kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ কেন প্রয়োজন

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ কেন প্রয়োজন

বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের উন্নয়ন যেমন এগিয়ে চলেছে, তেমনি জনগণের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটাও বড় হচ্ছে। সংগত কারণেই জনসাধারণের প্রত্যাশার শতভাগ বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। একজন সাধারণ মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে নির্বাচনী রাজনীতিতে যে ধরনের ভূমিকা রাখেন, সেটির তুলনা হয় না। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পছন্দের প্রার্থীকে ভোটাররা যেভাবে নির্বাচনে বিজয়ী করার চেষ্টা করেন, সেভাবে নির্বাচিতরা এর প্রতিদান দিতে পারেন না। ফলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ সমর্থক কিংবা ভোটারদের দাবিদাওয়া কিংবা চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি পূরণ না হলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। এমনকি একজন সংসদ সদস্য সাধারণদের সঙ্গে অনেক সময় যথাযথ আচরণ করেন না।

জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তাঁদের আচরণ মানুষকে তথা ভোটারকে প্রভাবিত করে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিতদের সতর্ক থাকা সাধারণের চেয়ে অত্যধিক। যাঁরা আইন প্রণয়ন করেন, জনগণের সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করেন, তাঁদের আচরণ যদি স্বাভাবিক ও উন্নতমানের না হয়, তবে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতেও পারে এবং হয়ও। নির্বাচনকালে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদ সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়ে অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছে না। ইস্যুটি জনগুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কেন চাপা পড়ে গেছে এমন প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। উল্লেখ্য, ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তথা রাজনীতিবিদদের জন্য ‘একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণের’ সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছিল। অবশ্য একাদশ নির্বাচনের ইশতেহারে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ন্যায্যতা তৈরি হয়েছে।

আমাদের দেশে প্রায়ই যে সমস্যাটি লক্ষ করা যায় সেটি হলো—নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাঁদের আচরণ এবং ভূমিকা কিছুটা পরিবর্তন করেন। নির্বাচনের অব্যবহিত আগে যে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন জনগণের সামনে, ঠিক সে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। এমনকি যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন তাঁদের বেশির ভাগেরই আশপাশে বেশ কিছু লোক থাকেন, যাঁরা একধরনের অলিখিত উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি তাঁর নিজের দাবিদাওয়া কিংবা সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারেন না। ক্ষেত্রবিশেষে যথাযথ মাধ্যম ব্যবহার করলে হয়রানি কিংবা আইনের মারপ্যাঁচে পড়ার সুযোগ কমে যায়। কিন্তু তথাকথিত মাধ্যম ব্যবহার করতে না পারলে মারপ্যাঁচে পড়ার সুযোগ থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় লক্ষ করা যায় যে অর্থনৈতিক উেকাচ বিনিময়ের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের ন্যায্য দাবি বা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে তথাকথিত উপদেষ্টা নামধারীরা সচেষ্ট হন। আবার অনেক সময় দেখা যায়, যে কাজটি একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজে থেকেই ন্যায্যতার মাপকাঠিতে করতে পারেন কিন্তু তিনি তা না করে জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে টালবাহানা করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অনেক সময় জনপ্রতিনিধি না বলা পর্যন্ত ন্যায্য কাজটিও অন্যায্যের তালিকায় পড়ে থাকে।

অনেক সরকারি দপ্তরে কাজ করতে গেলে সাধারণদের হয়রানি হতে হয়—এ বিষয়ে সর্বজনবিদিত একটি ধারণা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অন্য কোনো বিদ্যালয়ে শূন্যপদে বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের আদেশ থাকা সত্ত্বেও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেছনে বারবার ধরনা না দেওয়া পর্যন্ত ওই বদলির কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রেও যিনি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সংসদ সদস্যের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তাঁর কাজটি খুব সহজেই হয়। অথচ এ ক্ষেত্রে এই কাজে সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা মোটেও নেই। কিন্তু এ ধরনের প্র্যাকটিসের ফলে সংসদ সদস্যদের অজান্তেই তাঁদের আশপাশের উপদেষ্টা নামধারী অথবা ব্যক্তিগত সহকারীরা অর্থনৈতিক উেকাচ বিনিময় করেন। ফলে সারা দেশে কিছু কিছু বিষয়ে দলাদলি, স্বজনপ্রীতি, তদবির বাণিজ্যেও সুযোগ থেকে যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই সুশাসনের জন্য ইতিবাচক নয়।

এসব কারণেই বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতা বা দুর্নীতি রোধ এবং তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ রয়েছে। ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স, ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভা, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের জন্য আইন রয়েছে। বাংলাদেশে তা হয়নি ৪৮ বছরেও। ২০১০ সালে তৎকালীন সংসদে সরকারি দলেরই একজন সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বেসরকারি বিল আকারে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন। বিলটি আইন হিসেবে পাসের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল—জনগণের প্রতি সংসদ সদস্যদের যে দায়দায়িত্ব রয়েছে তার প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশেও একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে। সুশাসনে অগ্রগতি ও জবাবদিহির জন্য সংসদ সদস্য আচরণ বিষয়ে একটি বিল ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি সংসদে পেশ করা হয়েছিল। বিলের বিভিন্ন ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো সুপারিশ করবেন না, নিজ বা পরিবারের সদস্যরা আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবেন না। তাঁরা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। এমনকি সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান ও দায়দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান, উপঢৌকন বা সেবা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, গোপনীয় তথ্যের ব্যবহার করবেন না। বাক্স্বাধীনতা, সংসদ সদস্য বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা, নৈতিক কমিটি ও আচরণ আইনের প্রয়োগ, আইন লঙ্ঘনের শাস্তি, নৈতিকতা কমিটির কার্যকালসহ বিভিন্ন বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সেই আইনটি আজও আলোর মুখ দেখেনি বিধায় কিছু কিছু বিষয়ে সাধারণ জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে হয়রানির শিকার হতে হয়।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য