kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

সামাজিক নৃশংসতার প্রেক্ষাপটে পরিবার

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সামাজিক নৃশংসতার প্রেক্ষাপটে পরিবার

আজ আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। জাতিসংঘ একটি প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে পরিবার দিবস পালনের আহ্বান জানায়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ফ্যামিলি ও ক্লাইমেট অ্যাকশন’। এবং দিবসের তাৎপর্য হিসেবে টেকসই উন্নয়নের ১৩ নম্বর লক্ষ্যকে বিবেচনায় আনা হয়েছে।  বিশ্বব্যাপী পরিবেশ পরিবর্তন ও বিপর্যয়ের জন্য মানুষ আবাসন সমস্যাসহ অন্যান্য সমস্যায় জর্জরিত। মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। এর জ্বলন্ত উদাহরণ মিয়ানমার সরকারের নৃশংসতা, যে কারণে রোহিঙ্গারা পরিবারের কোনো কোনো সদস্যকে হারিয়ে আজ আমাদের দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আমাদের কাছে মনে হয়, এমন নৃশংসতা সামনে রেখে জাতিসংঘ সুন্দর একটি প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে। জাতিসংঘের প্রতিপাদ্যকে সম্মান জনিয়ে আমাদের দেশের সামাজিক নৃশংসতার আলোকে নিবন্ধটির আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি। পরিবার সমাজের আদিম ও প্রাচীনতম সংগঠন। মানুষ জন্মের পর বিক্ষিপ্তভাবে জীবন যাপনের দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে সংগঠিত রূপদানের প্রত্যয়ে পরিবার নামক সংগঠনের অস্তিত্ব আমরা লক্ষ করি এবং এ ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। পরিবারকে সংগঠন ধরে নিলে বিবাহকে আমরা বলি প্রতিষ্ঠান। কেননা, একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতির মাধ্যমে এবং সর্বজনীন ও স্থায়ী সম্পর্কের মনোভাব নিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে পরিবার গঠিত হয়। পরিবার হলো যাবতীয় সম্পর্কের সূতিকাগার। একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনের জন্য পরিবারই একমাত্র আশ্রয়স্থল। পারিবারিক জীবন যাপনে বিশৃঙ্খলা এবং জীবনহানির জন্য পরিবারের বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেমন—এতিমখানা কিংবা বয়স্ক নিবাস; কিন্তু পরিবারের বিকল্প একমাত্র পরিবারকেই গণ্য করা হয়। আমাদের প্রয়োজনে এমন বিকল্পকে মেনে নিলেও আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সবাইকে পরিবারভুক্ত করা এবং  শেখার প্রাথমিক স্তর পরিবারকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা।

পরিবারকে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা আমরা কোনো না কোনোভাবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পরিবারে বসবাস করি। শিশু জন্মগ্রহণের পর তার প্রথম চাহিদা আরামদায়ক পরিবেশ। ধীরে ধীরে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে অন্যান্য চাহিদা তৈরি হয়। মানুষরূপে মানবীয় গুণাবলি রপ্ত করতে নৈতিক আচরণ প্রথমত পরিবারের মাধ্যমে শিখতে হয়। কিভাবে কথা বলতে হবে, অন্যের সঙ্গে কী রকম আচরণ করতে হবে, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া, মমত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা তৈরি ও জাগ্রত হয় পরিবার থেকে। শৈশবের পর তার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, যার ভিত্তিও পরিবার। যাবতীয় বিষয় একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে। শৈশবে যদি শিক্ষণ সঠিক ও ভালো হয়, তাহলে পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব পড়ে। পরিবারের বাইরে অন্য অনেক বিষয় শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে চায়। পরিবারের ভিত যদি এ ক্ষেত্রে শক্ত ও মজবুত হয়, তাহলে বাইরের প্রভাব তেমন কাজে আসে না। পরিবারকে একমাত্র ও মুখ্য চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

পরিবার থেকে শেখার বিষয়গুলো সব শিশুর বেলায় সমান হয় না। ছিন্নমূল, পারিবারিক ভাঙনের শিকার শিশু, কঠোর অনুশাসনে বড় হওয়া শিশু এবং অযত্ন ও অবহেলায় লালিত-পালিত শিশুদের বেলায় পারিবারিক ও সামাজিক গুণাবলি রপ্ত করার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সম্ভব হয় না। বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা এবং ভিন্ন পরিবেশে বসবাসের সুযোগ থাকলেও আমরা তাকে ভিন্ন পরিবারই বলি। ফলে সেখানে পরিবার নামক প্রত্যয় ও পরিবেশ থাকলেও পরিবারের আসল স্বাদ পাওয়া দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। এমন জায়গায় বড় হওয়া শিশুরা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, ভালো-মন্দ তুলনামূলকভাবে কম বুঝতে পারে। ফলে সমাজের অনেক কিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাদের শেখার ক্ষেত্রেও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এমনও হতে পারে সম্পূর্ণ ভুলের মধ্যে তাদের শিক্ষণ অতিবাহিত হয় ও জীবন গড়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম, অবহেলা ও অযত্নে বড় হওয়া শিশুরা কিভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে। এমতাবস্থায় তাদের মধ্যে বিচ্যুতি, অসংলগ্নতা ও নৃশংস মনোভাব জাগ্রত হওয়া কোনোভাবেই অবান্তর নয়। এ তো গেল ভিন্ন পরিবেশ ও পরিবারব্যবস্থার বাইরের প্রেক্ষাপটে বড় হওয়া শিশুদের কথা। আমাদের সমাজে বেশির ভাগের বসবাস সম্পূর্ণ পরিবারে, যেখানে মোটা দাগে সবই আছে। হয়তো নেই কোনো আর্থিক সমস্যা, কিন্তু বেড়ে ওঠার জন্য খাদ্য ও অন্যান্য কাঠামোগত উপাদান ছাড়াও অনেক মূল্যবান জিনিস রয়েছে, যার সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরি না হলে মানবীয় আচরণসম্পন্ন মানুষ হওয়া কঠিন। চাহিদা পরিপূর্ণভাবে পূরণ না হলে পরিবারেও শিক্ষণ প্রক্রিয়ার যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।

কাঠামোগতভাবে পরিবার সঠিক এবং পারিবারিক পরিবেশও বিদ্যমান, কিন্তু যে জিনিসটি নেই তা হলো সামাজিক ও মানবীয় গুণাবলি এবং আচরণের শিক্ষণ। ফলে শিশু-কিশোররা এমনভাবে বড় হয় যেখানে সুষ্ঠু ও সুন্দরের পরিবর্তে দেখা যায় অসুন্দর ও অসংগঠিত আচরণ। পরিবারের মূল ভূমিকা পালন সহজ হয়নি বিধায় মা-বাবার কাছে সন্তান বোঝা মনে হচ্ছে। তাঁরা অন্যের কাছে নিজেদের মুখ দেখাতে পারছেন না। এখানে তাঁদের ভূমিকাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। যদি তাঁরা তাঁদের কাজগুলো ঠিকমতো করতেন তাহলে অন্য রকম হতো। পরিবারে বসবাস করছি, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিখছি না কিংবা তাদের শেখাতে পারছি না। পরিবারে থাকছি, কিন্তু বৈরী পরিবেশে মানুষ হচ্ছি। তখন পরিবারে থাকা ও না থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। 

প্রতিদিন ঘটতে থাকা সামাজিক অপরাধ, বিশৃঙ্খলা ও নৃশংসতার অন্য অনেক কারণের মধ্যে পারিবারিক শিক্ষা বড় বিষয়। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে অন্য একটি ঘটনা আমাদের সামনে হাজির হয়। সর্বশেষ সংযোজন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে চলন্ত বাসে ধর্ষণ শেষে একজন সিনিয়র নার্সকে হত্যা। এমন সব ঘটনার হোতা সমাজের শিক্ষিত তরুণ ও বয়স্ক থেকে শুরু করে স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বিভিন্ন দিক দিয়ে অন্যদের তুলনায় আলাদা। তাদের এমন নৃশংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিবারের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। আমরা আইন ও বিচারের মাধ্যমে সামাজিক এমন সব অপরাধ ও নৃশংসতাকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি। যদি আইন ও বিচার কঠোর হতো, তাহলে কিছুটা উন্নতি হতো। কিন্তু প্রতিরোধ করতে চাইলে পরিবারের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। সংখ্যার বিচারে আমরা খুব কমই পরিবারের বাইরে বসবাস করি। তবে পরিবারে থেকে পারিবারিক শিক্ষাকে আমাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনতে পারছি না। এ কথা সত্য, পরিবারের বাইরেও অনেক উপাদান আমাদের ওপর এখন প্রভাব বিস্তার করে আসছে। সেগুলো কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। এর মাধ্যমে আমরা কোনো ভালো ফল পেতে পারি। 

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য