kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও আমাদের করণীয়

ড. কাজী রফিকুল ইসলাম

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও আমাদের করণীয়

অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন একটি উপাদান, যা ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস থেকে তৈরি করে অন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসকে ধ্বংস অথবা তার বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে প্রাণীকে অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা চিকিৎসার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাংস, দুধ, ডিম, মলমূত্র ইত্যাদিতে অ্যান্টিবায়োটিকের যে অংশ অবশিষ্ট থাকে, তা-ই হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ।

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ ও রেজিস্ট্যান্স এই বিশ্বায়নের যুগে এক মারাত্মক সমস্যা, যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কেউই রক্ষা পাব না। এর ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশকে করতে পারে মানুষের বসবাসের অযোগ্য, সৃষ্টি করতে পারে নানা জটিল রোগব্যাধি এবং মানুষ ও পশুপাখির চিকিৎসার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করতে পারে মারাত্মক জটিলতা।

ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস বা তার বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস অথবা কমে যাওয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। সব ওষুধই কার্যকারিতা হারায়; কিন্তু অন্যান্য ওষুধের কার্যকারিতা হারানো অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানো থেকে ভিন্ন। কারণ অন্যান্য ওষুধ কার্যকারিতা হারায়, যখন মানুষের শরীরে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয় তখন ওষুধটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর অর্থ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলোর মধ্যে পরিবর্তন হয়, জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার সামর্থ্য অর্জন করে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। ভাইরাসজনিত সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সাধারণ রোগের জন্য আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করি। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অথবা স্বল্পমাত্রায় অনিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু তার নিজের জেনেটিক কোডে এমন পরিবর্তন আনে যে সেই অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুকে ধ্বংস বা তার বংশবিস্তার রোধ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে মানুষের শরীরে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় না, রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় ব্যাকটেরিয়ার দেহে। ভয়ের মূল কারণ হলো ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশ বিস্তার করে, যার ফলে অতি অল্প সময়ে লাখ লাখ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে পারে।

বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়ে থাকে। এসব দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় সর্বত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা হয়। এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের উপদেশে বিক্রি করা হয়। উন্নত বিশ্বেও এই সমস্যা বিদ্যমান। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি), আমেরিকার এক জরিপে দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনের মধ্যে কানের সংক্রমণের জন্য ৩০ শতাংশ, সাধারণ ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডার জন্য ১০০ শতাংশ, গলা ব্যথার জন্য ৫০ শতাংশ প্রেসক্রিপশন অপ্রয়োজনীয়।

সারা বিশ্বে, বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোতে খামারিরা কম সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার আশায় গবাদি পশু ও মুরগিতে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে। আর এই যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানুষের জন্য বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক খামারি গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছে গবাদি পশু মোটাতাজাকরণ অথবা ব্রয়লার উৎপাদনের জন্য। ফলে যেসব পশুপাখিকে স্বল্পমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, সেসব পশুপাখির শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু তৈরি হয় এবং তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে অন্যান্য জীবাণুও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে জিন ট্রান্সফরমেশন এবং মিউটেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে। এভাবে একটি মহামারি নীরবে ঘটে যাচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে মানুষ ও পশুপাখি রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে সঠিক চিকিৎসা না থাকায় মারা যেত। রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ধ্বংস বা বংশবিস্তার রোধের ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ১৯২৮ সালে অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু এর যত্রতত্র ব্যবহারের ফলে বর্তমানে জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিকে রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে। সংক্রমণকারী জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ফলে মুমূর্ষু মানুষ ও পশুপাখি চিকিৎসা জটিলতায় মারা যাচ্ছে। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে মানুষ ও পশুপাখি অ্যান্টিবায়োটিক না থাকার কারণে মারা যেত, আর বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকারিতা জীবাণুর বিরুদ্ধে হ্রাস পাওয়ায় মুমূর্ষু মানুষ ও পশুপাখি বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ধারণা করা যাচ্ছে, বছরে ১০ মিলিয়ন মানুষ পৃথিবীতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা যাবে, পক্ষান্তরে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে মারা যাবে ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমরা আবার ফিরে যাব সেই যুগে, যে যুগে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়নি, যখন মানুষ সাধারণ সর্দি, কাশি, কাটাছেঁড়ায় মারা যেত।

এই মহাবিপর্যয় থেকে কেউই নিরাপদ নয়। উন্নত দেশের মানুষ থেকে আফ্রিকার গহিন অরণ্যে বসবাসরত কোনো মানুষই এই ঝুঁকি থেকে নিরাপদ নয়। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া বহনকারী ব্যক্তি বা প্রাণী, রপ্তানি বা আমদানি করা প্রাণী ও প্রাণিজাত দ্রব্য, মৎস্য ও কৃষিজাত পণ্যের মাধ্যমেও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বেশি।

অ্যান্টিবায়োটিকের উদ্ভাবন হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার প্রয়োজনে। কিন্তু সবচেয়ে ভীতিকর কথা হচ্ছে, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে এখন স্থবিরতা বিরাজ করছে। নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত যাতে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার খুব সাবধানতার সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে। যেসব অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে, তাদের ব্যবহার সাময়িক বন্ধ করে অন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে।

প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। নিবন্ধনকৃত চিকিৎসকের লিখিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না মর্মে বিজ্ঞ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এসংক্রান্ত আইনগুলো সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং কঠোর শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকতে হবে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা। চিকিৎসকের পরামর্শমতো সঠিক মাত্রায় ও নিয়ম অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা। ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি, কাশির ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করা। ভেজাল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করা। গবাদি পশু ও মুরগিতে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থায়ই খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। গবাদি পশু ও মুরগির খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার পর প্রত্যাহারকাল মেনে পশু ও মুরগি মানুষের খাবারের জন্য ব্যবহার করতে হবে। মানুষ ও পশুপাখির যেসব ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, তা ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ মোতাবেক সঠিকভাবে ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ ছাড়া প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য স্বল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত হবে না।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধে এফএও বাংলাদেশে বিএআরএ (বাংলাদেশ এএমআর রেসপনস অ্যালায়েন্স) ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ফার্মাকোলজিস্ট, ভেটেরিনারিয়ান ও চিকিৎসকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে বিএআরএ সদস্যরা অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনে সচেতন হচ্ছেন এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনে এফএওর নির্দেশনা ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া বিএআরএ সব বিভাগের ভেটেরিনারিয়ানদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ওপর ট্রেনিং পরিচালনা করছে। ট্রেনিংয়ের ফলে ভেটেরিনারিয়ানরা এফএওর শ্রেণিভুক্ত রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিক ফুড এনিম্যালে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং ন্যারো স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারসহ গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার ব্যাপারে উৎসাহিত হচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোগই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : সাবেক বিভাগীয় প্রধান, ফার্মাকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা