kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

কালান্তরের কড়চা

ভারতের নির্বাচন এবং বাংলাদেশ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের নির্বাচন এবং বাংলাদেশ

ভারতের সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন নির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সঙ্গে ২০১৯ সালের নির্বাচনের পার্থক্য এই যে ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার আগেই ভারতবাসী জানত নরেন্দ্র মোদির বিজয়রথ  (Chariot of victory) এখন ভোটদাতাদের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে দিল্লিতে ঢোকার জন্য অপেক্ষমাণ। এবারের নির্বাচনের আগে ও পরে কেউ তা অনুমান করতে পারছে না। সবাইকে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার জন্য। ২৩ মের মধ্যে এই ফল জানা যাবে।

গতবার নির্বাচনের ফল ঘোষিত না হতেই নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর মতো কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিলেন। দরিদ্র ও দলিত মানুষকে অনেক আশার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলেন। বিজয়োল্লাসে মেতেছিলেন বিজেপির কর্মী ও নেতারা। এবার তার কিছুই নেই। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি মলিন মুখে কেদার বদ্রি মন্দিরে গেরুয়া বস্ত্রে শরীর ঢেকে দেবতাদের কাছে জয়ভিক্ষা করে পূজায় বসেছেন। তাঁর দলের সভাপতি অমিত শাহ্ গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরে মাথা ঠুকেছেন। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও আগেরবারের উৎসাহ ও উদ্দীপনা নেই।

গতবারের নির্বাচনে মোদি-হাওয়ার দাপটে তেমন দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি। এবার হয়েছে। বহু এলাকায় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। এ জন্য পারস্পরিক দোষারোপ চলছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন বলে রাহুল গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিযোগ তুলেছেন। নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যেও এ ব্যাপারে ঐকমত্য নেই। কমিশনের একজন সদস্য এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষপাতী। অন্য দুজন তা নন। তাঁদের ‘মোদির ক্রীড়নক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলগুলো থেকে। অর্থাৎ ভারতের নির্বাচন কমিশনও বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। নির্বাচন তদারকির জন্য নিয়োজিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এত সবকিছু সত্ত্বেও পর্যবেক্ষকদের অনেকের প্রেডিকশন হচ্ছে, মোদি তাঁর পাঁচ বছরের শাসনের অনেক বড় ব্যর্থতা সত্ত্বেও মূলত হিন্দুত্ববাদের প্রসার এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ-উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনৈতিক ফায়দা নিয়ে এবারও নির্বাচনে জয়ী হবেন। তবে একক শক্তিতে সরকার গঠন করতে পারবেন না। তাঁকে সরকার গঠনে সঙ্গী জোগাড় করতেই হবে। এ কথা কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলোর জোট সম্পর্কেও সত্য। যদি এবারের নির্বাচনের ফল বিজেপির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীদেরও কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হবে। দেশি-বিদেশি কিছু পর্যবেক্ষকের এ ধারণা কতটা সঠিক, তা আগামীকালই জানা যাবে।

ভারতের এবারের নির্বাচনের ফল তার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে যে প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করুক, বাংলাদেশের তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বিজেপি অথবা কংগ্রেস যে দলই ক্ষমতায় আসুক, হাসিনা সরকার তাদের খোলা মনে অভিনন্দন জানাতে পারবে। ভারতের দুটি বৃহৎ দল বিজেপি ও কংগ্রেস—দুটি দলের সঙ্গেই শেখ হাসিনার উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বিজেপির নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধী দুজনের সঙ্গেই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। সুতরাং ভারতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কোনো ব্যত্যয় ঘটাবে না।

বাংলাদেশ-ভারত ট্র্যাডিশনাল সম্পর্ক নিয়ে ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের নিবিড় সম্পর্ক। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে সাহায্য দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক দল। সুতরাং বাংলাদেশের আধা-সাম্প্রদায়িক দল বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকবে। বাস্তবে এ ধারণাটি সঠিক হয়নি। অটল বিহারি বাজপেয়ির সরকারের আমলে বিএনপির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক থাকার কথা বাজারে চালু থাকলেও নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে এ মিথটি সঠিক নয় প্রমাণ করেন।

২০১৪ সালে ভারতে সাধারণ নির্বাচনের সময় লন্ডনে বসে বিএনপির তারেক রহমান মোদিকে আংকল সম্বোধন করে বাংলাদেশে তাঁর সমর্থন কামনা করে চিঠি লেখেন এবং নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তাঁকে আগাম অভিনন্দন জানান। বাজারেও এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল যে দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ঢাকায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা দুরূহ হবে। এ আশায় ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচনে বিজেপি বিশাল বিজয় অর্জন করলে বাংলাদেশে বিএনপি রাস্তায় রাস্তায় মিষ্টি বিতরণ করে এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে উৎসব করে। তারা একবারও ভেবে দেখেনি, নরেন্দ্র মোদি হিন্দুত্ববাদের সমর্থক হলেও তিনি একজন ঝানু রাজনীতিক। গুজরাটে তিনি ১৩ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের স্বার্থটাকেই আগে দেখবেন।

বিএনপি যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের দ্বারা  প্রভাবিত; ভারতবিদ্বেষ প্রচার তাদের মূল রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য জুগিয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন চলাকালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়েছে, পূর্ণিমা শীলের মতো নারীরা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, ভারতের দাউদ ইব্রাহিমের মতো সন্ত্রাসী ধনীদের সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কারো কারো সুসম্পর্ক আছে—এসব কথা নরেন্দ্র মোদির অজানা ছিল না।

মোদি বিএনপিকে  অবজ্ঞা করেননি। কিন্তু সম্পর্ক শক্ত করেছেন হাসিনা সরকারের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ঢাকা সফর করেছেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকালের অমীমাংসিত সমস্যা (স্থলসীমান্ত চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল বিনিময় ইত্যাদিসহ) মীমাংসা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাগড়া দেওয়ায় মোদি সরকার তিস্তার পানি সমস্যার সমাধান এখনো করতে পারেনি; কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে তিনি আন্তরিকতা দেখিয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফা প্রধানমন্ত্রী হলে তিস্তাসহ অন্যান্য সমস্যারও যে সমাধান হবে, তা আশা করা যায়।

অন্যদিকে নির্বাচনে কংগ্রেস বা অন্য কোনো আঞ্চলিক জোট সুবিধা করলে বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কংগ্রেস ও নেহরু-ইন্দিরা পরিবারের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, পারিবারিকও। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শেখ হাসিনা দিল্লিতেই ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে বেশ কিছুকাল ছিলেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিসহ কংগ্রেসের অনেক শীর্ষ নেতাই শেখ হাসিনার শুভাকাঙ্ক্ষী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে শেখ হাসিনা অবশ্যই রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন। কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে মিত্রতা—এই নীতিটিকে তিনি সাফল্যের সঙ্গে তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে কার্যকর করেছেন। ফলে ভারত ও চীন এবং আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে একই সময়ে তিনি দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা আদায় করতে পারছেন। আর এই গুণটি যেকোনো সমস্যা ও সংকটের সময় দেখা গেছে। মন্ত্রী ও আমলাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি নিজে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সংকট মোচন করেছে।

বিডিআর বিদ্রোহের সময় তাঁর সাহস ও ধৈর্য আমরা দেখেছি। আবার পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রের সময় তাঁর সাহসী একক সিদ্ধান্তের সাফল্য আমরা দেখেছি। এ সময় তিনি তাঁর অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পরামর্শ শুনলে পদ্মা সেতুর প্রকল্প স্বপ্ন হয়েই থাকত, এত শিগগির বাস্তবায়িত হতো না। ভারতের নরেন্দ্র মোদিও শেখ হাসিনার এই নেতৃত্ব গুণকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘উন্নয়নের পার্টনার হিসেবে ভারত সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’ এ কথা বলেছেন সোনিয়া গান্ধীও একবার বাংলাদেশ সফরে এসে। সুতরাং এবারের নির্বাচনেও ভারতে যে দল বা যে নেতাই ক্ষমতায় আসুন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক যে উত্তরোত্তর দৃঢ় হবে, তাতে সন্দেহ নেই।

নির্বাচনোত্তর জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে, মোদিই আবার ক্ষমতায় আসবেন, তবে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নয়। হয়তো কোয়ালিশন সরকার করতে হবে। তা যদি হয়, তার ওপর বজরং পরিবার, শিবসেনা, আরএসএস প্রভৃতি উগ্রপন্থী দলের প্রভাব কমবে। এটাও হবে ভারতবাসীর জন্য একটা বড় আশা।

লন্ডন, সোমবার, ২০ মে ২০১৯

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা