kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

মরীচিকার টানে এ কেমন করুণ মৃত্যু

মিল্টন বিশ্বাস

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মরীচিকার টানে এ কেমন করুণ মৃত্যু

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ‘প্রবাসে দৈবের বসে’ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে অনাহার আর দারিদ্র্যে বিচলিত কবি সেদিন রক্ষা পেয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহায়তায়। শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে সমুদ্রপথে জাহাজে করে রেঙ্গুন যাওয়ার বর্ণনা আছে। সেটিও কর্মের টানে, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বাঙালির দুর্ভোগ পোহানোর কাহিনি। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে ভাগ্যান্বেষী, জীবিকার তাগিদে অদক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমজীবী মানুষ ভিটামাটি বিক্রি ও ঋণ করে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। নিজ দেশে থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে কখনো বা অচেনা দেশের জঙ্গলে কবরস্থ হচ্ছে; কখনো বা সমুদ্রের হিমশীতল জলে সমাধিস্থ হয়ে বাংলাদেশের অভিবাসী ইতিহাসে নতুন করুণ কাহিনি তৈরি করছে। গত ৯ মে ঠিক একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ভূমধ্যসাগরের নৌকাডুবির ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৪ বাংলাদেশির বর্ণনা থেকে জানা যায়, ছয় মাস আগে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ার পর নিদারুণ কষ্টের অভিযাত্রা ছিল এটি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগরের হিমশীতল পানিতে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে তাদের। তিউনিসিয়ার জেলেরা আসে জীবনের দূত হয়ে। যখন তাদের উদ্ধার করা হয়, ততক্ষণে নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের তলিয়ে যেতে দেখেছে তারা। তারা ৯ মে রাতে লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের জুয়ারা শহর থেকে প্রায় ৭৫ আরোহীসহ একটি বড় নৌকায় রওনা হয়। উপকূলে ওই নৌকা থেকে আরোহীদের আরেকটি ছোট নৌকায় তোলার অল্প সময়ের মধ্যেই তা ডুবে যায়। মর্মান্তিক ওই নৌকাডুবির পর অভিবাসীদের উদ্ধারে একটি মাছ ধরার নৌযান নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী। তারা জীবিতদের পাশাপাশি তিনজনের মরদেহ উদ্ধারে সমর্থ হয়। ওই নৌকার আরোহীদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ছিল। তাদের মধ্যে ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। আগেই লিখেছি জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি। তিউনিসিয়ার জেলেরা যদি তাদের দেখতে না পেত, তাহলে জীবিত কাউকেই পাওয়া যেত না, আর কখনোই এই নৌকাডুবির ঘটনা জানতে পারত না কেউ। সমুদ্রপথে রওনা হওয়ার আগে মানবপাচারকারীরা তাদের আটকে রেখেছিল, দিনে একবার খাবার দেওয়া হতো, কখনো কখনো কিছুই জুটত না। ৮০ জন মানুষের জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট। খাবারের জন্য কাঁদতে হতো। জমি বিক্রি বা ঋণ করে তারা সবাই পাচারকারীর হাতে প্রায় পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিল। অর্থাৎ দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশ গমনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়লেও সেই পথে পা বাড়াচ্ছে অসংখ্য মানুষ। অন্যদিকে বৈধ কর্মী হওয়ায় প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির কঠিন শ্রমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে; দেশের প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে গতিশীল হয়েছে। তাহলে অবৈধ উপায়ে বিদেশ গমনের সব দুয়ার বন্ধ করার দিন এসেছে আজ। 

অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী’ সীমান্ত ভূমধ্যসাগর। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৩ হাজার মানুষ মারা গেছে বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। বর্তমানে তুরস্ক ও ইউরোপের দিকের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইতালির ওপর চাপ বেড়েছে। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে নৌকায় করে অবৈধভাবে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা অনেক পুরনো। এর আগেও নৌকা ডুবে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। শুধু ইউরোপ নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যেতে গিয়েও অনেক বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছে। যেমন—২০১৫ সালের ২৭ আগস্টে সমুদ্রপথে লিবিয়া যাওয়ার পথে ২৪ জন বাংলাদেশিসহ ১১৮ জনের মৃত্যু হয়। সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে ২০১৫ সালে নিহত সিরীয় শিশু আয়লানের ছবি সবাইকে কাঁদিয়েছিল। বাংলাদেশি রমজান আলীর শিশুপুত্র ইউসুফ একই সময় ভেসে গিয়েছিল ভূমধ্যসাগরে। যুদ্ধ ও দারিদ্র্য থেকে রেহাই পেতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলো থেকে হাজার হাজার শরণার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ফলে উত্তাল সাগরে নৌকা ডুবে তাদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছে।

অবৈধ উপায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে উন্নত বিশ্বে যাওয়ার চেষ্টা করে নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছে অসংখ্য বাঙালি। ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি বা ইউরোপে পাড়ি জমানো কিংবা মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার দুর্গম মরুপথ ও ঝুঁকিময় নৌপথ হয়ে অন্য কোনো দেশে উপস্থিত হওয়া অথবা সমুদ্রপথে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়া মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে অনুপ্রবেশ করেছে, সেই তালিকার শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে ৮ নম্বরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তথ্য মতে, ইউরোপে এখন কাগজপত্রহীন অবস্থায় অর্থাৎ অবৈধভাবে বসবাস করছে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি।

আমাদের মনে আছে ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে কবরস্থ করা বাংলাদেশিদের করুণ ইতিবৃত্ত। মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশের প্রত্যন্ত এলাকার জঙ্গলের গভীরে গণকবরের সন্ধানের পর দুই দফায় ৩২ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কয়েকজনকে জীবিতও উদ্ধার করা হয়। মৃতদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিল বলে জানিয়েছিলেন সেখান থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া এক বাংলাদেশি। প্রত্যেক অভিবাসীর জীবনে একটি গল্প আছে। সেই গল্পটি যন্ত্রণা আর অপরিসীম দুঃখ-কষ্টের।  

সিরিয়া ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে। তাই সেখানকার নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুমদ্রপথ পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশিরা কেন জীবনের এত ঝুঁকি নিচ্ছে? শুধু ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে। শুধুই কি ভাগ্যান্বেষণ, নাকি বিদেশে যাওয়ার প্রলোভন। এক জরিপে দেখা গেছে, আরো ভালো জীবনযাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়। এসব তরুণ মনে করে নিজের দেশে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তা ছাড়া বাংলাদেশিদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন সব সময়ই তীব্র। গত ৪০ বছরে এক কোটি বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছে। আর তাদের ৭৫ শতাংশই গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু এই প্রবণতাকে কাজে লাগাচ্ছে অসাধু দালালচক্র। কারণ মানুষ নিরন্তর ভালো থাকার প্রচেষ্টায় নিজ দেশে কঠোর পরিশ্রম করতে আগ্রহী। বিদেশে উন্নত জীবনের লোভ দেখানো হয়—আর দালালের কথায় বিশ্বাস করেই সাগরে গরিবের ভাগ্য তলিয়ে যায়। অনেক মানুষ পথেই মারা যায়। যারা ফিরে এসেছে কিংবা ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছে তারা জানিয়েছে, ইউরোপে গেলেই ভাগ্য ফিরবে, এমন আশায়ই তারা গিয়েছিল।

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনা প্রমাণ করল এ দেশের মানুষ একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বিপজ্জনক পথে ইউরোপ যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করা হচ্ছে। আসলে এখন ইউরোপ-আমেরিকায় বৈধপথে এবং যোগ্যতা নিয়ে যাওয়া ছাড়া কেউ সুবিধা করতে পারছে না। এ জন্য সবার আগে আমাদের জনগণকে সচেতন করতে হবে। মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এসব ঘটনায় অপরাধীর শাস্তি হলে দালালচক্রের কাজগুলো বন্ধ হবে। দেশে অভিবাসীসংক্রান্ত আইনের ধারা সম্পর্কে আরো বেশি প্রচার দরকার। আর দালালচক্রের কর্মকাণ্ড নির্মূল করার জন্য কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। অভিবাসী আইনে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তা, প্ররোচনা ইত্যাদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কাজেই অপরাধী শনাক্ত ও আইনের প্রয়োগ যথাযথ অনুসরণ করা হলে বাংলাদেশিদের প্রবাসের করুণ মৃত্যু ও দুর্ভোগ শেষ হবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 [email protected]

মন্তব্য