kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

রাজনীতিকরা সতর্ক না হলে সংকট বাড়বে

অনলাইন থেকে

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শ্রীলঙ্কায় গত কয়েক দিনে বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে, যদিও সার্বিক বিবেচনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যতই বিক্ষিপ্ত হোক, এসব ঘটনাকে শঙ্কার কারণ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। জঘন্য প্রকৃতির কিছু গোষ্ঠী শ্রীলঙ্কাকে আবার গোলযোগের মধ্যে ঠেলতে চাইছে। কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে, যাতে আবেগজড়িত পরিস্থিতিতে বা এলাকায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা নাকচ করা যায়।

প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং এক স্বরে কথা বলার চেষ্টা না করে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়াদি নিয়ে পিংপং খেলছেন। সরকার জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সচেষ্ট মনে হলেও নেতারা চরম অনৈক্যে রয়েছেন। ভয়ংকর নিরাপত্তাসংকট দেখা দিয়েছে, এর দায় সরকারের কেউ এড়াতে পারে না। এ সংকটের কারণেই ন্যাশনাল তৌহিদ জামাতের সন্ত্রাসীরা সহজে তাদের লক্ষ্য বেছে নিতে পেরেছে। কলম্বোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ম্যালকম রণজিতের কথা উপেক্ষা করার জো নেই—দোষ যদি দিতেই হয়, তাহলে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিক, উভয়কেই দিতে হবে। ওই সব ব্যক্তির পদত্যাগ করা উচিত।

ইউএনপি (ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি) দাবি করছে, নিরাপত্তাসংকটের জন্য তাদের দায়ী করা উচিত নয়। কারণ গত অক্টোবর থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সভায় ডাকা হচ্ছে না। প্রেসিডেন্টের অবশ্যই দোষ রয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ইউএনপি প্রেসিডেন্টকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারত। কতক ক্ষেত্রে তারা প্রেসিডেন্টকে তাদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্যও করেছে ইউএনপি। বিক্রমাসিংহেকে আবার প্রধানমন্ত্রী করতে বাধ্য করেছে। দিন কয়েক আগে প্রেসিডেন্টের আপত্তি সত্ত্বেও মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রীয় স্কুলের জিসিই এ লেভেলের ছাত্রদের বিনা মূল্যে ট্যাবলেট কম্পিউটার সরবরাহের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তাহলে কেন তারা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করায় একইভাবে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধে যায়নি?

পুরো দেশ সংকটে। জনগণ অসম্মান বোধ করছে। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত, শঙ্কিত; স্কুলগুলো কার্যত ফাঁকা। তল্লাশি অভিযান শুরুর দিকে সাধারণের মধ্যে কিছু ভরসা সৃষ্টি হয়েছিল। সে অভিযান স্তিমিত হয়ে পড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সঠিকভাবে চলছে। অন্যথায় জন-অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে জনপথে। ইস্টার-হামলার পরপরই কলম্বোর আর্চবিশপ এ কথা বলে সরকারকে সতর্কও করেছিলেন। ওই হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক ১০ জনের ৯ জনকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় অনেকের ভ্রু কুঁচকেছে। বিস্ময়করভাবে পুলিশ তাদের ক্ষেত্রে সন্ত্রাস দমন আইন আমলে নেয়নি। পুলিশ কি সন্দেহভাজনদের জামিনে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে চাপে ছিল?

সরকারের সম্ভবত ধারণা হয়েছে, তল্লাশি অভিযানের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর খুঁজে পাওয়া অস্ত্রের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে না দিলে জনভীতি প্রশমিত হবে। সোশ্যাল মিডিয়াও ব্লক করেছে সরকার। এ কথা সত্য, গোলযোগ সৃষ্টিকারীরা বা তাদের সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার করছে বিদ্বেষ ও ভীতি ছড়ানোর জন্য। কিন্তু নিষিদ্ধকরণে উল্টো ফল হয়। বরং সরকারের উচিত ইন্টারনেটে মিথ্যা ও উসকানিমূলক প্রচারণা নজরে রাখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সেনাপ্রধান বলেছেন, অতি বেশি বিচরণ-স্বাধীনতা বোমা হামলার মতো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানোর সুযোগ করে দিয়েছে। গত ১০ বছরে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, আশপাশের কোনো দেশে তা দেওয়া হয়নি। কারো দেহ তল্লাশি করা হয়নি, যে কেউ সরকারি ভবনে, হোটেলে বা অন্য স্থাপনায় ঢুকে পড়েছে। এ সুযোগই বোমা হামলাকারীরা নিয়েছে। তাঁর কথায় সত্যতা রয়েছে। গোয়েন্দা ব্যর্থতাও রয়েছে। মূলধারার মুসলিম সংগঠনগুলোও বলছে, ২০১৪ সাল থেকে তারা সরকারকে সতর্ক করছে—ইসলামী চরমপন্থীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। কিন্তু কাজ হয়নি। গোয়েন্দা ব্যর্থতার চেয়েও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যর্থতা বেশি।

প্রেসিডেন্টের দায়ও কম নয়। সরকার বা প্রেসিডেন্ট আসলে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখেন না। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, তারা রাজনৈতিক কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে আইএস-জাতীয় সংগঠনের বেড়ে ওঠায় সহায়তা করেছে। নিরাপত্তা বিষয়ে আগের সরকারেরও ব্যর্থতা রয়েছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের বৃহদংশে যে অসন্তোষ রয়েছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। ২০১৪ সাল থেকে তারা কার্যত অবরুদ্ধ। বেশ কয়েক জায়গায় তারা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকার কার্যত কিছু করেনি। পুলিশ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ। তাদের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা বোধ কাজ করছে, তা আরো খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা ও সতর্কতার প্রয়োজনও রয়েছে। সময় ফুরিয়ে যায়নি, সব দলকে সর্বোত্তম সমাধানের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করতে হবে।

সূত্র : দ্য আইল্যান্ড (শ্রীলঙ্কা)

অনলাইন; ভাষান্তর ও

গ্রন্থনা : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য