kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

বামপন্থীরা কি বিজেপি অনুসারী হয়ে উঠছে

জয়ন্ত ঘোষাল

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বামপন্থীরা কি বিজেপি অনুসারী হয়ে উঠছে

ভারতের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা লোকসভা নির্বাচন সপ্তম বা শেষ দফার ভোটগ্রহণ গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। শেষ পর্বে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকে সমগ্র দেশের নজর ছিল। এক মস্ত বড় প্রশ্ন হলো, এবার পশ্চিমবঙ্গে কি বিজেপির আসনসংখ্যা অনেকটাই বেড়ে যাবে? এ প্রশ্নটাকেই একটু বৃহৎ প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করা যেতে পারে। প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করা যাক। বাঙালি কি তাহলে এত দিন পর বিজেপিকে মতাদর্শগতভাবে গ্রহণ করছে? লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার সময় আমি তাঁর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছিলাম। তখন গোটা দেশে রামমন্দির আন্দোলন সফল হলেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি রামকে গ্রহণ করেনি। সেটা ছিল ১৯৯০ সালের কথা। আজ এত বছর পর কলকাতায় ধর্মতলা থেকে যে রোড শো শুরু হলো, তাতে প্রথম দেখলাম জয়শ্রীরাম ধ্বনি। হিন্দিভাষী পশ্চিমবঙ্গবাসী নয়, একদম বাঙালির মুখ থেকে শোনা গেল জয়শ্রীরাম ধ্বনি। এ এক নতুন বাংলা। এই বাংলাকে আমি এর আগে কখনো দেখিনি। ভোটের ফল কী হবে? বিজেপি কতগুলো আসন পাবে? শতকরা ভোটই শুধু বাড়বে, নাকি আসনও বাড়বে? এসব তো পৃথক বিশ্লেষণ; কিন্তু এবারের ভোট দেখে আমি নিশ্চিত যে বাঙালি মননেরই এক বিরাট পরিবর্তন হচ্ছে। বাঙালির এই ডিএনএ বদলে বামপন্থী বাঙালি রামপন্থী হয়ে উঠছে কিভাবে?

ডায়মন্ড হায়বার নামক লোকসভা কেন্দ্র। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা  জেলার অধীন। এখানে তৃণমূল প্রার্থী হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই এলাকায় বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার ধারে এক ছোট চায়ের দোকান। দোকানে মাছ-ভাত, ডিম-ভাত বিক্রি হচ্ছে। বাস কন্ডাক্টর, স্থানীয় শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ বেঞ্চিতে বসে মধ্যাহ্ন ভোজন করছে। দোকানটি চালাচ্ছেন এক মধ্যবয়সী মহিলা, গৃহবধূ। তাঁকে প্রশ্ন করলাম, কী হবে এবার দিদি? জবাবে সেই মহিলা প্রথমে মাথায় ঘোমটা টেনে বললেন, ‘বলা মুশকিল, কী যে হবে।’ তার পরই বললেন, ‘যখন এ রাজ্যে সিপিএমকে তাড়িয়ে তৃণমূল হঠাৎ ক্ষমতায় এসে গেল তখন বুঝতে পেরেছিলেন? বুঝতে পারেননি। আজও বুঝতে পারছেন না বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস বিদায় নিচ্ছে আর বিজেপি আসছে।’ কী সাংঘাতিক এক বিবৃতি। আমার সঙ্গে ছিলেন ক্যামেরাম্যান অনিল মিত্র। তিনি বললেন, ‘এই কথাটা আপনি ক্যামেরার সামনে বলবেন?’ মহিলা নির্ভয়ে তা-ও বলে দিলেন। আমি বললাম, কী করে জানলেন গোটা রাজ্যের কথা? আপনি তো থাকেন এই গ্রামে। ওই মহিলা বললেন, ‘আমার ছেলে গাড়ির কন্ট্রাক্টরি ব্যবসা করে। জেলায় জেলায় ওর গাড়ি যায়। জেলা শাসকদের অফিসেও গাড়ি চলে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণ বঙ্গ—সর্বত্র। তা আমার ছেলে বলেছিল, মা, এবার বিজেপিকেই ভোট দেব আমরা। কারণ সব জায়গায় জিতছে বিজেপি।’

ছেলে বলেছে বলে আপনি বিজেপিকে ভোট দেবেন?

ওই মহিলা বললেন, ‘দেখুন, ছেলেরা অনেক সময় মায়ের কথা শোনে না; কিন্তু মা ছেলের কথা শোনে সব সময়ই। গতবার ভোট দিয়েছিলাম তৃণমূলকে। এবার দেব বিজেপিকে।’ দেখুন, এটা একটা বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা। কিন্তু অনেক সময় হাঁড়ির একটা ভাত টিপলেই বোঝা যায় ভাত কতটা সিদ্ধ হয়েছে। এ হলো বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন।

২০১৪ সালে গোটা দেশে মোদি-ঝড় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি পেয়েছিল দুটি আসন। এর মধ্যে একটা আসন ছিল দার্জিলিংয়ের। এবার ২০১৯ সালে যখন প্রশ্ন উঠছে যে উত্তর প্রদেশ তথা হিন্দিবলয়ে সেই মোদি-ঝড় নেই তখন পশ্চিমবঙ্গে মোদির জনপ্রিয়তা ২০১৪ সালের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। যাদবপুর কফি হাউসের এক অধ্যাপকের মন্তব্য, ‘এটাই হলো রাজনীতির প্যারাডক্স।’

এখন প্রশ্ন হলো, বাঙালি জয়শ্রীরাম রাজনীতি গ্রহণ করছে? আসলে বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী র‌্যাডিক্যাল রাজনীতি এবং তথাকথিত বৌদ্ধিক চর্চা দেখতে দেখতে অনেকটা ক্লান্তও বটে। সিপিএম তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকেছে; কিন্তু রাজ্যের আর্থ-সামাজিক মানের উন্নতি তো দূরের কথা, আরো অবক্ষয় হয়েছে। এরপর এসেছে তৃণমূল। তৃণমূল তো এই কু সিপিএমের এক পরিবর্তন। বাঙালি কিন্তু সম্প্রতি আরো বেশি ধর্মকর্ম আস্তিকতা পূজার মধ্যে ঢুকে গেছে। বাঙালি আগেও যথেষ্ট ধর্মবিশ্বাসী ছিল; কিন্তু আজ কুসংস্কারের প্রকোপ আরো বেড়েছে। দক্ষিণেশ্বর ও কালীঘাটে দেখেছি যে এখন দৈনিক দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু গোটা বিশ্বেরই ‘ট্রেন্ড’। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে যে God is Back অর্থাৎ মানুষ আবার অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পূজা করছে। কুসংস্কার বিশ্বাস করছে। এর কারণও আর্থিক মন্দা দুনিয়াজুড়ে।

পশ্চিমবঙ্গে ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু। এই ভোট ব্যাংককে বিজেপি ছাড়া সবাই তুষ্ট রাখতে চায়। বিজেপি এখন এই হিন্দু বা সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের তাস খেলছে। হিন্দিভাষী শুধু নয়, বাঙালি হিন্দুও এই মেরুকরণের রাজনীতিতে ভোটের সময় বেশ তেতে উঠেছে।

ক্ষিতিমোহন সেন হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, গঙ্গার জল সাদা, যমুনার জল কালো। পদ্মার জল সাদা, মেঘনার জল কালো। তাই গঙ্গা-যমুনা বা পদ্মা-মেঘনা নদী সংগমের পরও অনেক দূর পর্যন্ত একই ঘাটে সাদা ও কালো এই দুই স্রোত পাশাপাশি চলতে দেখা যায়। সাগরের নীল জলের মধ্যে নদীর ধারা মিশলেও অনেক দূর পর্যন্ত নীল জলরাশির মধ্যে নদীর জলের পরিচয় পাওয়া যায়। জলের রং দেখে পাকা নাবিক নদীর সান্নিধ্য টের পায়। ভারতে প্রচলিত হিন্দু ধর্মের মধ্যেও প্রদেশগত ও নানা রকম মানব শ্রেণিগত বিশেষত্ব আছে। এসব লক্ষণ অনুসারে হিন্দু ধর্মও অনেক রকম। ব্রাহ্মাবর্তের কথা বলতে গিয়ে মনু বলেছিলেন, যে দেশে যা পরম্পরাগত আচার, তা-ই সদাচার। ব্যবহার ময়ূখকার নীলকণ্ঠ বলেন, দাক্ষিণাত্যে বিপ্রেরা মাতুল কন্যা বিবাহ করেন, মধ্য দেশে কর্মকার ও শিল্পীরা গোমাংস খায়, পূর্ব দেশে মৎস্য ও নারী ব্যভিচার চলে, উত্তরে নারীরা মদ্যপায়ী। আচারাধ্যায়ে যাজ্ঞবল্ক তাই বললেন, যস্মিন দেশে য আচারো ব্যবহারঃ কুলে স্থিতিঃ। তথৈব প্রতিপাল্যে  যদাবিশমুলাগতঃ

