kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

আমাদের টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ

ফরিদুর রহমান

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ

গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক প্রচারিত হতো বছরে দুবার, ২৫শে বৈশাখ ও ২২শে শ্রাবণ কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবসে। তবে এসব নাটক প্রকৃতপক্ষে নাটক নয়, রবীন্দ্রনাথের গল্পের নাট্যরূপ অথবা তাঁর গল্প অবলম্বনে লেখা টেলিভিশন নাটক। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র বিরোধিতার যে সূত্রপাত ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতা চলেছে দশকের পর দশক। স্বাধীনতা-উত্তরকালে স্বল্প কিছু সময় রবীন্দ্রনাথকে সামগ্রিকভাবে উপস্থাপনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন রবীন্দ্রসংগীত বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দুটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। 

বাংলাদেশ টেলিভিশন নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে গ্রুপ থিয়েটারের মঞ্চে প্রযোজিত নাটক এবং দলীয় প্রযোজনা টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে টেলিভিশনের দর্শক মুক্তধারা, বিসর্জন, রাজা, অচলায়তন, চোখের বালি, ডাকঘরসহ বেশ কিছু নাটক সরাসরি রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও সংলাপে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি ‘ইচ্ছেপূরণ’ ছাড়া ছোটদের জন্য গল্প থেকে নেওয়া কয়েকটি নাটক নির্মিত হলেও কবির রচিত কোনো নাটক প্রচারিত  হয়েছে বলে মনে পড়ে না। উল্লেখ করা যেতে পারে, রবীন্দ্রনাথের লেখা পূর্ণাঙ্গ নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর ‘রক্তকরবী’ দিয়ে যে মানদণ্ড স্থাপন করে গেছেন, গত চল্লিশ বছরে তা অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। অভিনয়, দৃশ্যসজ্জা, আবহসংগীত, চিত্রগ্রহণ ও আলোক বিন্যাসের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অসাধারণ নৈপুণ্যের প্রকাশ ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের সৃজনশীল টেলিভিশন প্রযোজনার একটি অনন্য উদাহরণ।

ছোটগল্প, উপন্যাসের কাহিনি, নাটকের অংশবিশেষ এমনকি কবিতার নাট্যরূপ দিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন অনেক দর্শকনন্দিত নাটক প্রচার করেছে। এর মধ্যে শেষের কবিতা, স্ত্রীর পত্র, ক্ষুধিত পাষাণ, সমাপ্তি, গুপ্তধন, ব্যবধান, মুক্তির উপায়, বিচারক, বদনাম, শুভ দৃষ্টি, ডিটেকটিভ, সুভা, অতিথি, মেঘ ও রৌদ্র, মঞ্জুলিকা, পয়লা নম্বর, ঘরে-বাইরেসহ বহুল পঠিত অসংখ্য গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। রবীন্দ্র রচনাবলির ওপর থেকে কপিরাইটের বাধা-নিষেধ উঠে যাওয়া এবং নতুন শতকের শুরুতে অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের আবির্ভাবের সঙ্গে আশা করা গিয়েছিল বিটিভির সীমাবদ্ধতার বাইরে এসব চ্যানেল রবীন্দ্র কাহিনির নাটক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। কিন্তু ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব ও সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতার কারণে চ্যানেলগুলো রবীন্দ্র নাটক পরিবেশনের ক্ষেত্রেও কোনো উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। বিশেষ দিবসের বাইরে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে দীর্ঘ ধারাবাহিক নির্মাণের কথাও কেউ ভেবে দেখেছেন বলে মনে হয় না।  

রবীন্দ্রনাথের গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে প্রচারের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা এর গল্পকে আত্মস্থ করে রবীন্দ্র ভাবনার আলোকে দৃশ্য ও সংলাপের মাধ্যমে তা উপস্থাপন করা। প্রতিবছরই বিশেষ করে রবীন্দ্র জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে রেখে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অসংখ্য নাট্যরূপ নির্মিত এবং প্রচারিত হয়; কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় এদের অধিকাংশই একটি গল্পের উপরি-কাঠামোর ভেতরে চরিত্রসমূহের মুখে কথা জুগিয়ে কাহিনির সরল পরিবেশনা মাত্র। গল্পের অন্তর্নিহিত দর্শন বা গভীর অনুভবের কথা বাদ দিলেও মানবিক আবেগ-অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশ এবং রবীন্দ্র বাকরীতির পরিশীলিত সংলাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথোপকথনের অভাব প্রায়ই এসব নাটক উপভোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে নাট্যরূপের ক্ষেত্রে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন এমনকি আধুনিকায়ন করা যাবে না—তা নিশ্চয়ই নয়। তবে ‘নষ্টনীড়’ থেকে ‘চারুলতা’ নির্মাণের জন্য যে মুনিশয়ানা প্রয়োজন তা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ, বিকৃত এমনকি অগ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হচ্ছেন। এ ছাড়া সময়োপযোগী দৃশ্যপট নির্মাণ ও পোশাক-পরিচ্ছদও রবীন্দ্র গল্পের নাটক পরিবেশনার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে। ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে চ্যানেলগুলোর স্টুডিও সেট নির্মাণের ক্ষেত্রে অনীহা ও প্রয়োজনীয় লোকেশনের অভাবে নাট্য নির্মাতারা একই গল্প বা একই ধরনের কাহিনির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ব্যতিক্রম যে নেই বলা যাবে না, তবে তা নিতান্তই হাতে গোনা। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের নিত্যদিনের প্রাণপ্রবাহ। গানে-কবিতায়, নাটকে-প্রবন্ধে, আলাপ-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে আমরা আমাদের কোনো উদ্যোগ-আয়োজন কল্পনাও করতে পারি না। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিককালে রবীন্দ্রবিরোধিতা নতুন করে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব অশুভ কর্মকাণ্ড ও নেপথ্যের ষড়যন্ত্র শিকড়সহ উপড়ে ফেলার জন্য জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক শাসনামলের মতো টেলিভিশনের পর্দায় রবীন্দ্রনাথকে পুনরায় জন্ম ও মৃত্যু দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এই নব্য অচলায়তন থেকে বের হতে না পারলে জাতিগতভাবে বাঙালি ও বাংলাদেশ যে সংকটে পড়বে, তা থেকে উত্তরণ সহজসাধ্য হবে না।

 

লেখক : সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক বাংলাদেশ টেলিভিশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা