kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

শিষ্টাচারের অধিষ্ঠান

গোলাম কবির

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিষ্টাচারের অধিষ্ঠান

অভিধান বলছে ‘শিষ্ট’ শব্দটির অর্থ শান্ত, ভদ্র, সুশীল, সুবোধ, নীতিমান, শিক্ষিত, মার্জিত; আর ‘আচার’ শব্দের একাধিক অর্থের মধ্যে অন্যতম হলো শিষ্টজনদের অনুমোদিত পদ্ধতি বা নিয়ম। এ দুটি শব্দের সম্মিলিত সন্ধিরূপ শিষ্টাচার—অর্থ ভদ্র ব্যবহার। এই অভিধাটি কথায় ও কাজে সম্যক উপস্থাপনকারীকে আমরা বলি শিষ্টাচারী।

আরবি ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘কুল্লু মাওলুদিন ইউলাদু আলাল ফিতরাতি’, রুশো অন্যভাবে যাকে বলেছেন, ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি বাট এভরিহোয়ার হি ইজ ইন চেইনস।’ এসবের সামগ্রিক অর্থ দাঁড়ায় মানবসন্তান আবিলতামুক্ত স্বকীয় সত্তা নিয়েই জন্মায়। তারপর গৃহকোণ এবং চারপাশের পরিবেশ তাকে শিষ্ট কিংবা অশিষ্টের প্রতি ধাবিত করে।

লেখা বাহুল্য, শিষ্ট হওয়ার প্রাথমিক সূতিকাগার গৃহকোণ। জনক-জননী এবং পরিবারের অন্য সদস্যের ভেতর শিশু যদি প্রতিনিয়ত অশিষ্ট আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়, তবে তার পক্ষে শিষ্টাচারী হয়ে ওঠা কঠিন। বাইরের পরিবেশের চাপে যতটুকু নমনীয় থাকে, তা কৃত্রিম। ব্যতিক্রম হিসেবে গোবরে পদ্মফুল ফোটে না, তা নয়। আমরা যাকে সহজাত বলি, তা কিন্তু শিষ্টাচার শেখার মধ্যে পড়ে না। শিষ্টাচার ধারণ করতে হয়। যে হতভাগ্য শিশু গৃহকোণ থেকে শিষ্টাচারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগবঞ্চিত, সাধারণভাবে দেখা যায় তাদের ডাকসাইটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। অভিভাবকদের বিশ্বাস, সেখানে তাঁদের সন্তান শিক্ষা ও শিষ্টাচারে পারদর্শী হয়ে ভবিষ্যতে ‘দুধে-ভাতে’ থাকার যোগ্যরূপে বেরিয়ে আসবে। জনক-জননী, ধনী-নির্ধন, শিক্ষাপ্রাপ্ত-শিক্ষাবঞ্চিত যা-ই হোন না কেন, মানবচরিত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁরা ধারণ করে থাকলে তাঁদের সন্তানরা তা অনুসরণ করে। লেখা বাহুল্য সেসব মৌলিক বৈশিষ্ট্যই শিষ্টাচার।

মিথ্যাচার বর্জন করে সততার অনুগামী হওয়া, কূপমণ্ডূকতার পরিবর্তে উদারতা প্রদর্শন, বয়োজ্যেষ্ঠের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানো, সমবয়সী ও কনিষ্ঠদের স্নেহ-ভালোবাসার ছায়ায় রাখা ইত্যাদি আচরণের শিক্ষাগুলো সাধারণত গৃহকোণ থেকেই শিশুরা আয়ত্ত করতে পারে। তারা যদি দেখে বড়রা নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিকে অপমান করছে, তখন তারা ভাবতে শেখে, এটাই বোধ করি বড় হওয়ার পন্থা। তারা লেখাপড়া শিখে পদ-পদবিতে যত দূর পর্যন্ত উঠুক না কেন, শিষ্টাচারী হয়ে ওঠে না। কর্তব্যের স্বার্থে যেটুকু শিষ্টাচার প্রদর্শন করে, তা লোক-দেখানো। মনে রাখা দরকার, মেকি কোনো কিছু দিয়েই আদর্শবাদী হওয়া যায় না কিংবা আদর্শ শেখানো যায় না। তাইতো যুগে যুগে দেখা গেছে মহামানবরা নিজের জীবনের সব কর্মকাণ্ডে শিষ্টাচারের পরাকাষ্ঠা রেখে গেছেন।

সব মানুষ পূর্ণ শিষ্টাচারী হবে—এমনটি ভাবা যায় না। তাহলে উত্তম-অধমের পার্থক্য থাকবে কোথায়? হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের এই মধুময় পৃথিবী ছেড়ে আমরা কোন অদৃশ্যলোকের জন্য মনুষ্যত্ব বিসর্জন দেব! না, আমরা এই পৃথিবীতেই থাকব এবং আমাদের মর্তভূমিকে কল্যাণের আশ্রয়স্থলরূপে গড়ে তুলব। তার জন্য প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত শিষ্টাচারী হওয়া। সভ্যতা আমাদের এমন বন্ধুর পথে নিয়ে চলেছে যে আমরা অনেকে গৃহকোণে স্বজন-সন্ততির সান্নিধ্যে সময় দেওয়ার অবকাশ পাই না। জানি না একে অভিশাপ, না আশীর্বাদ বলব!

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদাতারা এবং কর্ণধাররা হবেন শিষ্টাচারের পরাকাষ্ঠা। এই বৈশিষ্ট্য না থাকলে তাঁদের শিক্ষকতায় না আসাই শ্রেয়। কারণ তাঁদের আচরণ থেকে শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু শেখে না। জানা কথা, ব্যক্তিগতভাবে শিষ্টাচারী না হয়ে অপরকে শেখানো মহা অপরাধ। এ সত্য স্মরণে রেখে, কোনো ব্যক্তির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর অতীত শিষ্টাচারবিরোধী আচরণ পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়।

আমরা শিষ্টাচারের পীঠস্থান খুঁজতে গিয়ে বলেছি, আজকের দিনে গৃহকোণ তথা পরিবারে তার সন্ধান পাওয়া কঠিন। কারণ বেশির ভাগ মা-বাবা জীবিকা কিংবা আরো ওপরে ওঠার সংগ্রামে এমনই ব্যস্ত যে সন্তানদের প্রতি ফিরে দেখার সময় তাঁদের হয় না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁদের শেষ আশ্রয়। এই আশ্রয় যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে জাতীয় বিপর্যয় ঠেকানো হয়তো অসম্ভব হবে।

দুর্ভাগ্য, কোনো কোনো ওই গালভরা নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু কর্ণধার বা সুযোগ পেয়ে যাওয়া শিক্ষক দায়গ্রস্ত অভিভাবকদের প্রতি এমনই আচরণ করেন, যা সভ্য মানুষের আচরণে শোভা পায় না।

মনে রাখা ভালো, সবার চিরদিন সমান যায় না। কবির ভাষায়, ‘এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে।’ কদাচারীর অশিষ্টের পরিণতি সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেবে কালের চক্র। যাকে রবীন্দ্রনাথ ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ২০ আষাঢ় বলেছেন :

‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

আমরা রবীন্দ্রনাথের এই সকাতর শঙ্কা জয় করে শিষ্টাচারের অনুশীলনে ধনে-মানে-জ্ঞানে সবার সমান হয়ে উঠব, সেই বিশ্বাস রাখতে পারি না কি?

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 

মন্তব্য