তিরুপতীতে বিষ্ণুর যে উপাসনা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুর বৈষ্ণব ধর্ম, গৌড়ীয় বৈষ্ণব। রাম উত্তর ভারতে ঠিক যে ভঙ্গিতে পূজা পান পশ্চিমবঙ্গে রঘুবীরের পূজা বা রাম নবমী হলেও তার ধরন আলাদা। এখন বিশ্বায়নের ফলে ভারতে উত্তর ও পূর্ব ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমন্বয় অনেক বেড়েছে। তাই বহু ক্ষেত্রে বাঙালির স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসছে। এক নতুন বাঙালি জন্ম নিচ্ছে, যে বাঙালি এখন মতাদর্শগতভাবে বিজেপিকেও গ্রহণ করছে। এখানেই এক নতুন বাংলাকে ভোটের সময় দেখছি, মা মাটি মানুষের বদলে দেখা যাচ্ছে নতুন স্লোগান মা-মাটি-মোদি।

ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হতে চলেছে ২৩ মে। ভোটের ফল গোটা দেশে কী হবে, পশ্চিমবঙ্গে কী হবে, তা জানি না। কিন্তু এবার গোটা দেশে যখন এই আলোচনা হচ্ছে যে ২০১৪ সালে বিজেপির যে ঝড় আমরা দেখেছি, ২০১৯ সালে তা নেই। কারণ বেশির ভাগ হিন্দিবলয়ের রাজ্যে বিজেপি প্রায় ব্যাকফুটেড হয়ে যায়। উত্তর প্রদেশে বিজেপি ৮০টি আসনের মধ্যে ৭১টি আসন পেয়েছিল, তার ওপর এবার হয়েছে মায়াবতী আর অখিলেশের মহাগঠবন্ধন। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের আশা যদি হিন্দিবলয়ে তাদের আসনসংখ্যা কমেও যায়, তাহলেও পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ ভারত থেকেও আসন বাড়বে। ফলে নতুন রাজ্য থেকে নতুন আসন এই ঘাটতি পূরণ করে দেবে। প্রায় ১২৫টি আসন এমন হবে, যেগুলো বিজেপির নতুন আসন—এমন পরিসংখ্যান দলের সভাপতি অমিত শাহ নিজেই দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে সে ব্যাপারে তো কোনো সন্দেহ নেই। আবার কংগ্রেসকে কলকাতায় বলা হচ্ছে ‘মাম’ পার্টি মানে মালদা আর মুর্শিদাবাদের পার্টি। সিপিএমের ৩০ শতাংশ ভোট ব্যাংক ছিল, সংগঠন ও নেতৃত্বের সংকটে বহু বামপন্থী শুধু মমতার বিরুদ্ধে ভোট দিতে চাইছে। যাদবপুর কফি হাউসে এক সন্ধ্যায় এক রাজনীতির অধ্যাপক আমাকে এবার বলেছেন, একে বলা হয়, রাজনীতির প্যারাডক্স। গোটা দেশে মোদি-ঝড় প্রশমিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু উল্টো চিত্র। এখানে বিজেপি এখনো রাজ্যস্তরে পরীক্ষিত শাসকদল নয়। তাই বামপন্থীদের এ হলো Tactical ভোট। সন্তোষপুরের এক চায়ের দোকানের আড্ডায় বামপন্থীরা বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন, এখন তো সিপিএমকে ভোট দেওয়ার মানে ভোটটা নষ্ট করা। জানেন, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী শক্তি আবার আসতে পারে যদি রাজ্যে তৃণমূলের জায়গায় বিজেপি আসে। তখন বিজেপির সঙ্গে কমিউনিস্টদের মতাদর্শগত লড়াই শুরু হবে, এ রাজ্যে বিকাশ হবে বামদের।

কী অদ্ভুত ব্যাপার। এ জন্য আপতত বামপন্থীরা রামপন্থী হয়ে যাচ্ছে। বাঙালির এই বিজেপিপ্রেম ক্ষণস্থায়ী, নাকি এ এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, সেটা এখনই বলা কঠিন। এই বিজেপিপ্রীতি ভোটে আসন লাভে কতটা প্রতিফলিত হবে—এ প্রশ্নটাও থেকেই যাবে। তবে এটা বলতেই পারি, শুধু হিন্দিভাষী নয়, বেশির ভাগ বাঙালি মনে করছে নরেন্দ্র মোদির আরেকবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

দিল্লি থেকে রাজ্যওয়ারি পরিস্থিতি দেখে শুধু এটুকু বলতে পারি, এবার নরেন্দ্র মোদি নিজে যেভাবে পরিশ্রম করেছেন, যেভাবে তিনি একের পর এক জনসভা করেছেন, তা অভূতপূর্ব। গায়ের রং কালো হয়ে গেছে রোদে পুড়ে। ওজনও কমেছে। বারবার কুর্তার রং বদলেছেন জনসভায়—কখনো সাদা, কখনো হালকা হলুদ বা গেরুয়া। ২৩ তারিখ কী রঙের পাঞ্জাবি পরবেন তিনি, সেটাই দেখার। 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, নয়াদিল্লি

মন্তব্য