kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ইরানকে দোষ দেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না

রিচার্ড গলুস্টিয়ান

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইরানকে দোষ দেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না

কংগ্রেসওমেন তুলসি গ্যাবার্ড কি মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই একমাত্র শুদ্ধাচারী বক্তা? তাঁর মতে, ইরানের সঙ্গে যদি যুদ্ধ বাধে তাহলে ইরাক যুদ্ধকে যুদ্ধ বলেই মনে হবে না; এর চেয়ে সহজ যুদ্ধ যেন আর হয় না। 

রাশিয়ান রোলেট একটি সম্ভাবনার খেলা। এ খেলায় অংশীদের প্রত্যেকে রিভলবারের সিলিন্ডার আকৃতির গুলির খাঁচা ঘুরিয়ে (এতে একটি গুলি থাকে, যদিও ছয়টি গুলি রাখা যায়) মাজল (আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যারেলের খোলা প্রান্ত) নিজের মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার চাপেন। রিভলবারের ছয় কুঠুরির গুলির খাঁচার একটি কুঠুরিতে মাত্র একটি বুলেট থেকে থাকলে বিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ১৬.৬৭ শতাংশ। প্রত্যেক অংশীই বুলেটের খাঁচা ঘুরিয়ে খেলা শুরু করেন। ফলে গুলির আঘাতে প্রত্যেকের মৃত্যুর সম্ভাবনাই সমান।

রাশিয়ান রোলেটের মতো একটি বিপজ্জনক খেলা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে যদি থাকত, তাহলে বলতে হয় খেলাটি শুরু হয়েছে। সেটি শুরু হয়েছে গত ৮ মে। সেদিন ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সম্পাদিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর এক বছর পূর্ণ হয়।

ওই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী বাকি পাঁচ দেশ হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন। তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, পুরো একটি বছর ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে ইরান। কাঙ্ক্ষিত কালপর্ব এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।

ওই পাঁচ দেশ শুধু ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত রদ করানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়নি; যুক্তরাষ্ট্র নিজেও যুদ্ধতুল্য আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে হেঁটেছে এবং পারস্য উপসাগরে বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে।

ওই পাঁচ বৃহৎ শক্তি পরমাণু চুক্তি সম্পাদন বাবদ ইরানের সুবিধাপ্রাপ্তি পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ চুক্তির সব শর্ত মেনেছে ইরান; বারংবার এ কথা স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কর্তৃপক্ষ (আইএইএ)। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী হিসেবে শুধু রাশিয়া ও চীন ইরানকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করছে। বাকি তিন ইউরোপীয় দেশ শুধু বাকোয়াজি করেছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি।

এসব অসুবিধা সত্ত্বেও গত বুধবার (১৫ মে) প্রেসিডেন্ট রুহানি ঘোষণা করেন, যদি চুক্তির বাকি স্বাক্ষরকারীরা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তির শর্তানুযায়ী ইরানের কৃতিত্ব স্বীকার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে চুক্তিমাফিক আরোপিত শর্ত আর মানবে না। শুরুতেই ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা ও ভারী পানির রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখার শর্ত অগ্রাহ্য করবে।

এই ৬০ দিনের পর ইরানের সমস্যাগুলো আমলে না নিলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ৩.৬ শতাংশ সীমা মান্য করা হবে না; একই সঙ্গে আরাকের হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টরের কাজ আবার শুরু করা হবে। ইরান নিজে পরমাণু চুক্তি থেকে সরতে চায় না; তারা শুধু পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা চুক্তির ২৬ ও ৩২ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ধারায় বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো একটি বা একাধিক চুক্তি মানতে ব্যর্থ হলে ইরান নিজস্বার্থে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

রুহানি নির্দিষ্ট করে বলেছেন, তাঁদের মূল চিন্তা তেলশিল্প ও ব্যাংক খাত নিয়ে, যা ওয়াশিংটনের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য। ১২০ দিন পর, এর মধ্যে ইরান সীমাতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আরাক আবার চালু করলেও বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আরো ৬০ দিন সময় দেবে বোঝাপড়ার জন্য। এ সময়ের মধ্যে যদি নিরাপত্তা পরিষদের পুরনো অবরোধ আবার আরোপ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে এমন যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছরের ৮ মে যা করেছেন, তা ঘৃণ্য একটি খেলা। ইরানও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে পাল্টা চাল হিসেবে। সে পাল্টা চালের দ্বিতীয় রাউন্ড সম্পন্ন হয়েছে। যে ব্যবস্থা ইরান নিয়েছে তা হলো—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা না মানা এবং ভারী পানির মজুদের সীমা না মানা। তবে এগুলো একতরফা ব্যবস্থা নয়। এটি আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের গত সপ্তাহে নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিফল। তারা ইরানের অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ ও ভারী পানি মজুদের কারণে অন্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইসরায়েল বলতে চাইছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক কৌশলগত হুমকি। ট্রাম্পকে ইসরায়েলের এ মিথ্যাচারে কান দেওয়া বন্ধ করতে হবে। মার্কিন প্রশাসন থেকে সব নিওকনকে তাড়াতে হবে; জুনের আগেই তা করতে হবে। এর চেয়ে সোজা কথা বলা যায় না।

 

লেখক : রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক; প্রাবন্ধিক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা