kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

গণতন্ত্রের সুষ্ঠু পরিবেশ ও বিরোধী দল

এম হাফিজউদ্দিন খান

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণতন্ত্রের সুষ্ঠু পরিবেশ ও বিরোধী দল

এক হিসেবে দেশ ভালোই চলছে এখন। রাজনৈতিক মাঠে সরকারি বা বিরোধী দলের মধ্যে কোনো উত্তাপ নেই। সামাজিক বা গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া নিয়ে কোনো ধরনের আন্দোলন বা মাঠ গরম করার আয়োজন নেই। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, রাজনীতি ভালো চলছে। আবার এমন প্রশ্নও তোলা যায়—দেশে কোনো সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা কি আছে? আমি তো মনে করি, নেই। এক সরকার এক দেশপ্রিয় জননীর বাংলাদেশ। রাজনীতির মাঠ এখন শান্ত, ধীর ও স্থির।

সরকারের বাইরে এখনো বিএনপি একটি বড় বিষয়, যদিও তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় নেই। কোনো আন্দোলনেও তারা সক্রিয় নয়। তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যেই নানা ধরনের সমস্যা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা টালমাটাল অবস্থায় আছে। বিএনপি তো নির্বাচনে অত্যন্ত খারাপ করেছে—এ কথা তো সবার জানা। কিন্তু যে কয়জন সদস্য বিজয়ী হয়েছেন, তাঁরা সংসদে যাবেন কি না, গেলেও তা নিয়ে নানা ধরনের কথা ও বয়কটের প্রসঙ্গ এসেছে। সর্বশেষ তাঁরা যে সংসদে গেলেন, সেটি নিয়েও আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। প্রথমে তাঁরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি, নির্বাচিতরা সংসদে যাবেন কি না। পরে যখন গেলেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গেলেন না। ৩০ এপ্রিল যোগদানের শেষ সময়ে এসে তিনি তাঁর সংসদে যোগ দেওয়াটাও অনিশ্চিত করে ফেললেন। ফলে তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হলো। নতুন করে সেখানে আবারও নির্বাচন হবে। বগুড়ার সেই কেন্দ্রে নতুন করে বিএনপি থেকে কে দাঁড়াবেন—ঠিক হয়নি। কোনো মহিলা প্রার্থী তারা দেবে কি না, সেটি নিয়েও চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি।

সার্বিকভাবে বিচার করতে গেলে বিএনপি নানাভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তারা নিজেরা উঠে দাঁড়াতে পারছে না। দলের সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা এবং নেতৃত্ব গ্রহণেও জটিলতা আছে। বিএনপি থেকে নির্বাচিত নতুন সদস্যরা সংসদে যোগ দিলে যে একটা কাজের কাজ কিছু হবে, দলে একটা চাঙ্গা ভাব আসবে—ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো আভাস দেখা যাচ্ছে না। একটি এলোমেলো ভাব রয়েই গেছে।

সংরক্ষিত আসনে একজন নারীকে প্রার্থী দেওয়া হবে বলে কথা শোনা গেছে। সেখানে রুমিন ফারহানাকে দেওয়া হবে এমনটি জানা গিয়েছিল। সেটিও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি অলি আহাদের মেয়ে। বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য। সক্রিয় কর্মী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি থাকতে পারবেন কি না বা অন্য কেউ আসবেন কি না, জানি না।

এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, রাজনীতি হাবুডুবু খাচ্ছে। একমাত্র সরকারি দলই ভালোমতো কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের বাইরে যারা আছে, তাদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে জোরালো কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না। না আন্দোলন, না গণতন্ত্র নিয়ে কোনো চেষ্টা। জাতীয় পার্টি যে খুব ভালো আছে, তা-ও মনে হচ্ছে না, নতুন কোনো সম্ভাবনাও দেখছি না। তারা তো সরকারের সঙ্গেই আছে।

সেদিন এক জায়গায় দেখলাম, হাসানুল হক ইনু  বলেছেন, ধারাবাহিক সরকারের আমলেই বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বা ধর্ষণের ঘটনা এখন বেশি ঘটছে। কথাটি শুনে বেশ আশ্চর্যই লাগল। কারণ তিনি তো আট-দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তখন তো এ ধরনের কথা বলেননি। এখন কেন বলছেন? ধর্ষণের ঘটনা তো অবিরাম ঘটে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখনো সারা দেশে খুন-ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ নিয়ে তাঁরা তো কোনো রকম মুখ খোলেননি। এখন সরকারের বাইরে আছেন বলেই কি মন্তব্য করলেন? বিষয়টি আমার বোধগম্য হলো না।

আরেকটি বিষয় আমাকে খুবই অবাক করে। কিংবা বলা যেতে পারে, ব্যাপারটি খানিক অশোভনও মনে হয়। বর্তমানে যিনি তথ্যমন্ত্রী আছেন তাঁর যেন দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে বিএনপিকে নিয়ে দু-এক দিন পর পর নেতিবাচক ও ইঙ্গিতমূলক মন্তব্য ছোড়া। তিনি বলে থাকেন যে বিএনপির ভেঙে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বা বিএনপি তো শেষ। বিএনপি এই করেছে, সেই করেছে। আমি বুঝতে পারি না, সরকারের দায়িত্বশীল একজন প্রতিনিধির এসব কথা কেন বলতে হবে। তিনি কি কথা খুঁজে পান না, নাকি তিনি এর ভার নিয়েছেন।

আমরা সব সময়ই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে এসেছি। কোনো বিশেষ পক্ষাবলম্বন আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এই যে একটি জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল—এমন একটি ফ্রড নির্বাচনের পরে ভেবেছিলাম মানুষজন রাস্তায় নেমে আসবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন না হলে বিরোধী দল, ঐক্যফ্রন্ট ও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে; যেটি অন্য দেশে আমরা দেখেছি। তারা নির্বাচন বর্জন করেছে। কিন্তু এখানে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হলো না, সে বিষয়ে নির্বাচন বর্জন বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপ কিন্তু দেখতে পেলাম না। উচিত ছিল দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের রাস্তায় নেমে আসা। অথচ বাস্তবে এমন কোনো কিছুর আভাসও দেখা যায়নি। বিএনপি যে এত বড় দল, তারা কয়েকবার ক্ষমতায়ও ছিল, তাদের মধ্যেও ঐক্য বা সুসংগঠিত শক্তি নেই। ফলে তারাও কিছু করতে পারল না।

আর জামায়াতও তেমন কিছু করতে পারেনি। তারা নিজেরাই তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করছে। ফলে তাদের জন্য শক্ত কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি এত বড় একজন সাংবাদিক মারা গেলেন, বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের লোক ছাড়া তাঁকে নিয়ে কেউ কিছু বলল না। এটি দেখে আমার খারাপই লাগল। তিনি তো দেশ ও দশের কথাই বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক ছিলেন। একটু ডানঘেঁষা ছিলেন। কিন্তু সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাঁকে নিয়ে তেমন কিছু বলতে শুনলাম না। কেউ তাঁকে দেখতে গেল না। এসব দেখে বড় কষ্ট লাগল।

এখন রাজনীতি নিয়ে কোনো আশার আলো দেখছি না। রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। অন্ধকার। সামনে কী হবে, রাজনীতি কোন দিকে যাবে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

১৯৭৪ সালে দেশে একটি অন্য রকম সময় আমরা দেখেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে দেশ অনেকটা সেই রকমভাবে চলছে। দেশে বিরোধী দল বলে কিছু নেই। এখন যা দেখছি, তাতে তো মনে হচ্ছে বিরোধী দল বিলীন হয়ে যাবে। এখন সরকারের বাইরে বড় কোনো বিরোধী দল নেই। যারা আছে, নানা দল-উপদল, ছোট দল আছে। কিন্তু সুসংগঠিত বা শক্ত অবস্থানে নেই। সবাই বিচ্ছিন্ন। ঐক্যের অভাব। কোনো সামাজিক বিষয়ে বা গণতন্ত্রের দাবিতে তারা অনড় নয়। একটি বিচ্ছিন্ন ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

জাতীয় পার্টি নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। এইচ এম এরশাদ এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু তাঁর সক্রিয় কোনো কার্যক্রম দেখছি না। তাঁরও নানা সমস্যা আছে। একেক সময় একেক কথা বলেন। তবু তাঁরা এখনো অনেকটা ভালো আছেন। সরকারের সঙ্গেই আছেন। জাতীয় পার্টির মধ্যে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরপন্থী ব্যাপার থাকলেও তারা এখনো ভেঙে যায়নি। কারণ তারা সরকারের সঙ্গেই আছে। ভবিষ্যতে কী হবে, তা এখনই বলা যায় না।

জামায়াত নতুন করে দল গঠন করার কথা বলেছিল। কী একটা নামও দিয়েছিল। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরেই দ্বন্দ্ব চলছে। নাম বদলালেও জামায়াতের এখনো বড় শক্তি হিসেবে সামনে আসার সম্ভাবনা কম।

রাজনীতি নিয়ে এখন আমার ভালো প্রত্যাশা নেই। এখন যেটি হতে পারে, পরিবর্তন দরকার। সে জন্য করণীয় হচ্ছে, সব দল একমত হয়ে প্রকৃত ঐক্যফ্রন্ট যদি হয়, তাহলে হয়তো ভালো কিছু সম্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি ছাড়া আর তো বড় কোনো দল দেখছি না। ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিতভাবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পারলে ভালো কিছু সম্ভব হতে পারে। এর বাইরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা