kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ওদের কমে, আমাদের বাড়ে কেন?

ড. হারুন রশীদ

১০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ওদের কমে, আমাদের বাড়ে কেন?

পবিত্র রমজান সিয়াম সাধনার মাস। কুপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা ও আত্মশুদ্ধির জন্য সর্বোত্তম মাস হচ্ছে রমজান। পুণ্যময় এই মাস রহমত, বরকত ও মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। সংযত সুন্দর জীবনের শিক্ষা দেয় রমজান। বস্তুত মুসলিম বিশ্বের কাছে বহুল কাঙ্ক্ষিত মাস হচ্ছে পুণ্যময় এই রমজান। এ মাসে প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেকের জন্য সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা ফরজ। পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে জাগতিক সব বিষয়ে সংযত জীবন-যাপনের। সব ধরনের অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকাও রমজানের শিক্ষা।

রমজান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন দেখা দেয়। রমজানে অপরিহার্য এমন অনেক পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায় কোনো কারণ ছাড়াই। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে কারসাজি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়, যা রমজানের চেতনার পরিপন্থী। অন্যদিকে এই সংযমের মাসেই দেখা যায় বিত্তশালীদের বাড়াবাড়ি। তাঁরা খাদ্যের অপচয় করেন। অথচ অনাহারী ও অভাবক্লিষ্টরা কত কষ্টে থাকে। তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও রমজানের শিক্ষা।

রমজানে জনভোগান্তি দূর করার জন্য সব সময়ই দাবি থাকে। কিন্তু দেখা যায় এ সময় নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানজট তীব্র আকার ধারণ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংকট দেখা দেওয়া, ভেজালের সমারোহ বৃদ্ধি ইত্যাকার সমস্যায় জর্জরিত থাকে মানুষ। অথচ সংযমের মাস পবিত্র রমজানে সব ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতা ও নীতি-নৈতিকতার উন্মেষ ঘটার কথা।

যে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ান, তিনি অন্তত রমজানে তা করবেন না; যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায়, তারা তা থেকে বিরত থাকবে, যানজট দূর করতে আগের থেকেও সক্রিয় হবে পুলিশ—এভাবে সব ক্ষেত্রেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায় মানুষ। কিন্তু রোজার প্রথম ধাক্কাটা লাগে পণ্যের বাজারে। এবারও বেগুনের দাম হয়েছে বাজারভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা। বেসনের মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। অথচ অন্য দেশে কোনো উৎসব-পার্বণে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ভালোভাবে সবাই সেই উৎসবে অংশ নিতে পারে। যেমন ধরা যাক আরব আমিরাতের কথা। সেখানকার ব্যবসায়ীরা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিচ্ছেন মূল্য হ্রাসের ঘোষণা।

যেখানে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় রমজান মাসে পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলেন, সেখানে আরব আমিরাতের ব্যবসায়ীরা সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পবিত্র এই মাসে নিত্যপণ্যে বিশেষ মূল্যছাড়ের ব্যবস্থা করেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। আরব আমিরাতের অধিকাংশ বড় মার্কেট, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দোকান ও সুপারশপগুলোতে এরই মধ্যে বিশেষ মূল্যহ্রাস সম্পর্কিত নানা রকমের পোস্টার লাগানো হয়েছে। এমনকি নামাজের পর মসজিদগুলোর সামনে মুসল্লিদের মধ্যে বিলি করা হচ্ছে মূল্যহ্রাসসংক্রান্ত হ্যান্ডবিল। আরব আমিরাতের ব্যবসায়ীদের মতে, রমজানের মাহাত্ম্য আর রোজাদারদের প্রতি সম্মান জানিয়ে পবিত্র এই মাসে ভালো কাজের কয়েক গুণ প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ তারা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না। এ যেন আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। একই অবস্থা মালয়েশিয়াতেও। আর এই রমজানে মধ্যপ্রাচ্যের মতো মালয়েশিয়াতেও চলে মূল্য ছাড়ের প্রতিযোগিতা। মহিমান্বিত এ মাসকে স্বাগত জানিয়ে মালয়েশিয়াতে রোজার শুরুতেই নিত্যপণ্যে বিশেষ মূল্য ছাড়ের প্রতিযোগিতা চলে। ব্যবসায়ীরা যেন পাল্লা দিয়ে মূল্য ছাড় ঘোষণা করেন। অধিকাংশ বড় মার্কেট, সুপারশপ, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দোকানগুলোতে লাগানো হয় বিশেষ মূল্য ছাড় সম্পর্কিত নানা রকম পোস্টার।

আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র। এ ব্যাপারে অনেক কথা হলেও কাজের কাজ খুব কমই হয়। এবারও রমজানের শুরুতেই প্রয়োজনীয় অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। দেখার যেন কেউ নেই। ভোক্তাদের পকেট কাটা যাবে আর প্রশাসনযন্ত্র তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে—এটা হতে পারে না। এ ব্যাপারে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ন্যায্য মূল্যে ভোক্তারা পণ্য পায়।

রমজানে টিসিবির কার্যক্রম আরো জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বাজারে সমান্তরাল একটি সরবরাহব্যবস্থা থাকলে কোনো সিন্ডিকেটই খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না। তা ছাড়া নিম্ন আয়ের লোকজন যেন অল্প দামে জিনিসপত্র কিনতে পারে, সে ব্যবস্থাও চালু রাখা প্রয়োজন। এ জন্য শুধু নামে কার্যক্রম চালালেই হবে না, যথেষ্ট পণ্য যেন মজুদ থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখাও জরুরি। আর টিসিবির পণ্য যেন সব জায়গাতেই পাওয়া যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণাও চালাতে হবে।

রমজানে ভেজালবিরোধী অভিযানও জোরদার করা জরুরি। আশার কথা হচ্ছে, প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানে ভেজালবিরোধী অভিযান চালাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রমজানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ইফতারে খাদ্য ভেজাল নিয়ে গত ২৫ এপ্রিল ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সভাপতিত্বে জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘পবিত্র এই মাসে রাজধানীতে ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিতে ও খাবারে সব ধরনের ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করবে পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ডিএমপির তত্ত্বাবধানে সক্রিয় থাকবে এই আদালত।’ রমজানে যেকোনো মূল্যে খাদ্যসামগ্রী ভেজালমুক্ত করা হবে—এটিই দেখতে চায় মানুষ।

রমজানে যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতিতে নানা কৌশল নির্ধারণের কথা থাকলেও তা টিকছে না। স্থবির রাস্তায় অস্বস্তি আর ভোগান্তি নিয়ে যানবাহনে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়েছে অফিসগামী মানুষকে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তায় যানজট হচ্ছে। সারা বছর ধরে চলা যানজটের ধারাবাহিকতায় রমজানেও তার প্রভাব পড়েছে। মেট্রো রেলের জন্য উন্নয়নকাজ চলায় মিরপুরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে অনেক দিন ধরে। রমজানেও তা থেমে নেই। এর ফলে এক লেনে দুটির বেশি গাড়ি যেতে পারছে না। ফলে দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট। রমজানের সময় খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখার দাবি থাকলেও তা হয়নি।

রমজানে যানজট দূর করতে ট্রাফিক বিভাগকে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। যানজট দূর করা, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, ভেজাল বন্ধ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ঠিক রেখে জনভোগান্তি দূর করাই হবে এ মুহূর্তের করণীয়।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা