kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

বিল্ডারবার্গ ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র

পেপি এসকোবার

১১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিল্ডারবার্গ ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভা লেকের পারে বিলাসবহুল ‘ফেয়ারমন লা মঁথু প্যালাস’ হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬৭তম বিল্ডারবার্গ গ্রুপ মিটিং। আয়োজন বেশ শান্ত ও ফুরফুরে ছিল, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বরাবরের মতোই অংশগ্রহণকারীদের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ছিল ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক। বাকিরা উত্তর আমেরিকার।

সভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়টি হলো, ‘স্থিতিশীল কৌশলগত ব্যবস্থা’, যার উদ্দেশ্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রণয়ন। অন্য বিষয়গুলো হচ্ছে—পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ, রাশিয়া, চীন, সামাজিক গণমাধ্যমের সামরিকীকরণ, ব্রেক্সিট, ইউরোপের জন্য করণীয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক নীতিবিদ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি।

২০১২ সাল থেকে বিল্ডারবার্গ গ্রুপের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান অঁরি দ্য ক্যাস্ত্রি। তিনি ফরাসি থিংকট্যাংক ‘আঁস্তিচু মুঁতাইন’-এর পরিচালক। আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি ছিলেন—ক্লিমঁ বোন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর ইউরোপ ও জি-২০ বিষয়ক পরামর্শক। ক্যাস্ত্রিরাই ম্যাখোঁর জন্মদাতা। তাঁরা প্রগতিশীলতার আলখাল্লা পরে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সেবা করছেন। একজন বিল্ডারবার্গ সোর্স জানিয়েছেন যে বৈঠকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনের ফলকে ‘বিজয়’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এবার তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, লিবারেল গ্রিন জোট বা ডানপন্থী জনপ্রিয়তাবাদীরা জিতুক। ইউরোপের বিজয়ী গ্রিনরা মার্কিন গ্রিনদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সবাই মানবিক সাম্রাজ্যবাদী (হিউম্যানিটারিয়ান ইমপেরিয়ালিস্টস), এ নতুন পরিভাষার প্রস্তাবক একজন বেলজীয় পদার্থবিজ্ঞানী—জঁ ব্রিক্মঁ। বিল্ডারবার্গ গ্রুপ চায় ছদ্ম বামপন্থীরা ইউরোপীয় পার্লামেন্ট পরিচালনা করুক, যেমন ক্যাস্ত্রি পরিচালনা করছেন তাঁর শিষ্য ম্যাখোঁকে। তাদের কাজ হলো—‘জাতি-রাষ্ট্র ধ্বংসপ্রক্রিয়া’কে সচল রাখা।

এবারের বিল্ডারবার্গ বৈঠকের উপযোগিতা কী? ট্রাম্প প্রশাসন কেন হঠাৎ ইরানের সঙ্গে শর্তহীন আলোচনার সিদ্ধান্ত নিল, তার ব্যাখ্যাতেই এর উপযোগিতা নিহিত। উপযোগের বিষয়টি হলো হরমুজ প্রণালি। এটি বন্ধ করে দেওয়া হলে ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও ইরানের তেল ও গ্যাসপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বের তেল চাহিদার ২০ শতাংশ এ পথেই সঞ্চালিত হয়। এ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে—এমনটি কি সত্যি ঘটবে? সন্নিহিত এলাকায় মোতায়েন করা মার্কিন পঞ্চম নৌবহর তেহরানকে এ কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারবে কি?

মার্কিন একটি সূত্র জানিয়েছে, বেশ কিছু সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডেস্কে জমা পড়েছে এবং ওয়াশিংটনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সমীক্ষাপত্রে বলা হয়েছে, কারণ যা-ই হোক, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে ইরানের ক্ষতি তেমন নেই। বরং তার সক্ষমতা রয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় আঘাত হানার; ডেরাইভেটিভ ট্রেডের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেওয়ার। গত বছর ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টস (বিআইএস) বলেছিল, ডেরাইভেটিভস বাণিজ্যের জন্য যে পরিমাণ অর্থ সঞ্চালন করা সম্ভব, তার পরিমাণ ৫৪২ ট্রিলিয়ন ডলার; যদিও গ্রস মার্কেট ভ্যালু ধরা হয়েছিল মাত্র ১২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আবার কারো হিসাবে এ পরিমাণ এক হাজার ২০০ ট্রিলিয়ন বা তার বেশি।

তেহরান অবশ্য এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেনি। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিপ্লবী গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সুলাইমানি এ নিয়ে কথা বলেছেন। সেসব কথা যথাযথভাবে ইরান পরমাণু চুক্তির তিন ইউরোপীয় সদস্য ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির কানে তোলা হয়েছে। এতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তেলবিষয়ক ডেরাইভেটিভ বিশেষজ্ঞরা ভালো করেই জানেন, যদি পারস্য উপসাগরে জ্বালানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, এর অভিঘাতে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২০০ ডলারে পৌঁছতে পারে। সময় দীর্ঘায়িত হলে বেশিও হতে পারে। আর এর ফল অভাবিত মাত্রায় বৈশ্বিক মন্দা। ট্রাম্পের অর্থমন্ত্রী মনুচিনের এ কথা ভালো জানার কথা।

ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, ট্রাম্পও হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের কোনো কৌশলগত গুরুত্ব নেই। পূর্বোক্ত মার্কিন সোর্সের মতে, তিনি মুখ রক্ষার উপায় খুঁজছেন; তাঁর পরামর্শক বোল্টন ও পম্পিও তাঁকে যে পথে নিয়ে গিয়েছিলেন সে পথ থেকে বেরিয়ে আসার পথ সত্যিকার অর্থেই খুঁজছেন। ওয়াশিংটনের এখন মান বাঁচানের উপায় দরকার। ইরান আলোচনার কথা বলছে না, বলছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ পরিপ্রেক্ষিতেই সুইজারল্যান্ডে বিল্ডারবার্গ সভাস্থলের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিওর সূচিবহির্ভূত বিরতির প্রসঙ্গ এসে হাজির হয়। খোঁজখবর রাখেন এমন যে কেউ বলে দিতে পারবেন, তিনি ট্রান্স আটলান্টিক এলিটদের আতঙ্ক কমানোর উপায় হন্যে হয়ে খুঁজছেন। তিনি সুইসপক্ষের (যাঁরা ওয়াশিংটনের অনুমোদন সাপেক্ষে ইরানের প্রতিনিধি) সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকও করেছেন। এত হুমকি-ধমকির পর ওয়াশিংটন এখন বলছে, কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় তারা এবং সে কথা সুইজারল্যান্ড থেকেই বলা হলো।

লেখক : ব্রাজিলীয় সাংবাদিক, দি এশিয়া টাইমস অনলাইনের নিয়মিত লেখক

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য