kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

সাদাকালো

বিএনপিতে গণতন্ত্রচর্চা কতটুকু?

আহমদ রফিক

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিএনপিতে গণতন্ত্রচর্চা কতটুকু?

বহু প্রচলিত কথা, কারো মতে অভিযোগ, ‘দলটি জন্ম নিয়েছে ক্যান্টনমেন্টে’—প্রতিবাদী গণ-আন্দোলনের টানে বা মাধ্যমে নয়, নয় জন-আকাঙ্ক্ষার চাপে। সামরিক শাসকের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল জাগদল হয়ে বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি’)। প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনৈতিক স্বপ্ন বিএনপি।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের চেতনা বিভাজিত। ব্যাপক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চেতনার প্রাধান্যভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। স্বভাবতই ধর্মীয় টানে এর জনপ্রিয়তা, সেক্যুলার গণতান্ত্রিক আদর্শের টানে নয়। এখানেই জাতীয়তাবাদের বিভাজনে মূল সূত্র, এর সঙ্গে জড়িত আনুষঙ্গিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলো।

যেমন আপাত ভারতবিরোধিতা, চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রাধান্য। আর এ দুটি বিষয় কেন্দ্র করে এবং আওয়ামীবিরোধিতার টানে চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের দলে দলে প্রথমত জিয়া বন্দনা, পরে বিএনপিতে যোগদান। তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এ ইঙ্গিতটুকু রাখেনি যে এ উপলক্ষে আওয়ামীবিরোধী বাম ঘরানার তৃতীয় শক্তির দলীয় বিকাশ ভবিষ্যৎ বামপন্থী রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করত, শক্তিমান ভিত তৈরি করত।

এতে একটি সম্প্রদায়বাদী (বা অন্তত আধাসম্প্রদায়বাদী) দলে যুক্ত হয়ে মার্ক্সবাদী দর্শনের মুখে সংকীর্ণতার কালি মাখাতে হতো না। কিন্তু সম্ভবত অন্ধ আওয়ামীবিরোধিতার প্রবল টানে তারা উল্লিখিত ভুলটিই করেছিল এবং বাংলাদেশের প্রগতিবাদী রাজনৈতিক সম্ভাবনা দূরে ঠেলে দিয়েছিল। এর পরিণাম কয়েক দশকের রাজনৈতিক নৈরাজ্য, দুই প্রধান দলের বাংলাদেশি রাজনীতির মঞ্চে দাপাদাপি, সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্র নাশের চর্চাই রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এর পরিণাম সার্বিক বিচারে এ দেশীয় রাজনীতির জন্য শুভ হয়নি। উভয় দলেই কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির চর্চা প্রাধান্য পেয়েছে। অনেকটা একনায়কি শাসনব্যবস্থার মতো। সেই সঙ্গে পরিবারতন্ত্র আপন বৈশিষ্ট্যে জেঁকে বসেছে। বিএনপির ক্ষেত্রে সেটা আরো প্রকট। তাই দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ডিঙিয়ে তরুণ যুবা তারেক রহমান একেকটি ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, স্থায়ী ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান।

আশ্চর্য, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রশ্রয়ে তারেক রহমানের কথিত ‘হাওয়া ভবনের’ স্বেচ্ছাচার, তারেক-মামুনসহ বহু ধরনের দুর্নীতি, প্রশাসনকে আঙুলের ডগায় পরিচালনা ইত্যাদি নিয়ে স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার পত্তন। একই রকম প্রশ্রয়ে তারেকের শক্তির কেন্দ্র স্বৈরতন্ত্রী বাবর-হারিছসহ বহু যুবা রাজনীতিকে দূষিত করে তোলে।

কিন্তু রাজনীতির চাকা তো ঘুরতে থাকে সদা পরিবর্তনের টানে। সেই টানে কখনো প্রতিপক্ষের জয়। বিএনপি এখন তার অতীত অপকর্মের মাসুল গুনছে, তারেক রহমানকে প্রবাসে-নির্বাসনে পাঠিয়ে এবং সম্প্রতি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে। জানি না, আওয়ামী লীগ এসব ঘটনা থেকে অতিমাত্রিকতার দূষণ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবে কি না।

দুই.

দুর্ভাগ্যজনক যে গণতন্ত্রী নামে ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিএনপি অতীত ঘটনা থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষা নেওয়ার কোনো বিচক্ষণতা দেখাতে পারেনি। সন্তান স্নেহ বড় অন্ধ। কুরুক্ষেত্রের অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র থেকে আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক কুড়োবই কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধী তার প্রমাণ। সেখানে আবার জেন্ডার প্রাধান্য, পুরুষ প্রাধান্য।

কালদর্শী কবি সুধীন্দ্রনাথের অতিবাস্তবিক কাব্য চরণটিরও মর্মার্থ সম্ভবত এঁদের কারোর জানা নেই : ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ থাকে না। থাকে না সর্বনাশের ঘট পূর্ণ করতে। অবশ্য কখনো কখনো ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায়। আপাতত বিএনপির সম্পর্কে এসব বিচারব্যবস্থা এতটাই সত্য যে একাধিক ঘটনা তার প্রমাণ বহন করছে।

এত কিছুর পরও বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটিও তাদের সাংগঠনিক অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা বাতিল করে রেখেছে। এবং তা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যেমন সুসময়ে, তেমনি অসময়ে বা দুঃসময়ে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন অবস্থায় তো বটেই, ক্ষমতা হারানোর পরও। তাই খালেদা জিয়ার কিছুটা অসুস্থতা উপলক্ষে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের যৌথ নেতৃত্ব সক্রিয় হওয়ার বদলে নির্বাসিত তারেক রহমানই দলের একনায়ক—হত্যাকর্তা-বিধাতা।

বিস্ময়কর যে দলের অভিজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ নেতারা নিঃশব্দে বিনা প্রতিবাদে তা হজম করে চলেছেন। নাজমুল হুদা সাহেবের ছিটকে পড়ার পেছনে কি এমন কোনো, না অন্য কোনো কারণ সেখানে সক্রিয় ছিল? খালেদা জিয়ার দুর্বলতায় ও প্রশ্রয়ে ‘হাওয়া ভবনের’ প্রতাপ বিএনপির শেষ আমলে এতই বেড়েছিল যে তখন তা ছিল মহানগরীতে বহুকথিত ‘টক অব দ্য টাউন’। রোম পোড়ে আর সম্রাট নিরো বাঁশি বাজায়—অবস্থা অনেকটা প্রতীকী মাত্রায় তুলনীয়। হাওয়া ভবনের মাঠে ক্রিকেট খেলার অভিনয় করেন যুবরাজ। মহানগরবাসী অনেকে তখন এসব ঘটনা উপভোগ করেছে, অবশ্য অনেকে ক্ষুব্ধ।

সময় তাদের এসব রাজনৈতিক খেলার বিলাস ফিরিয়ে দিয়েছে। ভাবতে বিস্ময় লাগে মওদুদ, মোশাররফ, গয়েশ্বর প্রমুখ এবং সর্বশেষ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেমন করে এসব অবমাননা হজম করেছেন বিনা প্রতিবাদে। তাঁদের জন্য অন্য কোনো রাজনৈতিক বিকল্প ছিল না বলেই কি নীরবে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা? কিন্তু তাঁদের সুসময়ের চরিত্র তো ভিন্ন হওয়ার কথা নয়।

ভুলভ্রান্তিতে দীর্ঘ দুঃসময়ের পালা শেষ মূলত ড. কামাল হোসেনের চেষ্টায় যদি বা বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়, তখনো বোধগম্য কারণে তাদের দলীয় সাংগঠনিক শক্তি অতিশয় দুর্বল। ক্ষমতাসীন দলের দাপটে তারা আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, মধ্যস্তরের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার এড়াতে দৌড়ের মুখে। তাদের শেষ ক্ষমতাসীন অবস্থার ঠিক বিপরীত দৃশ্যচিত্র। তবে আচরণের দিক থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পার্থক্য স্পষ্ট। সম্ভবত সেটা দলীয় অভিজ্ঞতার পার্থক্যে।

কিন্তু বড় কথা হলো, নির্বাচনে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও একদিকে যেমন দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দৃঢ় ছিল না, তেমনি নেতৃত্বে মতভেদও সম্ভবত যথেষ্ট গভীরই ছিল—মনে হয় অনিচ্ছাকৃত ঢেঁকি গেলার মতো ঘটনা তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ। হয়তো তাই নির্বাচনে সংগঠিত অনিয়ম (বিবিসিসহ বহুকথিত) নিয়ে তাদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

উদ্ভট ফলাফল ঘোষণা ও প্রকাশের পর তা প্রত্যাখ্যান করেই বিএনপি ও গণফোরাম নেতা খালাস। বলিষ্ঠ প্রতিবাদী আন্দোলন তৈরির চেষ্টা ও ক্ষমতা, কোনোটাই তাঁরা দেখাননি বা দেখাতে পারেননি। বরং সিদ্ধান্ত—নির্বাচিত গুটিকয়েক জয়ী সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করবেন না, সংসদে যোগ দেবেন না। এ ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া ছিল সর্বাধিক তীব্র। তাঁর বিবৃতি ও ঘোষণায় তেমন নজির মেলে।

এখানেই আমাদের প্রশ্ন, নির্বাচনে অংশগ্রহণে খালেদা ও তারেকের কি সম্মতি ছিল? সমকালীন প্রকাশিত সংবাদগুলো তেমন ইঙ্গিত দেয় না। এখন মনে হয় ছিল। ছিল মির্জা ফখরুলের ভিন্নমত সত্ত্বেও। তবে সংবাদপত্রে এমন ইঙ্গিতও ছিল যে নির্বাচনে যোগদান খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে। শপথগ্রহণ প্রসঙ্গেও একই রকম ইঙ্গিত প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে।

তবে বিস্ফোরক তথ্যের প্রকাশ হলো শপথে অংশগ্রহণে তারেকের নির্দেশ; বিব্রত মির্জাসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা। আবারও প্রমাণিত হলো বিএনপি চলে রাজপরিবারের ইঙ্গিতে, নির্দেশে, যেমন চলেছে এত দিন। বাকি সবাই নামকাওয়াস্তে নেতা। এবং তারা ক্ষমতাসীন অবস্থায় অমৃতভোগী; এটাই একমাত্র আকর্ষণ। এ রাজনীতি কতটা প্রকৃত স্বদেশভিত্তিক রাজনীতি আর কতটা উপভোগের রাজনীতি, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।

এসব নেতা আত্মপ্রতারণার শিকার, জেনেশুনে বিষপানের মতো, যে বিষ কখনো মধু বা অমৃত অবস্থার পরিবর্তনে, তাই অবমাননা সহনীয়। কাউকে না জানিয়ে তারেকের একক সিদ্ধান্ত তাই সবাই যথারীতি মেনে নিয়েছেন। সবচেয়ে হাস্যকর মহাসচিবের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। একটি সিঙ্গেল কলাম খবর : ‘সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না, ফখরুল।’ এভাবে দলের একজন মহাসচিব নিজের মাথা নিজে মুড়োয়? তা-ও আবার একদা বাম রাজনীতিক? বিশ্বাস করা কঠিন। গয়েশ্বর রায় ভিন্ন কথা বলতে চেয়েছিলেন, যে জন্য তারেকের কঠোর নিঃশব্দ হুঁশিয়ারি?

শেষ কথাটা হলো ‘চেইন অব কমান্ড’ রক্ষার নামে বিএনপির নেতাকর্মীরা কত দিন দলে পরিবারতান্ত্রিক শাসন মেনে চলবে; গণতন্ত্র পত্তনের জন্য বিদ্রোহ করবে না।

লেখক : কবি, প্রবান্ধিক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য