kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

আমরা শপথ করছি...

মোস্তফা মামুন

৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমরা শপথ করছি...

শপথ ব্যাপারটার মধ্যে যে বিরাট ফাঁকি আছে, সেটা বুঝেছিলাম অনেক আগে, যেদিন দেখলাম পরিচিত একজন মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে গড়গড় করে একগাদা মিথ্যা বললেন। যদিও আগে নিয়মমাফিক পাঠ করেছেন, ‘আমি শপথ করছি, যাহা বলিব সত্য বলিব...।’ দেখে অবাক হয়ে পরিচিত একজন বললেন, ‘আপনি এত সুন্দর করে বললেন যে মনে হলো, সব নিজের চোখে দেখেছেন। অথচ ছিলেন তো কয়েক মাইল দূরে।’

মিথ্যা বলাটা অনেকের কাছে শিল্পের মতো। আর শিল্পের স্বীকৃতি পেলে যে কারোরই ভালো লাগে। তিনি হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরে মিয়া, শপথ তো আর সৃষ্টিকর্তার কাছে করছি না যে মিথ্যা বলা যাবে না।’

আমাদের এখানে শপথের একটা সুবিধা আছে। এবং মনে করি, আমাদের সংবিধানের এটা একটা শক্তির জায়গা যে এখানে কোনো ধর্মীয় আচার বা প্রকাশ নেই। এমনকি যা যুক্তরাষ্ট্রেও আছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই, তবে জর্জ ওয়াশিংটন শপথ নেওয়ার সময় বাইবেলে হাত রেখেছিলেন বলে এটা এখন একটা প্রথার মতো। প্রায় প্রেসিডেন্টই প্রথাটা অনুসরণ করেন। ভারতেও ‘ঈশ্বরের নামে শপথ করছি’—এ রকমই ব্যাপার। ঈশ্বরের নামে শপথ করেও এরা ঈশ্বরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া কাজগুলো নির্দ্বিধায় করেন, কাজেই আমাদের এরাও নীতিবহির্ভূত কাজ-কারবার করবেন, তা স্বাভাবিক। শপথ অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। অথচ এই শপথ নিয়ে গত কয়েক মাস দেশের রাজনীতির জল এত ঘোলা হয়েছে যে তা থেকে দুর্গন্ধ বেরোনোর জোগাড়। তবে নাটকীয়তায় আরেকটা জিনিস জানা হলো। আমাদের রাজনীতিকরা যত নিচে নেমেছেন বলে আমরা মনে করি, বাস্তবে তাঁরা নেমেছেন আরো অনেক নিচে।

শপথ নিয়ে দারুণ সব ঘটনা ঘটত সামরিক সরকারগুলোর সময়। হয়তো দেখা যেত, একজন বিরোধী নেতার নামে অনেক মামলা, পত্রপত্রিকায় তাঁর লুটের খবর বেরোচ্ছে, পুলিশ বাড়িতে হানা দিচ্ছে। ঠিক এ রকম সময় হঠাৎ একদিন বিটিভির ৮টার খবরে তিনি হাজির। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।

আবার শপথ নেওয়ার স্বপ্ন দেখে কেউ কেউ বিপথেও যেতেন। শাহ মোয়াজ্জেমের আত্মজীবনীমূলক একটা বইয়ে আছে, একজন সামরিক শাসক তাঁকে ফোন করে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গে যোগ দিন।’

শাহ মোয়াজ্জেম চাপে পড়ে দেখা করতে রাজি হলেন। জানানো হলো যে তাঁর জন্য গাড়ি পাঠানো হবে।

গাড়ি পাঠানোও হলো। তিনি সেজেগুজে গাড়িতে উঠলেন। কিন্তু বঙ্গভবনের বদলে গিয়ে নামলেন কেন্দ্রীয় কারাগারে। মানে মাঝের সময়টাতে কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কে সর্বময় ক্ষমতাধরকে অন্য ধারণা দিয়ে গণেশ উল্টে দিয়েছে।

সামরিক আমল গেছে। শপথের নামে নাটক দেখা ভেবেছিলাম শেষ। বহু বছর পর আবার পুরনো দিনের গানের মতো স্মৃতির দেয়াল পেরিয়ে বেরিয়ে এলো।

এবারের শুরুটা সুলতান মনসুরকে দিয়ে। ডাকসুর সাবেক ভিপি। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। আজও দেখি সেই আমলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সুলতানের বিষয়ে আবেগাপ্লুত—তাঁর গল্প উঠলে শেষ হতে চায় না। মানুষটি ‘সুলতানি’ কৃতিত্ব দেখালেন এবারের উল্টা স্রোতের নির্বাচনে জিতে। মুজিব কোট ধরে রেখে, বিএনপির সমর্থকপুষ্ট মিটিংয়ে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়াতে আদর্শেরও একটা গর্বিত প্রকাশ ছিল। কিন্তু ভোটে জেতার পরই ভোল পাল্টে শপথমুখী মনোভাব নেওয়া আদর্শগত গৌরবে কালির পোঁচ লেপে দিল। বিএনপি সমর্থকদের কাছে তিনি তখন ‘বিশ্বাসঘাতক’। কয়েক মাস পর সুলতান এখন পুরোপুরি দায়মুক্ত। তিনি তো আওয়ামী ঘরানার মানুষ, স্রেফ বাধ্য হয়ে দল বদলালেও দর্শন বা বিশ্বাস বদলাননি। তা ছাড়া জেতার পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তারও একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রার্থীরা, যাঁরা পুরোপুরি ধানের শীষের ভোটে জিতেছেন, তাঁরা দলের বিপর্যয়ে, নেত্রীকে জেলে রেখে, সব রকম অবস্থান অগ্রাহ্য করে যে শপথ নিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন, তাতে বোঝা যায়, এই রাজনীতিতে এখন পদ আর প্রাপ্তি ছাড়া কিছুরই চর্চা নেই। কিসের দল! কিসের নেত্রী! ‘আমি আর আমার চেয়ার, ব্যস, এই নিয়েই আমার সব কারবার।’

অতএব শপথ হলো। তাঁরা সংসদে গেলেন। বিএনপির বক্তৃতাবাজি আপাতত থামা উচিত। এই নির্বাচনকে ‘রাতের আঁধারের নির্বাচন’, ‘মিডনাইট ক্যু’—এসব কথা আর তাদের মুখে মানাবে না। সাধারণ মানুষ বলতে পারবে। তারা আর পারবে না। ও হ্যাঁ, মির্জা ফখরুল কিছুটা পারবেন।

জাভেদ ভাই সেই পয়েন্টটাই বললেন সবার আগে, ‘মির্জা ফখরুল বাংলাদেশে তো অমর হয়ে গেলেন।’

‘অমর হলেন কোথায়? মরার দশাই তো বরং। নিজের দলের সামান্য কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আটকাতে পারলেন না।’

‘কিন্তু নিজেকে তো পারলেন।’

‘দলের মহাসচিব, দলের একটা পরিষ্কার অবস্থান আছে নির্বাচন বিষয়ে, তিনি কী করে শপথ নেন। তাহলে দলের আর অবস্থানের থাকেটা কী?’

‘এখনো আর কিছু নেই। যাহোক, কর্মীদের ভয়ে হোক আর যে কারণেই হোক, এই বাংলাদেশে একজন মানুষ এমপির মতো একটা লাভজনক পদ—সেটা প্রত্যাখ্যান করছে, এই লোককে ইতিহাসের মনে রাখতে হবে।’

‘তুমি মনে হয় কৃতিত্বটা বেশি দিয়ে দিচ্ছ।’

‘না, বেশি দিচ্ছি না। তুমি কিছুদিন পর আরো বেশি করে বুঝবে। এই বাংলাদেশ আর ছাড়ার বাংলাদেশ নয়, এই বাংলাদেশ এখন কাড়ার বাংলাদেশ। যে যা পারছে কেড়ে নিচ্ছে, সেখানে একজন কিছু তো ছাড়ল।’

‘কিন্তু তারেক রহমানই তো ওদের শপথের সিদ্ধান্ত দিলেন।’

‘না দিলে কী উপায় ছিল? এরা তো শপথ নিতই। যখন কোনোভাবে ঠেকানো যাবে বলে মনে হচ্ছিল না, তখন মুখ বাঁচাতে তারেক ওই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’

‘কিন্তু এটা মুখ বাঁচানোর হলো না মুখ লুকানোর হলো! এদেরকে তো দল বহিষ্কার করতে পারত। তাতেই তো বরং লাভ হতো।’

জাভেদ ভাই একটু ভেবে বলে, ‘লাভ হতো কি না জানি না; কিন্তু নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে ঠিক বিশ্বাসঘাতকতা হতো না।’

‘এটা তোমার হিসাবে পুরোপুরি বিশ্বাসঘাতকতা?’

‘হ্যাঁ, নিজেদের কর্মীদের দিক থেকে দেখলে বিশ্বাসঘাতকতা। আবার অন্যভাবে বললে ঋণ শোধ।’

‘ঋণ শোধ! কার ঋণ শোধ?’

‘শোনো, যেভাবেই দেখি না কেন, তাদের এই জয়ে সরকার বা সরকারি দলের কোনো একটা ভূমিকা ছিল। প্রশাসন কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কোনো এক সমীকরণে ওদের জন্য জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল। সে রকম জায়গা অন্য জায়গায় পেলে বিএনপির আরো অনেকে জিততেন। সেই হিসেবে সরকারের কাছে ওঁদের একটা কৃতজ্ঞতাও থাকে। একভাবে দেখলে ওঁরা সেই কৃতজ্ঞতার কথাটা মনে রেখেছেন। এখন বাংলাদেশের রাজনীতি এটাই, মানুষ-ভোটারকে কেউ মনে রাখে না। প্রশাসন-সরকারের কথা খুব ভাবে।’

‘কেউ কেউ তো ভেবেছিল, শপথটা একটা বার্গেইনিংয়ের মতো হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি।’

‘এই বিএনপি আসলে আর বার্গেইনিং করারও ক্ষমতা রাখে না।’

‘বিএনপি তাহলে শপথের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেল?’

‘বিএনপি শেষ কি না জানি না; কিন্তু ব্যক্তি রাজনীতিকদের প্রতি মানুষের শেষ বিশ্বাসটাও শেষ হয়ে গেল। ক্ষমতা পাওয়ার জন্য নেতারা ভোটারদের ভুলভাল বোঝান—এটা পুরনো কথা। কিন্তু এভাবে যে বিক্রি করে দেবেন, এটা অবিশ্বাস্য।’

ঠিক। কল্পনাও করতে পারিনি এই নির্বাচনে বিএনপির জেতারা এমন মাথা নিচু করে শপথ নেবেন। খালেদা জিয়া জেলে বসে এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কেন তাঁর আজকের এই পরিণতি। এ রকম লোক শিষ্য হলে শত্রুর আর দরকার পড়ে না।

জাভেদ ভাই হঠাৎ করে বলে, ‘কই, তুমি না রাজনৈতিক কৌতুক বলতে পারো। দল বদলানো নিয়ে একটা জম্পেশ কৌতুক বলো।’

একটু ভেবে বললাম, ‘এটা তো ঠিক দল বদলানোর ঘটনা নয়। এর চেয়ে বরং অন্য একটা কৌতুক বলি। রাজনীতিকদের প্রতি মানুষের ধারণা সম্পর্কে।’

রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটা বাস চলছিল। পথে একটা সেতু ভেঙে পড়ল পানিতে। বেশির ভাগই মারা গেলেন; কিন্তু কয়েকজন জীবিত আছেন জেনে তাঁদের উদ্ধার করতে ছুটল জরুরি সাহায্য সংস্থা। গিয়ে দেখে, কেউ জীবিত নেই।

স্থানীয় জনগণকে প্রশ্ন করা হলো, ‘সবাই তো ঘটনাস্থলে মারা যায়নি। কয়েকজন জীবিত ছিলেন বলে আমাদের কাছে খবর ছিল। আপনারা তাঁদের উদ্ধার করলেন না?’

জনগণের উত্তর, ‘হ্যাঁ, কয়েকজন পানি থেকে মাথা তুলে বলছিল যে তাঁরা বেঁচে আছেন; কিন্তু জানেন তো রাজনীতিকদের কথা বিশ্বাস করতে নেই। তাই ওদের উদ্ধার করিনি।’

খুবই নিষ্ঠুর কৌতুক। কিন্তু এসব দেখে রাজনীতিকদের প্রতি মানুষ কেন আর বিশ্বাস রাখবে, বলুন!

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা