kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সাদাকালো

কৃষক ও সরকারের মধ্যস্থতায় নির্ধারিত হোক কৃষিপণ্যের দাম

আহমদ রফিক

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কৃষক ও সরকারের মধ্যস্থতায় নির্ধারিত হোক কৃষিপণ্যের দাম

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে স্বীকৃত। কৃষিপণ্য নানা রকমের হলেও প্রাধান্য ধানের। ধান থেকে চাল—ভাতখেকো বাঙালি গম বা আলুর, ক্বচিৎ ভুট্টার মতো খাদ্যের হিসাব মানেনি। আইয়ুব খান একবার বাঙালিকে ভুট্টা খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। খাদ্যবিজ্ঞানীর মতে, ভাতের চমৎকার বিকল্প আলু। ইউরোপে আলুর কদর কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু না, বাঙালি এসব তত্ত্ব কথায় ভোলে না, ভাতেই তার শান্তি—হোক তা পান্তা বা ধোঁয়া ওঠা গরম, মাঠে বা ডাইনিং টেবিলে।

সেই ভাতের মূল উপাদান অর্থাৎ জমির ফসল ধান, কৃষকের শ্রমের উৎপাদন, তার মূল্যমান নিয়ে, কৃষকের লভ্যাংশ নিয়ে আলোচনা ও লেখালেখি, হিসাব-নিকাশ ও মূল্যায়ন কম নয়। কারণ একটাই কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের আলোচ্য বিষয় আপাতত ধান।

কৃষক জমিতে ধান উৎপাদন করে যেমন দেশের মানুষের অন্ন জোগায়, তেমনি নিজের অন্ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করে উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশে। উৎপাদনের নিয়ম এমনই। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা হলো, কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে শিল্পপণ্যের নিয়মটা খাটে না। শিল্পপতিরা এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে। তাদের অর্থবিত্ত তাদের জন্য এই সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

শিল্পপণ্যের প্রকৃত উৎপাদক কারখানা শ্রমিক। কিন্তু পণ্যের পুরো এখতিয়ার কারখানা মালিকের। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও লভ্যাংশ তথা মুনাফা সবই মালিকের। যদি তুলনা টানা যায় তাহলে বলতে হয়, কারখানার মালিক ও জমির মালিক কৃষকের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। কিন্তু বাস্তবে আছে। এবং এটাই আছে যে শিল্পপণ্যের উৎপাদন-মালিক ধনিক ও অতিধনিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে জমির ফসল উৎপাদক নানাভাবে পীড়িত, শোষিত, অর্থনৈতিকভাবে দুস্থ। তার হাহাকার—‘উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবন দুর্বিষহ।’

দুই.

কেন এ বৈপরীত্য, কেন এ বৈষম্য, শাসনযন্ত্র কেন দেশের মূল উৎপাদক কৃষকের জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতি এতটা উদাসীন। কেন তাদের প্রতি নিরন্তর অবহেলা? কেন মধ্যস্বত্বভোগীদের যুক্তিহীন মুনাফাবাজি বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সরকারের উদ্যোগ নেই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।

বছর কয় আগে মেহেরপুর যাওয়ার পথে দেখেছিলাম, রাস্তার দুই পাশে ধানিজমিতে মাইলের পর মাইল তামাক পাতার সমারোহ। তখনই ভেবেছি, এ সর্বনাশা প্রবণতা বন্ধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র তৎপর নয় কেন? আজ যদি বঞ্চিত কৃষকসমাজ একাট্টা হয়ে বলে, ধানের বদলে আমরা তামাক চাষ করব, তাহলে এর পরিণামটা কী হবে। কিংবা যদি বলে, অন্য কোনো অপ্রধান ফসলের চাষ করব, তাহলে বাঙালি কী খেয়ে বাঁচবে?

তবে প্রধান খাদ্যটি কি পাল্টাতে বাধ্য হবে? নাকি আমদানিতে সে ঘাটতি পূরণ করা হবে?

ধান চাষি কৃষকদের দুরবস্থার বিবরণে সাংবাদিক মহল যে চিত্র তুলে ধরেছে তা রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক। কয়েকটি শিরোনামে তা পরস্ফুিট। চিত্রটি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ধৃত : ‘কৃষক বাঁচাতে জরুরি ধান ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান’, ‘কৃষকের ধান ও রোল মডেল রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা’, ‘কৃষককে বাঁচাতেই হবে’। পাশাপাশি অন্য হিসাব—‘বছরে খরচ বাড়ছে এক টাকা, দাম কমছে ছয় টাকা।’ অবস্থাটা তাহলে কোথায় দাঁড়াল?

এ বছর যখন ধান ওঠে তার পরপরই ছিল ঈদ। স্বভাবতই সংসারে বাড়তি খরচ। বাড়তি খরচ জোগানো দূরে থাক, নিয়মিত খরচই দূরে থেকে যাচ্ছে। তাই তাদের হা-হুতাশ, ‘হামার ঈদ কেমন করি হবে’, ‘কেনাকাটা এখন অসম্ভব ব্যাপার’, ‘এ কষ্ট কোনো দিনই ভুলতে পারব না’। এর মধ্যে এক সাংবাদিকের প্রতিবেদনের শিরোনাম : ‘আতাবুর-গফুরদের কষ্টের দিনলিপি’। শেষোক্ত প্রতিবেদনটি যশোর-খুলনা থেকে। আর পূর্বোক্ত শিরোনাম উত্তরবঙ্গ এবং কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে।

এদের প্রত্যেকের মুখে একই কথা। ধান চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, বিশেষ করে ধান কাটা ও ধান মাড়াইসহ যে খরচ আর ধান বেচার যা দাম তা কোনোভাবেই হিসাবে মেলে না। লাভ দূরে থাক, ধান ঘরে তোলার দাম পর্যন্ত ওঠে না সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্যে। প্রশ্ন, তাহলে ধান চাষ করে কৃষক কিভাবে সংসার চালাবে, বাড়তি খরচ কোত্থেকে দেবে কৃষক? ঋণ করে? ঋণ করে যে চাষের দাম মেটাতে হয়, সে পণ্য কেন সে উৎপাদন করবে?

তিন.

ধান চাষ ও ধান ফলনে খরচের যেসব পরিসংখ্যান পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ধান চাষের খরচ এবং ধান বিক্রির প্রাপ্তিতে বিরাট বৈষম্য, বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতা পরস্ফুিট। তদুপরি দেখা যচ্ছে, প্রতিবছর কৃষি মজুরি ও সেচ খরচ বাড়ছে সবচেয়ে বেশি। স্বভাবতই কৃষক বিপাকে। এ সমস্যা আরো বেশি বর্গাচাষিদের ক্ষেত্রে। কারণ যে কৃষক নিজের জমি চাষ করে সে তুলনায় যে অন্যের জমি বর্গাভিত্তিতে চাষ করে তার খরচ অনেক বেশি জমির মালিককে তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হয় বলে।

এ সমস্যা দূর করার পথে অনেক বাধা। প্রথমত, ধানের দাম নির্ধারণ। সরকার ধানের যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, তা কখনো যদি কৃষকের হিসাবে গ্রহণযোগ্যও হয়, তাহলেও বিকিকিনির প্রক্রিয়ায় ও লেনদেনে অশিক্ষিত-নিরক্ষর কৃষককে প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়তে হয়। কাজেই প্রত্যাশিত ফল মেলে না বহু শ্রমে ‘বাম্পার’ ফলন নিশ্চিত করা সত্ত্বেও। কারণ এর মধ্যে থাকে অনেক ফাঁকফোকর।

তা ছাড়া নিজের ভালো নিজে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা অনেক দরিদ্র ও নিরক্ষর কৃষকের থাকে না বলে তারা প্রায়ই প্রতারণা ও চাতুরীর সম্মুখীন হয়; বিশেষ করে যখন তাদের ধান পৌঁছে দিতে হয় সরকারি গুদামে। সেখানে অনেক অদৃশ্য হাতের কারসাজি। ধান বিক্রেতা কৃষক সেখানে অসহায়। লেনদেনে ঘাটতি বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তাই আমাদের দাবি, কৃষকের প্রতি সুবিচার করতে চাইলে সরকারকে উৎপাদকের কাছ থেকে সরাসরি কেনার পদ্ধতি চালু করতে হবে। সেটা ধান বা যেকোনো পণ্য হোক।

তার আগে প্রথম কথাটিতে আসি। শিল্প-কারখানার পণ্যের দাম কি সরকার নির্ধারণ করে দেয়? না, দেয় না। তাহলে ধানের দাম সরকার নির্ধারণ করবে কেন, করবে কৃষক তার খরচের ওপর লভ্যাংশ যোগ করে। এ লভ্যাংশের হার নিয়ে সরকারের সঙ্গে যুক্তিতর্ক, দর-কষাকষি চলতে পারে। এবং শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হোক দাম। যেমন—দৃষ্টান্তস্বরূপ ওষুধ উৎপাদনের খুচরা মূল্য নির্ধারণ।

এর একটি হিসাব-নিকাশ আছে। আছে যুক্তি ও বিশ্বব্যাপী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। আমি ভাবতে পারছি না, মূল্য নির্ধারণের এ দাবি কেন কৃষক এযাবৎ তোলেনি। কিংবা কৃষকবান্ধব রাজনীতিকরাই বা এ দাবি তোলেননি কেন? তাহলে তো সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের সমাধান হয়ে যায় অতি সহজেই। সরকার যেমন ওষুধের মূল্য নির্ধারণে ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চালু করেছে, তেমনি কৃষিপণ্যের জন্য অধিদপ্তর খুলতে পারে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে শুধু ধান নয়, সব কৃষিপণ্যেরই বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত হবে।

কিন্তু মূল্য নির্ধারিত হলেই চলবে না, কৃষক যাতে সেই নির্ধারিত মূল্য পায়, তাতে কোনো বাধাবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় অর্থাৎ সৃষ্টি করা না হয় তেমন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষক নিজের উৎপাদিত ফসল অর্থাৎ ধান বিক্রি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার না হয়। সে জন্য আমরা বলি—মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ধান বিক্রিতে যেন কৃষককে আবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে না হয়। তাই স্লোগান—‘কৃষকের খোলাম থেকে পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে নির্ধারিত মূল্যে ধান কেন, তাত্ক্ষণিক মূল্য পরিশোধ করো।’

এর মধ্যে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া চলবে না। মিল মালিককে ধান কিনতে হলে একই পদ্ধতিতে, একইভাবে নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনতে হবে কৃষকের খোলাম থেকে। আরো একটি বিষয় বিবেচ্য! কৃষককে যেমন বাম্পার ফলনে উৎসাহিত করা হয়, তেমনি তার শ্রমের মূল্য দিতে হবে তার জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে। আর সে বাম্পার ফলনে যদি দেশের চাহিদা পূরণ হয়, তাহলে সরকারকে অপ্রয়োজনীয় চাল আমদানি বন্ধ করতে হবে।

আমরা জানি, আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই কৃষকের ভালো-মন্দ হিসাব-নিকাশ না করে ব্যবসায়ীর স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ অব্যবস্থা অনেক দেখেছি পাকিস্তান আমলে, দেখেছি এর পরও। ইরিধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশক আমদানিতে দেখা গেছে অনেক অনিয়ম, বিষাক্ততার মাত্রায় নিষিদ্ধ কীটনাশক আমদানি ও ছাড়পত্র পেয়ে গেছে বিশেষ ব্যবস্থায়। পরিণামে মারা গেছে দুর্বল প্রজাতির অসহায় মৎস্যকুল।

শেষ কথা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তব্য হলো চাষবাসে কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতি অনুসরণ—সে নীতি হলো ‘কৃষক বাঁচাও, মধ্যস্বত্বভোগী ঠেকাও’ ধারার। মধ্যস্বত্বভোগীরা সেই ১৮ শতক থেকে কৃষকদের শোষণ শাসনের সহযোগী হয়েছে জমিদার মহাজনদের অনুসরণ করে। একালে তার চেহারা ভিন্ন হলেও শোষক চরিত্র একই রকম। এ ব্যবস্থার অবসান চাই।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা