kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

পঁচিশে বৈশাখের ভাবনা

গোলাম কবির

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পঁচিশে বৈশাখের ভাবনা

১৩৪৫ সালের ২৫শে বৈশাখ কালিম্পংয়ের গৌরীপুর ভবনে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ‘জন্মদিন’ শীর্ষক একটি কবিতা রচনা করেন। সেটি ‘সেঁজুতি’ কাব্যে স্থান পায়। চিরপ্রস্থানের দুই বছর দুই মাস বাইশ দিন আগে কালিম্পংয়ের জন্মদিনে কবি চেতনায় জাগ্রত হয়েছিল :

আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে

ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে

মরণের ছাড়পত্র নিয়ে।...আজ আসিয়াছে কাছে

জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে।

আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা কালচক্রের বিভাজন করতে চান না। তাঁরা অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যেক এক বিন্দুতে স্থাপনে আগ্রহী। কবি রবীন্দ্রনাথ কালজয়ী কবি-দার্শনিক সুলভ ইনটুইশন বা সজ্ঞা দিয়ে প্রায় শতাব্দীকাল আগেই একালের বিজ্ঞানীদের ভাবনার মতোই ‘জন্মদিন-মৃত্যুদিন’কে এক বিন্দুতে অনুভব করেছেন। এটি বাঙালির পরম গৌরবের।

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন সামনে রেখে কিংবা ভাষা দিবসে কিছু বলতে গিয়ে আমরা হোঁচট খাই। ২৫শে বৈশাখ নাকি পঁচিশে বৈশাখ লিখব অথবা ২১ ফেব্রুয়ারির প্রাধান্য না একুশে ফেব্রুয়ারি! রবীন্দ্রনাথ এবং আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী উভয়েই পঁচিশে বৈশাখ এবং একুশে ফেব্রুয়ারি লিখেছেন তাঁদের অক্ষয় রচনায়। আমরা তা-ই অনুসরণ করব। মহাশ্মশানকে গোরস্থানকারীদের অবিমৃশ্যকারিতার মতো ভ্রান্ত পথে চলব না। প্রাধান্য দিব তাঁদের লেখাকে।

পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানমালার সূচনার ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’ গানটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশার শেষ জন্মদিন উৎসবের দুই দিন আগে ১৯৪১/১৩৪৮ সালের বৈশাখ মাসের ২৩ তারিখ রচিত। লেখা বাহুল্য, ১৩৪৮ সালের পঁচিশে বৈশাখ গানটি প্রথম গীত হয়। গানটিতে সুর দিয়েছিলেন শান্তিময় ঘোষ। তখন থেকে এ গান রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালনের অপরিহার্য অংশ হলেও এর আদলে কিছু কবিতা কবি ভাবনায় জাগ্রত হয়েছিল পূরবী কাব্য রচনার কাল থেকে। সেটি আমরা অবিলম্বে ফিরে দেখছি। তবে পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মোৎসব অনুষ্ঠানের সূচনা সংগীতে ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’ বলে যে অনুরাগে ব্যক্ত করেছিলেন, তার উপান্তে কবির আহ্বান ছিল, ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়, ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।’ জীবনের জয় ঘোষণা রবীন্দ্র প্রতিভার নতুন অভিধা নয়। কবি জীবনের সূচনা থেকে যে জগেপ্রমে তিনি নিমগ্ন ছিলেন, তার অমলিন বহিঃপ্রকাশ দেখি শ্রাবণ মাসের ২০ তারিখের গীতাঞ্জলিতে লেখা ১৩১৭ সালের কবিতায় :

‘যাবার দিনে এই কথাটি/বলে যেন যাই-/যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ এর এক দশক পরে পূরবীর ‘জন্মদিন’ কবিতায় কবি অনুভব করলেন, ‘ভুবনের উচ্ছলিত সুধার পিয়ালা’ পান করার জন্য তাঁর আগমনে তাই ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে’ নিমন্ত্রিত হয়ে মানবজীবনকে ধন্য মনে করেছেন তিনি।

শেষ রবিকিরণ বিচ্ছুরণের দিনগুলোতে ‘সভ্যতার সংকট’ রচনাকালে কবি আমাদের আবার নতুন করে জীবনের জয় ঘোষণা করে গেলেন। আমরা বলছিলাম এ ভাবনার অবয়ব নতুন নয়, পূরবী কাব্যের ‘জন্মদিন’ কবিতার উত্তরাধিকার। আমরা কিঞ্চিৎ ফিরে দেখি সেই অতুল কবিতাটি। সেখানে তিনি তাঁর ইনটুইশন বা সজ্ঞা দিয়ে সংস্কৃতি সভ্যতার ধারাকে পুষ্ট করে গেছেন।

শেষ জন্মদিনের ১৬ বছর আগে ‘পঁচিশে বৈশাখ’ শীর্ষক যে কতিবাটি রচনা করেন তার ভাব-ভাষায় তেমন পরিবর্তন নেই। পূরবীর কবিতাটি দীর্ঘ, যেন অখণ্ড অবসরে লেখা। আজকের অর্থাৎ ১৩৪৮ সালের পঁচিশে বৈশাখ থেকে যে গানটি রবীন্দ্র জন্মোৎসবের প্রারম্ভিক সংগীত হিসেবে পরিবেশিত হয়ে আসছে তাতে সুরের আবহ সংরক্ষণের তাগিদে সংক্ষেপিত রূপ দেওয়া হয়েছে। সে তৃষ্ণা পূর্ণ হয়েছে সুরের জাল বোনার ভেতর দিয়ে।

পূরবী রচনার প্রেক্ষাপট দেশ-বিদেশ। এ সময়ে তিনি কিছুকাল আর্জেন্টিনায় ভিকটোরিয়া ওকাম্পোর ভাড়া করা বাসভবন মিরাল ভিউভিলায় অবস্থান করছিলেন। ‘যৌবন বেদনা রসে উচ্ছল দিনগুলি’ এ সময়ে কবিচেতনায় নতুন করে হানা দেয়। তিনি আবার নতুন করে জীবন উপভোগের যেন প্রত্যয় ঘোষণা করেন। তাই জীবনের জয়গান ব্যক্ত করতে গিয়ে সেই পূরবীর ‘আহ্বান’ কবিতায় বলেন : আমারে যে ডাক দিবে এ জীবনে তারে বারম্বার/ফিরেছি ডাকিয়া।... ‘সহস্রের বন্যাস্রোতে জন্ম হতে মৃত্যুর আঁধারে চলে যাই ভেসে।’ তারপর ‘তব কণ্ঠে মোর নাম যবে শুনি, গান গেয়ে উঠি-/আছি আমি আছি।’ নিজের অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে অনুভব করেন। কবি কণ্ঠে পঁচিশে বৈশাখ ধ্বনিত হয় : ‘এই দিন বলে আজি মোর কানে/অম্লান নূতন হয়ে অসংখ্যের মাঝখানে/একদিন তুমি এসেছিলে/এ নিখিলে/নব মল্লিকার গন্ধে’... ‘সেই যে নূতন তুমি,/তোমারে ললাট চুমি/এসেছি জাগাতে/বৈশাখের উদ্দীপ্ত প্রভাতে।’ এ অনুভবের পরেই শুরু করেলন : ‘হে নূতন,/দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ পূরবীর কবিতায় অনেক কথা আছে, যা গানে স্থান পাওয়ার কথা নয়। (তা আগেই বলা হয়েছে—।) সে কথাগুলোর দু-একটি আমরা শুনতে পারি। ‘মনে রেখো, হে নবীন,/তোমার প্রথম জন্মদিন/ক্ষয়হীন—।...হোক তব জাগরণ/ভষ্ম হতে দীপ্ত হুতাশন।’

কবি একদা বলেছিলেন, (রাজশাহীতে বসে) ‘মিথ্যা আপনার সুখ, মিথ্যা আপনার দুখ’। তাই তিনি তাঁর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। ‘ক্ষয়হীন’ জন্মদিনকে তারুণ্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। মানুষ পৃথিবীতে আসে শুধু গতানুগতিক সম্পদ আহরণ আর বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিতে নয়, নয় ‘দুঃখের অনলে তিলে তিলে জ্বলতে’। মানবসমাজের জন্য তাঁর কিছু করণীয় আছে। সে কর্মযজ্ঞ যেন ‘অনন্তের অম্লান বিস্ময়’ হয়ে থাকে। যাকে গানের মধ্যে বলেছেন, ‘অসীমের চির বিস্ময়’। তাই তিনি নিজের জন্মদিনকে স্মরণ করতে গিয়ে অনাগত দিনের তরুণদের ডাক দিয়ে গেলেন পঁচিশে বৈশাখে। আমরা দিবসটি আয়োজনের দিনে উদ্দীপ্ত হই। ‘অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো’ এর চেতনায়। ক্ষণে ক্ষণে আবার ভুলে যাই। স্বার্থের টানে মানববিদ্বেষী হয়ে উঠি। আবার পঁচিশে বৈশাখ উদ্যাপন করি। এই স্ববিরোধিতা ত্যাগ করতে না পারলে রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদ্যাপন ফলপ্রসূ হয়ে ওঠা বিলম্বিত হয়ে প্রহসনে রূপান্তরিত হবে।

 

 লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা