর্ষণ প্রতিরোধে নারীকে সতর্ক থাকতে হবে।

শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং নির্মূলে করণীয় সম্পর্কে আমাদের অভিমতগুলো হলো—আপনি পিতা-মাতা হলে যখন ঘরে থাকবেন তখন বাসার দরজা-জানালা ও লক ভালো করে বন্ধ রাখুন। দরজায় আই-ভিউয়ার লাগান। বাসায় আপনি অনুপস্থিত থাকলে শিশুকে বলুন, দরজা খোলার আগে জেনে নেবে কে আছে দরজার বাইরে। আপনার সন্তান ও বাসার অন্যদের দরজা ও টেলিফোন সম্পর্কে সতর্ক করুন। পরিচয় ছাড়া টেলিফোনে নির্বিঘ্নে প্রশ্নের উত্তর দেবে না তারা। গৃহের কাজে আসা প্রত্যেকের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে কাজে নিযুক্ত করুন। এসব ক্ষেত্রে বাইরের কেউ কাজে এলে বিশ্বস্ত পুরুষ কাউকে রাখুন। ঘরের বাইরে বের হলে আলোকিত ও ভালো রাস্তা ব্যবহার করতে হবে শিশুকে; সম্ভব হলে সঙ্গীসহ হাঁটতে হবে। জনগণের ভেতর দিয়ে চলাচল করা নিরাপদ। প্রতিবেশীদের চিনে রাখতে হবে। শিশুদের বন-জঙ্গল ও নীরব এলাকা পরিহার করে চলা দরকার। চলাচলে সুবিধা হয় এ রকম পোশাক পরতে হবে। নিজের বোঝা বাড়ে এ রকম জিনিসপত্র না নিয়ে চলা নিরাপদ। সামাজিক প্রয়োজনে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে নতুন ও অপরিচিত মানুষের বিষয়ে সতর্ক করুন শিশুকে। নির্জন লিফটে অপরিচিত পুরুষ আপনার শিশুকে আক্রমণ করতে পারে—এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন। আত্মরক্ষার বিবিধ বিষয় আছে, তবে সশস্ত্র ব্যক্তির কাছ থেকে রক্ষার জন্য অন্য পন্থা গ্রহণ করতে হবে। ধর্ষিতা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে জখম হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অন্যের সাহায্য নিতে হবে অথবা ৯৯৯ নম্বরে পুলিশকে ফোন দিতে পারে শিশুরাও।

নারীদের বিরুদ্ধে উগ্র ও হিংস্রতামুক্ত সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে তুলতে পারলে যৌন নিপীড়ন বন্ধ হতে পারে। পুরুষত্ব বিষয়ে সচেতন করতে হবে পুরুষকে। তাদের শক্তিকে নারীর বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগ্রত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে লিডারশিপ ট্রেনিং দিয়ে পুরুষের সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। দেশের সর্বত্র পাঠাগার স্থাপন ও খেলাধুলার ব্যাপক আয়োজন এবং লোকায়ত সংগীতের মূর্ছনা মানুষকে রুচিশীল করতে পারে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের সেদিকে সর্বাগ্রে মনোযোগ দিতে হবে ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য।

এ কথা সত্য, বিশ্বে উন্নতির রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশে ধর্ষকদের ঠাঁই নেই। কারণ শেখ হাসিনা সরকার কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বেশ কিছু আইন কার্যকর করেছে এবং আরো কিছু কার্যক্রম নারীদের সহায়তার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। যেমন—‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা-২০১৩ ও ডিএনএ আইন-২০১৪, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৭ এবং যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮ প্রণয়ন, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৭ এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এর তফসিলভুক্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০৩ (সংশোধিত) ও পারিবারিক পর্যায়ে সংঘটিত নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রগ্রামের মাধ্যমে ৬৭টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯ চালু, অসহায় নির্যাতিত মহিলাদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ছয়টি বিভাগে রয়েছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল ও মহিলা সহায়তা কর্মসূচি, গাজীপুর জেলায় মহিলা, শিশু ও কিশোরী হেফাজতিদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা, সারা দেশে চার হাজার ৮৮৩টি ক্লাবের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা গ্রহণ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যাকশন টু অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা প্রদানে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম ধর্ষকদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যথেষ্ট। এ দেশ যে ধর্ষকদের জন্য নয় তা স্পষ্ট হচ্ছে ধর্ষণকারীদের বিচারপ্রক্রিয়া ও অপরাধীর রায় দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।                                      

লেখক : অধ্যাপক  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা