kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

সংযমের মাসে বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

ইসহাক খান

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংযমের মাসে বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীরা ১১ মাস ব্যবসা করে, রমজান মাসে আত্মশুদ্ধি করে, সংযম করে, দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দেয়। আর বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ১১ মাস আত্মশুদ্ধি করে, সংযম করে, রমজান মাসে ব্যবসা করে, মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এমন কথা আমাদের দেশে চালু আছে।

এমন বৈপরীত্য বোধ হয় শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। সংবাদমাধ্যমে আমরা খবর পাই, অমুক দেশ রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দিয়েছে। সবাই বলে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। আর আমরা বাংলাদেশের মুসলিমরা রমজানকে পুঁজি করে সারা বছরের ব্যবসা এক মাসেই করে ফেলছি।

সেই শিশুকাল থেকেই এই ব্যবস্থা দেখে আসছি। রমজানের আগে আগে আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিটিং করেন। ব্যবসায়ীরা মন্ত্রীকে কথা দেয় তারা জিনিসপত্রের দাম বাড়াবে না। তাদের সেই বাণী গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। আমরা শুনে ধন্য হই। আশায় বুক বাঁধি। এবারও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে ব্যবসায়ীরা মিটিং করল। তারপর মিটিং শেষে ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিল, এই রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না।

আমার ধারণা, ব্যবসায়ীদের এই ঘোষণা দেশবাসী বিশ্বাস করেনি। বিশ্বাস করার কথা নয়। একই চিত্রনাট্য প্রতিবছর দেখে দেখে দেশবাসী অভ্যস্ত এবং ক্লান্ত। কিভাবে বিশ্বাস করবে?

রমজানের এক সপ্তাহ আগে জিনিসপত্রের দাম তেমন ওঠানামা ছিল না। ভেবেছিলাম, ব্যবসায়ীরা এবার ঈমানদারের পরিচয় দেবেন। কিন্তু রমজানের আগের দিন থেকে সেই চিত্র দ্রুত পাল্টে যায়। রাতারাতি জিনিসপত্রের দাম হাইজাম্প দিতে শুরু করে। ভাবা যায়, ছোট সাইজের একটি তরমুজের দাম ৩০০ টাকা। রমজানে আমাদের নবীজি (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। সেই কারণে ইফতারে খেজুর থাকাটা মুসলমানদের কাছে পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সেই খেজুর মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। প্রতি কেজি খেজুর ৩০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে দাম হাঁকছে দোকানিরা। মুরগির কেজি ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকা। গরুর মাংস কোথাও ৬০০ টাকা কেজি, আবার কোথাও তারও বেশি। এই তালিকা বলতে গেলে ক্রমেই দীর্ঘ হবে। তার পরও বলা শেষ হবে না।

আমাদের কর্তাব্যক্তিরা কিছু পণ্যের দাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলন। সিটি করপোরেশন থেকে মূল্যতালিকা দোকানে টাঙানোর কথা থাকলেও কোনো দোকানেই মূল্যতালিকা ঝোলানো হয় না।

এ নিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটেছে গত ৬ মে। সকাল তখন ৮টা। কারওয়ান বাজারে পাইকারি আড়তে তখন ক্রেতা-বিক্রেতারা ভীষণ ব্যস্ত। সেই সময় আড়তগুলোতে নজরদারি করতে আসে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের একটি তদারকি দল। তাদের সঙ্গে পুলিশ না থাকায় আড়তদাররা প্রথমে বুঝতে পারেনি। এই টিমের নেতৃত্বে থাকা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক তালিকা ঝোলানো না থাকার কারণে দুটি আড়তকে জরিমানা করার নির্দেশ দেন। শুরু হয় এলাহি কাণ্ড। ছোটাছুটি শুরু হয় দোকানদারদের মধ্যে। সে এক তামেশগিরি কাণ্ড। দেখার মতো নাটকীয় দৃশ্য শুরু হয়। পাগলের মতো ছোটাছুটি করে দোকানদাররা মূল্যতালিকা খুঁজে বের করে দোকানে ঝোলাতে থাকে। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। তদারকি দলের অন্য সদস্যরা আগে থেকেই এই দোকানগুলো মনিটর করে রেখেছিলেন। এরপর একই অপরাধে সব দোকানকেই পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করে তদারকি দল।

অভিযান শেষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সংবাদমাধ্যমকে জানান, এক দিন আগেই সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল মূল্যতালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙানোর জন্য। কিন্তু তারা কথা শোনেনি। তাই এই অভিযানে সবাইকে জরিমানা করা হলো। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে তাদের নিয়ম মানতে বাধ্য করা হবে।

খুবই মূল্যবান কথা বলেছেন ওই কর্মকর্তা। মানুষকে বাধ্য না করলে কোনো ভালো কথা কিংবা ধর্মীয় কোনো বাণীতে তাদের মানসিক উন্নয়ন অসম্ভব। বিশেষ করে আমাদের মতো চরম নৈতিক অবক্ষয়ের দেশে। গোটা জাতি যেখানে গভীর খাদে নিমজ্জিত—সেই জাতিকে ভালো কথা কিংবা নীতি-নৈতিকতার বাণী শুনিয়ে কোনো লাভ হবে না।

কয়েক দিন আগে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত কয়েকটি বড় আড়তদারকে কয়েক শ বস্তা পচা খেজুর রাখার দায়ে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা করেন। এই যে লাগাতার অভিযান চলছে তার পরও আমাদের ব্যবসায়ীদের মানসিকতার পরিবর্তন হয় না। তারা ভোক্তাকে পচা, মেয়াদোত্তীর্ণ মাল খাইয়ে ডাবল মুনাফা করতে চায়। ফরমালিনযুক্ত ফল খাইয়ে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ করে মেরে ফেলতেও তাদের বাধছে না। তাদের টাকা চাই, অনেক টাকা। সেই টাকা যেনতেনভাবে তাদের পেতে হবে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা