kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

সাহসী স্বপ্ন দেখানো মায়েদের জন্য ভালোবাসা

দিল মনোয়ারা মনু

১২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাহসী স্বপ্ন দেখানো মায়েদের জন্য ভালোবাসা

মা দিবস। প্রত্যেক সন্তানের কাছে এটি একটি মহিমান্বিত দিন। তাই বলে এই নয় যে সারা বছর আমরা মাকে নিয়ে ভাবি না। তাঁরা সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গে আছেন অবিচল নিষ্ঠার মধ্যে আলোকবর্তিকা হয়ে। আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য শিক্ষায় আদর্শে বড় করে তুলছেন শুধু তাঁরাই নন, যে মায়েরা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন চিরদিনের জন্য, তাঁরা আমাদের জীবনে এখন আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে পথ দেখাচ্ছেন, সতর্ক করছেন, আলো-অন্ধকার বুঝতে সাহায্য করছেন। কারণ তিনি মা, তাঁর সন্তানকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলা তাঁর মানবিক দায়িত্ব। আমাদের দেশে শুধু নয়, সারা পৃথিবীর সৎ, কৃতি, দেশপ্রেমী, শ্রেষ্ঠ মানুষদের গড়ে তোলার পেছনে মায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যাঁদের জীবন আমাদের প্রতি মুহূর্ত আলোকিত করে, পথ দেখায়। এঁদের মহান জীবনের দিকে তাকিয়ে খুঁজে পাই নেপথ্যের সেই অতন্দ্রপ্রহরী মাকে। আমরা পরম শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় তাঁকে নিত্য স্মরণ করি। আশা রাখছি, এই প্রজন্মের মায়েরাও তাঁদের সেই শিক্ষা ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাঁদের গড়ে তুলবেন। সাহস দেবেন, পথ দেখাবেন, সঙ্গে থাকবেন।

জন্মগ্রহণের পর থেকেই মা-বাবা, বিশেষ করে মায়ের ভালোবাসা আমাদের রক্তে দোলা দেয়, বুকের গভীরে ঢুকে যায়, আনন্দে সমস্যায় সংকটে গভীর মমতায় তাঁকে আমরা অনুভব করি, আমরা তখন ঠিকই চিনে নিই মাকে। উপলব্ধি করি হৃদয়, মন, বিবেক দিয়ে। তাই তো দেখি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদগ্ধজনরা এখনো ত্যাগী মহিমাময়ী মায়ের কথা স্মরণ করে অশ্রুসজল হয়ে ওঠেন। আমাদের দেশের ইতিহাসের মহানায়ককে দেখেছি জীবনের তুমুল জটিলতার মধ্যেও মায়ের ভালোবাসার গভীরতাকে অনুভব করতে। অনুভব করেন তাঁর ভালোবাসার শক্তিকে। প্রত্যেক মায়ের মধ্যেই বৃহৎ একটি মহত্তর স্বপ্ন থাকে, যেটি সযত্নে এঁদের মধ্যে রোপণ করেন মা-ই। বাবাও স্বপ্ন দেখেন এবং দেখান পথ, নির্দেশনাও দেন; কিন্তু অলক্ষ্যে সেই স্বপ্নটি নিজে ধারণ করে সন্তানের মধ্যে সযত্নে রোপণ করেন মা।

এ রকম উদাহরণ সৃষ্টিকারী মা আমাদের সমাজে বহু রয়েছেন। এই অসংখ্য মাকে নিয়ে আমরা প্রতি মুহূর্ত গর্ব করতে পারি। অঙ্গীকার নিতে পারি এঁদের আদর্শকে নিজেদের জীবনে গ্রহণ করে, ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার, দায়িত্ব নিতে পারি, উদ্যোগ নিতে পারি তাঁদের জীবনের সততা সাহসের গল্প সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার। কারণ এখন প্রায়ই দেখতে পাই মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার ক্রমান্বয়ে নিম্নগামী হওয়ার চিত্র। অবমাননাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে অনেক মা-বাবার জীবনে। উচ্চশিক্ষিত ছেলে মাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে, নিজের হাতে কষ্ট করে তিলে তিলে তৈরি করা মায়ের নিজের বাড়ি থেকে তাঁকে বের করে দেওয়ার মতো নির্মম ঘটনা। অন্যের সহযোগিতায় নিদারুণ মনঃকষ্ট নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে অনেকের জীবনে। মনের এই দীনতা, সংকট কাটানোর জন্য উপরোক্ত ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বুঝতে হবে ভালোবাসা মানে কেয়ার এবং শেয়ার, অন্যের ভালো-মন্দ, দুর্যোগ-সংকটকে ভাগ করে নেওয়া। মানুষ মাত্ররই এই মানবিক গুণগুলো থাকা দরকার। এর বাইরে স্বার্থপরের জীবন কোনো জীবনই নয়। ইদানীং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমার মনে দারুণ রেখাপাত করেছে। মা দিবসের প্রাক্কালে ঘটনাটি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিচ্ছে। সেদিন দেখেছিলাম মায়ের কাঁধে ভর দিয়ে একটি তরুণ ছেলে হাঁটছে, ব্যালান্স নেই, তাই বারবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ছেলেটির স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভালো, প্রায় প্রবীণ এবং ক্লান্ত মা নিজের সব শক্তি দিয়ে ওকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। পায়খানা-প্রস্রাবের কথা ও সব সময় বলতে পারে না। এই মাকেই সেই দুঃসহ সময়ের মোকাবেলা করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শেই ওকে মাঝেমধ্যে বাইরে নিয়ে আসতে হয়। এই মায়ের যুদ্ধ অন্য রকম। নিজের জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময়ই এই প্রতিবন্ধী সন্তানকে সময় দিতে হয়। এই মা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, অসম্ভব মনঃকষ্ট হলে চিৎকার করে কাঁদি, পরক্ষণেই ওর মুখের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভুলে যাই। কারণ আমি তো ওর মা। ও আমার আত্মজ। ওকে ওর মতো করেই গড়ে তুলে একটি নিশ্চিত জীবন দেওয়াই মা হিসেবে আমার একমাত্র চাওয়া। সারাক্ষণ চেষ্টা করি ওকে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার। আমি জানি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবা না পেলে ওর শরীরে প্রতিবন্ধিতা একসময় স্থায়ী রূপ নেবে।

আমরা জানি, শারীরিক ও মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের যদি সঠিক সময়ে শনাক্ত করা যায় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া যায়, তাহলে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে এগিয়ে যেতে পারে। সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার অধিকার শিশুর মৌলিক অধিকার। মা-বাবাকে, বিশেষ করে মাকে সচেতন হওয়া দরকার জন্মের পরপরই, শিশুর প্রতিবন্ধকতাকে যাতে শনাক্ত করতে পারেন। সঠিক সময় শনাক্ত করা হলে সুচিকিৎসায় শিশু অনেকটাই ভালো হয়ে যাবে। যেহেতু মাকেই এই সন্তানের গড়ে ওঠাসহ বেশির ভাগ দায়িত্ব নিতে হয় শিশুর শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্বতার কারণে জন্মের আগে ও পরে। তাই তার উপযুক্ত আইনগত সুরক্ষাকে বিশেষ রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তার যত্ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং শিশুর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ও স্বচ্ছন্দ বিকাশের জন্য এবং সর্বোপরি দরকার শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সুন্দর, আনন্দ, ভালোবাসা এবং সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশ। এই উপলব্ধির দায়িত্ব অন্যদের সঙ্গে মায়ের ওপরই বেশি বর্তায়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমরা এমন অনেক আলোকিত নারীর সন্ধান পেয়েছি, যাঁরা পাহাড় ভেঙে পথ তৈরি করেছেন, নিজেদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর এঁদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছেন একজন সাহসী, প্রত্যয়ী মা। আজ মা দিবসে এঁদের গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি। স্যালুট জানাচ্ছি এসব মায়ের উদ্দেশে।

যে মায়েরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন, এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত অবধি ছুটে বেড়ান সব বাধাকে উপেক্ষা করে শুধু সন্তানের শিক্ষা, পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তার ভবিষ্যৎ সফল ক্যারিয়ার নিশ্চিত করার আশায়, তাঁদেরও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তবে শুধু তাঁদের বলি, সন্তানের নিশ্চিত ক্যারিয়ার কিংবা অনেক বড় চাকরি, বিপুল রোজগারের পথ উন্মুক্ত করাই শুধু মা-বাবার দায়িত্ব নয়। মা-বাবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, সন্তান আনুষ্ঠানিক সুশিক্ষার পাশাপাশি গভীর দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলিতে ঋদ্ধ হয়ে বেড়ে উঠছে কি না, শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারছে কি না সেটা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকা।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা