kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

যুক্তরাজ্য কি ‘বিশেষ’ সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছে?

টম ডিগান

১১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যুক্তরাজ্য কি ‘বিশেষ’ সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছে?

তারেক রহমান একজন বিত্তবান বাংলাদেশি নাগরিক। লন্ডনে পরিবার নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ জীবনযাপন তাঁর। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাসিত নেতা। কিন্তু এত সম্পদ তিনি অর্জন করলেন কী করে? সুন্দর, রসালো আমের জন্য বাংলাদেশ বিখ্যাত। সেই আম বিক্রি করে? না। দুর্নীতির মাধ্যমে।

মা খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন তারেক রহমানের পরিচয় ছিল ‘মিস্টার টেন পারসেন্ট’ হিসেবে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশে ১৯৯১-১৯৯৬ সাল এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এই বছরগুলো মিস্টার টেন পারসেন্টের জন্য অত্যন্ত ফলবতী ছিল। কারণ ওই সময় বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সবাই জানতেন, যেকোনো সরকারি কাজের টেন্ডার পাওয়ার জন্য তারেকের মাধ্যমেই এগোতে হবে। এর জন্য মূল চুক্তির ১০ শতাংশ অর্থ তারেককে দিতে হবে। এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ কামিয়েছেন তারেক রহমান।

বাংলাদেশের একটি আদালত গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৭২ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তহবিল তছরুপের অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। মামলায় বলা হয়, একটি এতিমখানা ট্রাস্টের তহবিল থেকে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা তছরুপ করা হয়েছে। একই মামলায় তাঁর ছেলে তারেক রহমানও অভিযুক্ত হন। তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরো চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বয়স এবং সাবেক অবস্থান বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে সাজার মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া হয়।

তারেকের বিরুদ্ধে আনা আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা। হাসিনা রাজনৈতিকভাবে তারেকের পরিবারের চরম শত্রু। ২০০৪ সালে ঢাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাসহ কয়েক শ সমর্থকের ওপর এক দল সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এ হামলায় তারা সামরিক ধাঁচের গ্রেনেড ব্যবহার করে। এতে ২৪ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হয়। ওই দিন আহত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হাসিনা।

তদন্তে জানা যায়, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী নামে একটি জঙ্গিগোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের দৃষ্টিতে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত এই গোষ্ঠীর সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় ৪৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও ছিলেন। আরো ছিলেন দুই সাবেক মন্ত্রী।

রায়ে পলাতক আসামি মিস্টার টেন পারসেন্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগেরই ফৌজদারি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার জোরালো অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রত্যাবর্তন চাইলেও যুক্তরাজ্য সরকার তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করে। একই সঙ্গে কর্নেল শহিদ উদ্দিন খানকেও রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। তাঁকেও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি ছিল সরকারের।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে তারেক রহমান যে দাবি করেছেন তার যৌক্তিকতা সামান্যই। তবে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী ও বিএনপির যে তীব্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল, তা নিশ্চিত। হামলার মুখ্য উদ্দেশ্যও সেটাই। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। বাংলাদেশে যিনি বঙ্গবন্ধু নামেই অধিক পরিচিত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি বুঝতে গেলে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসও জানতে হবে। তাহলে বিভাজনের মূল কারণ বোঝা সহজ হবে।

কিন্তু ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পায় শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ। দেশের সরকার গঠন করার কথা ছিল তাদেরই। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলদের মনে ছিল অন্য কিছু। তারা নতুন সরকার গঠনের জন্য শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আড়ালে আওয়ামী লীগসহ অন্য নেতাদের হত্যা করার পরিকল্পনা করে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অপারেশন সার্চলাইট নামে অভিযান শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে হত্যা করা। ওই রাতে গুলির শব্দে হাজারো মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি। অপারেশন সার্চলাইটের পর প্রথম কয়েক দিনেই হিন্দু সংখ্যালঘুদের বহু সদস্যকে হত্যা করা হয়। ৯ মাস ধরে যুদ্ধ চলে। বহু বাঙালি নিহত হয়। অন্তত এক কোটি লোক প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বাঙালিরা প্রতিরোধে নামে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তারা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ এক অধ্যায়ের জন্ম নেয়।

এখানে বুঝতে হবে সব বাঙালিই কিন্তু আওয়ামী লীগ বা মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন দেয়নি। যুদ্ধে পাকিস্তানিদের পক্ষ নেয় মুসলিম লীগ, জামায়াত ও সংখ্যালঘু বিহারিরা। বাঙালিদের ওপর তারাও নির্যাতন চালায়। এই বিভেদই আজও রয়ে গেছে বাংলাদেশে।

একাত্তরে পাকিস্তান ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা বহু যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়। আত্মসমর্পণের শর্ত অনুসারে ভারত পাকিস্তানের সব সেনাকে মুক্তি দেয়। ফলে খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধের জন্য তাদের কোনো বিচার হয়নি। তবে পাকিস্তানি সেনাদের স্থানীয় সহযোগীদের এসব অপরাধের কারণে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন। যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই তখন দেশে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং বিএনপির সদস্য ও সম্পদশালী। ফলে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগেই হাসিনাকে হত্যা করার যৌক্তিক কারণ ছিল তাঁদের। সম্ভবত এ কারণেই তারেক রহমান ও তাঁর বিএনপির সহযোগীরা গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করে।

পরে প্রধানমন্ত্রী হলে শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেন। একাত্তরের ভূমিকার জন্য বেশ কয়েকজন জামায়াতে ইসলামী নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। অন্যদের পাঠানো হয় কারাগারে। আরেক অপরাধী কর্নেল শহিদ উদ্দিন খান ছিলেন ব্রিটেনে। সম্প্রতি লন্ডনে দুটি বাড়ি কেনেন তিনি। এগুলোর দাম প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড। তাঁর অর্থের সূত্র স্পষ্ট নয়। তবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ধারণা, তিনি জিহাদি জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করেন। ২০০৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগে কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হন। তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে স্বাক্ষর জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তাঁর সঙ্গে নিয়মিত চরমপন্থী গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল। অধিকতর তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আরো অপরাধ তৎপরতায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাস, ধর্ষণ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা ও অর্থপাচার। সম্প্রতি ঢাকায় তাঁর এক বাসভবনে অভিযান চালিয়ে পুলিশ অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, জাল মুদ্রা ও জিহাদি বই উদ্ধার করে। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ দাখিল করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এবং তাঁর এই মর্যাদা থাকা পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা হবে না তাঁকে।

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ব্রিটেনের মতোই এর বিচারব্যবস্থা রয়েছে। ব্রিটেনের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। চমৎকার একটি বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। ফলে বাংলাদেশের দুজন অপরাধীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে এই সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের উচিত ওই দুই ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। তাঁরা স্পষ্টভাবেই অপরাধ তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত।

লেখক : রাজনীতি ও সামরিক প্রসঙ্গের লেখক

সূত্র : এশিয়ান অ্যাফেয়ার ডট ইন

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য