kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য লড়াই ঠেকাতে হবে

অনলাইন থেকে

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বরাবরই মুক্তবাণিজ্য চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে এই সংরক্ষণবাদী অবস্থানই ছিল তাঁর প্রধান হাতিয়ার। প্রচারের সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্লিনটন আমলের অন্তত দুই বিষয়ে তিনি পরিবর্তন আনবেন। এর প্রথমটি হচ্ছে উত্তর আমেরিকান মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা নাফটা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) চীনের অন্তর্ভুক্তি। তাঁর ওই তর্জনগর্জনের ফলাফল হচ্ছে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি। তবে আগের চুক্তির তুলনায় নতুন চুক্তিতে পরিবর্তন বালুকণাসম; যদিও ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এই ‘নতুন নাফটা’ চুক্তি ‘সত্যি ঐতিহাসিক’।   

ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ‘বাণিজ্য লড়াই ভালো জিনিস এবং সহজেই এগুলোতে জেতা যায়।’ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরই কয়েক মাস ধরে বেইজিংয়ের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে সমস্যা হচ্ছে চীনকে মেক্সিকো বা কানাডা ভেবে বসেছেন তিনি। চীন দেখাচ্ছে তারা পরাজিত হয়েছে। কিন্তু নীরব থেকেই নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে তারা। চীন লড়াকু দেশ। গত কয়েক দশকের মধ্যে বর্তমানে তারা সবচেয়ে শক্তিশালী নেতার শাসনে রয়েছে। বৈশ্বিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা। এ কারণেই হয়তো দুই দেশ বাণিজ্যের জন্য যে শর্তগুলো মেনে চলত তার থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে চীন। আর তারই প্রতিশোধ হিসেবে চীনের প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক বসায় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ২ শতাংশ হ্রাস পাবে। জিডিপির গতি শ্লথ হবে ০.৮ শতাংশ।  

সস্তায় পণ্য পেয়েছে পশ্চিমা ক্রেতারা। অস্বস্তিকর সত্যটি হচ্ছে, বাণিজ্যের সুবিধা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। আর এ কারণে পশ্চিমের অদক্ষ লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে তারা। এই পরিস্থিতিকে পশ্চিমা রাজনীতিকরা কাজে লাগিয়েছে। কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারা এবং অদক্ষ জনশক্তিকে দক্ষ করতে না পারার ব্যর্থতা তাদের। কিন্তু তারা এর দায় চাপিয়ে দিয়েছে বিশ্বায়নের ওপর। যেমন—ট্রাম্পের মতো রাজনীতিকদের এ ধরনের মন্তব্য করার সুযোগ তৈরি হয়েছে যে চীন ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোই তাদের সব সমস্যার প্রধান কারণ।

বর্তমানে বিশ্বায়নের যে ধরন তা প্রায়ই নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পারে না। প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধীপক্ষের কাছে চাকরি হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। একই নিয়মের মধ্যে থেকেই অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীরাও কাজ করছে। এ কারণে প্রতিযোগীরা অন্য দেশের অমনোযোগী শ্রমিক, পরিবেশ, করব্যবস্থা বা নিরাপত্তা মানদণ্ডের সুবিধা আদায় করে নেয়। এই ‘পক্ষপাতিত্বমূলক’ চর্চার কারণে কর্মীরা চাকরি হারায়। পুরো বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করে। হার্ভার্ডের ড্যানি রড্রিক গত বছর বলেন, সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলন বৃদ্ধি এবং বিশ্বায়নের ব্যর্থতার মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বিশ্বায়ন। এর কারণে যেকোনো দেশ বিদেশি কম্পানির কাছে তাদের অর্থনীতি মেলে ধরতে বাধ্য হয়। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে সম্পর্কে রক্ষাকবচ রাখার খুব বেশি সুযোগও তাদের সামনে থাকে না। সে রকম কিছু করার চেষ্টা করা হলেও ধরে নেওয়া হয় বাজারে প্রবেশাধিকারে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে যা সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিচক্ষণ নীতি ওয়াশিংটনের মতে সেটিই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাণিজ্যে ‘অশুল্ক’ প্রতিবন্ধকতা। বিশ্বের বাণিজ্য বিধানগুলোর পুনর্লিখন প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু এমনই হবে না যে বৃহত্তর অর্থনীতিগুলো শান্ত্পূির্ণভাবে ব্যবসা করে খেতে পারে। বরং অন্য দেশগুলোও যেন তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ‘নিরপেক্ষ বাণিজ্য’ নীতির সুবিধা পেতে পারে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। ধনী দেশগুলোর ক্ষেত্রে তাদের শ্রমবাজারকে প্রযুক্তিগত সংকট থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের সুবিধা অনুসারে স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নের সুযোগ দিতে হবে। যখন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে ওঠে—তা শ্রমবাজার বা পরিবেশের মাধ্যমে হতে পারে, তখন এর প্রতিকারের জন্য একটি যথাযথ পদ্ধতি থাকতে হবে। ট্রাম্প বুঝতে পারছেন তাঁদের বাণিজ্যব্যবস্থায় কিছু সমস্যা আছে। তবে চীনের সঙ্গে লড়াই সেসব সমস্যার সমাধান দেবে না।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা