kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

ওপিসিডাব্লিউ সিরিয়া এবং গ্যাস হামলা

রবার্ট ফিস্ক

৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওপিসিডাব্লিউ সিরিয়া এবং গ্যাস হামলা

অধিপতিদের ওপর আস্থা রাখতে পছন্দ করি আমরা। কিন্তু মাকাল নেতাদের (যেমন ট্রাম্প, মে বা ইউরোপের জাতীয়তাবাদী নেতারা) মিথ্যাচারের টুইটে আমরা আর আস্থা রাখি না। আবার আমলাতান্ত্রিকতা ও দুর্নীতি সত্ত্বেও জাতিসংঘ যখন বলে, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখীন, তখন তাদের কথা আমরা বিশ্বাস করি। যখন আন্তর্জাতিক রেডক্রস আফ্রিকায় মানবিক বিপর্যয় ঘটবে বলে সতর্ক করে তখন তা সত্য বলে ধরে নিই; এবং যখন অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রিভেনশন অব কেমিক্যাল উইপনস (ওপিসিডাব্লিউ) সিরিয়ায় ক্লোরিন গ্যাস হামলার বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়, আমরা ধরে নিই সত্য কথাই শুনছি; সত্য ছাড়া আর কিছু নয়।

কিছুদিন ধরে বেদনাদায়ক প্রমাণাদি নিয়ে কথা হচ্ছে। গত বছর সিরিয়ার দৌমা শহরে সরকারি বাহিনীর কথিত রাসায়নিক হামলার বিষয়ে ওপিসিডাব্লিউ তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১৫ পৃষ্ঠার একটি ভিন্নতর মূল্যায়নপত্র পুরোপুরি চেপে গেছে। ওপিসিডাব্লিউর দাপ্তরিক ভাষ্য হচ্ছে, ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল ছোড়া ক্যানিস্টারগুলো সম্ভবত বিমান থেকে ছোড়া হয়েছিল। সম্ভবত হেলিকপ্টার থেকে এবং সম্ভবত এগুলো সিরীয় বাহিনী ছুড়েছিল। কিন্তু ভিন্নতর মূল্যায়নপত্রে, যার কথা ওপিসিডাব্লিউ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি। বলা হয়েছে, ওগুলোকে উল্লিখিত দুটি স্থানে পেতে রাখার সম্ভাবনাই বেশি।

ওপিসিডাব্লিউর এ কারিকুরিকে অগ্রাহ্য করা কঠিন। সংস্থাটি বলেছে, তাদের টেকনিক্যাল সেক্রেটারিয়েট ওই দলিলের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রকাশের বিষয়ে অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে। পরে বলা হয়, এ মুহূর্তে লোকজনকে জানানোর মতো তথ্য তাদের কাছে নেই। এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়ার অবকাশও তাদের নেই। এটা তাদের একটা কৌশল বলা যায় এবং এখন পর্যন্ত সেটি কাজ করেছে। চেপে রাখা দলিল নিয়ে এর আগে যারা রিপোর্ট করেছিল তারা ফলোআপ রিপোর্ট এখন পর্যন্ত করেনি।

ধরে নেওয়া যেতে পারে, ওপিসিডাব্লিউ এ বিষয়ে কথা বলবে না। এখন তারা যা করতে পারে তা হলো, যে দলিল তারা গোপন রাখতে চেয়েছিল তার প্রকাশককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, ওপিসিডাব্লিউ তার সিন্দুকের তালা বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে আর বেশি তথ্য গণমাধ্যমের হাতে না যায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই সেন্সরশিপের কারণে পাশ্চাত্যবিরোধী প্রচারণার বিপুল সুযোগ হয়েছে। রাশিয়া টুডে তার দর্শকদের জানাচ্ছে, ন্যাটোপক্ষ কিভাবে ওপিসিডাব্লিউকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমেরিকার অনেক ওয়েবসাইটেও ভিন্নতর মূল্যায়নপত্র নিয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার প্রতারণা আমাদের একটি উপসংহারের দিকেই নিয়ে যেতে পারে—অন্তরালে কী ঘটেছে তা জানতে হলে আরো একবার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও চেলসিয়া ম্যানিংয়ের এবং উইকিলিকসের শরণ নিতে হবে।

দৌমা হামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দেখা উচিত। ঘটনাস্থল থেকে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, মৃত্যুপথযাত্রী লোকজন মুখে ফেনা তুলছিল। দামেস্ক গ্যাস হামলার কথা অস্বীকার করে, রাশিয়াও। আর হামলার প্রমাণ রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স সিরিয়ায় বোমা হামলা চালায়। গ্যাস হামলা করে সিরিয়া শিশু ও নারী হত্যা করেছে বলে টেরেসা মে মুখে ফেনা তোলেন। দৌমার আগেও সিরিয়া সরকার বেশ কয়েকবার গ্যাস হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদন ছাপা হয়। দৌমার ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক সংকটের জন্ম হয়। সিরিয়ার একটি বৈজ্ঞানিক কেন্দ্রে আমেরিকা ক্রুজ মিসাইল হামলা চালায়।

পরে ওপিসিডাব্লিউ তার প্রতিবেদনে বলে, ওখানে সারিন গ্যাস হামলা হয়নি। তবে যে দুটি ক্যানিস্টার পাওয়া গেছে সেগুলো দেয়াল ভেদ করে ঢুকেছে। দুটিই ক্লোরিন গ্যাসের উৎস। ওগুলো আকাশ থেকে ছোড়া হয়। কিন্তু ভিন্নতর মূল্যায়নপত্রে বলা হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং টিম নিশ্চিত নয়, ওগুলো বিমান থেকে ছোড়া হয়েছিল। খুব সম্ভবত ওগুলো পেতে রাখা হয়েছিল। বোমা হামলার পরই কেউ ওগুলো পেতে রেখে এসেছিল। কারণ প্রথম ফুটেছে দেখানো বোমা দুটি সিরীয় ও রুশ বোমা হামলার আগের। অতএব বলা যায়, সম্ভবত আসাদবিরোধীরা পরের দুটি ক্যানিস্টার পেতে রেখে এসেছিল।

ওপিসিডাব্লিউ অন্তত বলতে পারত, বেশির ভাগ বিশ্লেষক বলেছেন, ক্যানিস্টারগুলো বিমান থেকে ছোড়া, তবে একটি অংশ বলেছে, ওগুলো ছোড়া হয়নি। ওপিসিডাব্লিউ অসাধুতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা ইরাকে মানববিধ্বংসী অস্ত্র আছে—এ প্রচারণার ফল দেখেছি। পরে বলা হয়েছে, ইরান ডাব্লিউএমডি তৈরি করছে। এখন যদি বলা হয়, সিরিয়া আবার গ্যাস হামলার পরিকল্পনা করেছে, তাহলে কী বলার থাকতে পারে! বলেছেও, গত ১৯ মে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলেছে, সিরিয়া আবারও ক্লোরিন গ্যাস হামলা চালাবে।

লেখক : দি ইনডিপেনডেন্ট ইউকের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

সূত্র : কাউন্টারপাঞ্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য