kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

পাকিস্তানের পাশে আবারও আইএমএফ

অনলাইন থেকে

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সঙ্গে পাকিস্তানের সখ্য অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। ঋণের ভারে জর্জরিত পাকিস্তান অন্তত ২১ বার আইএমএফের দুয়ারে হাত পেতে সফল হয়েছে। সংখ্যাটি আর্জেন্টিনার সমান। গত ১২ মে দুই পক্ষের এই সখ্য আরেকটু গাঢ় হয়। সাবেক ক্রিকেট তারকা এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির প্রধান ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, আগামী তিন বছরের জন্য আইএমএফের ৬০০ কোটি ডলারের ঋণ পেতে যাচ্ছে তাদের দেশ। এ ব্যাপারে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান ও আইএমএফের কর্মকর্তারা। এখন অপেক্ষা আইএমএফের মা-বাপ ওয়াশিংটনের অনুমোদনের। এর সঙ্গে আরো সম্মতি লাগবে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক নেতাদের। 

নগদ অর্থের সংকটে থাকা পাকিস্তানকে এই ঋণ কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে ২০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটিতে আইএমএফের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। দেশটির জনগণ এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তীব্রভাবে অপছন্দ করে। ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে আইএমএফ চায় পাকিস্তান করের হার বৃদ্ধি করবে, বাড়াবে জনসেবা খাতের বিনিময়মূল্যও। প্রয়োজন হলে পাকিস্তানি রুপির দরও কমাতে হবে। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বাণিজ্য ও বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা হবে। তবে স্বল্প মেয়াদে এগুলো উন্নতিকে খর্ব করবে এবং মুদ্রাস্ফীতিও বাড়িয়ে দেবে।

জনগণের দুর্ভোগ কমাতে আইএমএফ কল্যাণ তহবিলে সরকারকে আরো খরচ করার অনুমোদন দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নামে নগদ স্থানান্তরের একটি প্রকল্প রয়েছে। ২০০৭ সালে গুলি ও আত্মঘাতী বোমা হামলায় বেনজির নিহত হন। তাঁর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বর্তমানে তাঁদের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি আইএমএফের সঙ্গে নতুন এই চুক্তিতে মোটেই সন্তুষ্ট নন। এ মাসের গোড়ার দিকে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়। এরপর বিলাওয়াল পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন  আইএমএফের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ করেন। সাপ্তাহিক সাময়িকী ফ্রাইডে টাইমসে প্রকাশিত এক কার্টুনে দেখা যায়, আলোচনা টেবিলের সর্বত্র আইএমএফপ্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দে বসে আছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, ইমরান সরকার আইএমএফ থেকে দূরে থাকার সব রকম চেষ্টা চালিয়েছে। ২০১৮ সালের আগস্টে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসে। এর পর থেকেই আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে তারা। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেছে পাকিস্তান। এর মধ্যে সৌদি আরবের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলার এবং চীনের কাছ থেকে ২২০ কোটি ডলার নিয়ে আসেন ইমরান। পাকিস্তানের সড়ক, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চীনের বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে। একে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) হিসেবে অভিহিত করা হয়। অনেকের দৃষ্টিতেই এটি অবশ্য বেশ সন্দেহজনক বিষয়। তাদের আশঙ্কা, চীনের ‘ঋণের ফাঁদপাতা কূটনীতির’ শিকার হতে যাচ্ছে পাকিস্তান।

চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে পাকিস্তান যে ডলারগুলো পেয়েছিল, তা সাময়িকভাবে তাদের রিজার্ভের ঘাটতি মেটাতে কিছুটা সহায়ক হয়। তবে এই সমস্যা সমাধানে নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজন, যা দ্বিপক্ষীয় সহযোগীদের পক্ষে দাবি করা বা নজরদারি করা সহজ ছিল না। কাজেই বিষয়টি আইএমএফের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

কাজটি আইএমএফের জন্য খুব সহজ হবে—বিষয়টি এমন নয়। পাকিস্তান নিয়মিত আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়। তবে আইএমএফের উপদেশগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা খুব একটা যত্নশীল নয়। এবারের চুক্তিতে তারা যেসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এর আগে ঋণ নেওয়ার সময়ও শর্ত হিসেবে এগুলো ছিল। এর মধ্যে রয়েছে করের আওতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তবে ঋণ অনুমোদনের পর এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আগ্রহ পাকিস্তানের মধ্যে দেখা যায়নি। কারণ তাদের মধ্যে জনগণের সমর্থন হারানোর ভয় কাজ করছে সব সময়।

আইএমএফের সাবেক দুই উপদেষ্টা এহেতেশাম আহমেদ ও আজিজালি মোহাম্মদ পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আইএমএফের সম্পর্কের ব্যাপারে তাঁদের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে লেখেন, “সরকারগুলো সব সময়ই আইএমএফের সঙ্গে এক ধরনের ‘গেম’ খেলার চেষ্টা করে গেছে। প্রতিবারই আংশিকভাবে সফলও হয়েছে তারা।” পাকিস্তানের জনগণ আইএমএফকে পছন্দ করে না। তবে তারা যদি জানতে পারত তাদের নেতারা কত ঘন ঘন এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন, তাহলে হয়তো তাদের অপছন্দের মাত্রাটা কিছুটা কম হতো।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা