kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সাদাকালো

হাস্যকৌতুক রসিকতায় অসামান্য রবীন্দ্রনাথ

আহমদ রফিক

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাস্যকৌতুক রসিকতায় অসামান্য রবীন্দ্রনাথ

রসিকতা, হাস্যকৌতুক যখন মালিন্যহীন শুদ্ধ স্নিগ্ধতা নিয়ে প্রকাশ পায়, তখন তা লেখায় হোক বা কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় হোক—রীতিমতো নান্দনিক চরিত্রের হয়ে ওঠে, সবার কাছেই উপভোগ্যতার শিরোপা পায়। বাংলা সাহিত্যে, বাঙালি সমাজে তা বিরল নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এর উদাহরণ কম নয়। এদের আমি বলি, রসিকতা নয়, সরস বয়ান। রসিকতা শব্দটির মধ্যে নান্দনিক গুণের অভাব আছে বলে মনে হয়। বার্নার্ড শর প্লেজ প্রেজেন্ট, আনপ্রেজেন্ট শিরোনামগুলোর সরস নাটক, বিরস নাটক, অনুবাদ জুতসই বলে মনে হয়।

রসিকতা বা হাস্যকৌতুকের পাশাপাশি হিউমার ও স্যাটায়ার অদূর সাথী হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। তবে এঁদের গুণগরিমা সাহিত্য অঙ্গনে অপেক্ষাকৃত বেশি ও বিশেষ করে পাশ্চাত্য সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যে এঁদের উদাহরণ বিরল নয়। স্বনামখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান উত্কৃষ্ট উদাহরণ—তাঁর গল্পে এবং ছড়ায়।

রবীন্দ্রোত্তর পর্যায়ে বা কিছুটা সমকালে বাংলা সাহিত্যে হাস্যকৌতুক তথা রসিকতার উপভোগ্য সরস বয়ানের কীর্তিমান দুই নাম পরশুরাম, শিবরাম। অংশত আছেন, আরো আছেন, আরো কেউ কেউ। আর বিদেশগত ‘ননসেন্স রাইমের’ অনন্য ব্যক্তিত্ব তো রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জন সুকুমার রায়। বলা বাহুল্য, রসিকতার সর্বোত্তম আঁকিয়ে মাধ্যম কার্টুন। কার্টুন শিল্পের রসই আলাদা। এককালে ‘সচিত্র ভারত’ শীর্ষক সাপ্তাহিকটি এদিক থেকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। নির্মল, উপভোগ্য রসিকতায় সমৃদ্ধ।

দুই.

সুরসিক, কৌতুকপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানাবিধ পরিচয়ের মধ্যে আলাপচারিতায় অনন্য বা অতুলনীয় রসবোধের পরিচয় রেখেছেন। বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত। রবীন্দ্রনাথের জীবনীকাররা তাঁর জীবন ও কর্মের সিরিয়াস দিক নিয়েই আলোচনা করেছেন বেশি—গুরুত্ব দিয়েছেন ততোধিক। তবে রবিজীবনীকার হিসেবে অসাধারণ প্রশান্ত কুমার পাল তাঁর রবিজীবনীর খণ্ডগুলোতে মাঝেমধ্যে রবীন্দ্রনাথের হাস্যকৌতুকের প্রতিভার কিছু পরিচয় রেখেছেন।

রানী চন্দ থেকে রবীন্দ্রনাথের অতি নিকটজন অনেকের স্মৃতিচারণায় এসব সরস বয়ান ধরা আছে। বাদ যান না মৈত্রেয়ী দেবী। বাংলাদেশে এ বিষয়টি নিয়ে লেখাজোখা অপেক্ষাকৃত কমই হয়েছে। কারণ দুর্বোধ্য নয়। তবু সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি চটি বই প্রকাশিত হয়েছে—নাম ‘রসিক রবীন্দ্রনাথ’, লেখক তাপস রায়।

প্রশান্ত কুমার পালকে দিয়েই শুরু করা যাক। রবীন্দ্রনাথ প্রতিমা দেবীসহ বিলেত যাচ্ছেন। সঙ্গে আগরতলার রাজবাড়ির এক তরুণ সদস্য বিলেতে পড়তে যাবে, তাই রবীন্দ্র পরিবারের সঙ্গী। আগরতলার রাজবাড়ির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সৌহার্দ্যের কথা সবারই জানা। এ উপলক্ষে ট্রেনযাত্রা সরস গল্পে বেশ জমে উঠেছে।

আগরতলার তরুণ সদস্যও প্রতিমা দেবীর সঙ্গে গল্প করে নানাভাবে তৎপর। এরই মধ্যে অঘটন। প্রতিমা দেবীর দামি চুলের কাঁটা পাওয়া যাচ্ছে না, কোথায় পড়ে গেছে—এ নিয়ে রাজপুত্র সোমেশের বিব্রত ভাব, তার কারণেই অবাঞ্ছিত ঘটনাটি হয়তো ঘটে থাকবে। বেচারি সোমেশ কথা বলছে না। পরিবেশ স্বচ্ছন্দ করতে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমা দেবীকে সান্ত্বনার সুরে বললেন, বউ মা দুঃখ করো না, সোমেশ তোমাকে নিষ্কণ্টক করল।

আমার ধারণা, এ গুণটি সহজাত, প্রকাশ স্বতঃস্ফূর্ত। এ ধরনের গুণ সবার থাকে না। রবীন্দ্রনাথের ছিল। এবং তা মজাদার হয়ে ফুটে উঠেছিল যৌবনকাল থেকেই, ক্রমে পরিপক্বতা। আমৃত্যু রবি সরস বয়ানের কবি। অসুস্থ কবি কিছুতেই তাঁর প্রিয় শালবন, পারুলবন ছেড়ে যাবেন না। তবু চারদিকে স্বজন ও বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীর চাপে তাঁকে কলকাতা যেতে হয় পৈতৃক ভবনে।

চিকিৎসা নিতে চাচ্ছেন না অ্যালোপ্যাথি, সার্জারি। খ্যাতিমান সব বিশেষজ্ঞের উপদেশ উপেক্ষা করেন। রোগকে বাড়তে দিতে নেই। চিকিৎসার সাবধানতার মার নেই। কে একজন বললেন পেছন থেকে। শুনে বিষণ্ন কবির গম্ভীর স্বগতোক্তি, ‘মারেরও সাবধান নেই।’

মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথের অতীব প্রিয়জনদের মধ্যে একজন। তাঁর শৈল্য নিবাসে শুয়ে-বসে লঘুগুরু হাস্যকৌতুকে বেশ কিছু সময় কেটেছে রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সে। মৈত্রেয়ী দেবীও উপভোগ করেছেন সেসব রসিকতা, নির্মল ঝরনাধারার মতো সরস সেসব কৌতুক। গৃহকর্ত্রীকে বিব্রত করার জন্য যা যথেষ্ট—কখনো তাঁর চোখে জল। এরপর অবশ্য রহস্যভঞ্জন—কবির মুক্ত হাসিতে সব মেঘ উধাও, আকাশ পরিচ্ছন্ন। কখনো তাঁর সেবাযত্ন নিয়েও গম্ভীর মুখে অভিযোগের অভিনয়সুলভ অভিব্যক্তি। এত চেনা রবীন্দ্রনাথ—তবু মৈত্রেয়ীর সাধ্য কি তা বোঝেন। এই হলেন হাস্যকৌতুক সম্রাট সুরসিক রবীন্দ্রনাথ।

তাপস রায় অবশ্য তাঁর বইয়ে মৈত্রেয়ী-বিষয়ক অন্য ধরনের সরস রসিকতার উদাহরণ দিয়েছেন। মূলত অসুস্থ শরীরে গতানুগতিক সময় কাটাতে বিরক্ত রবীন্দ্রনাথ হাস্যপরিহাসের মাধ্যমে নিজকে ও অন্যদের উত্ফুল্ল রাখতে কৌতুক ও রসিকতা আমদানি করতেন তাঁর সদা-উর্বর মস্তিষ্ক থেকে।

তাপস একটি মজাদার ঘটনা উল্লেখ করেছেন তাঁর বইয়ে। কবি একবার মৈত্রেয়ী দেবীকে একটি পেলিক্যান কলম উপহার দিয়েই ক্ষান্ত হননি। সেই সঙ্গে মজা করে ছোট্ট একটি কাগজে সেই কলম উপহার উপলক্ষে একটি দানপত্রও লিখে দিলেন—

তাঁর দু-চারটে ছত্র উল্লেখযোগ্য, গোটাটাতেই সরস কৌতুক : ‘আমি বিখ্যাত ঠাকুর বংশোদ্ভূত কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ শ্রীমতী মৈত্রেয়ী দেবীকে অদ্য পুণ্য জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা দশমী তিথিতে দিনমানের পূর্বাহ্নে ইংরেজি সাড়ে নয়  ঘটিকায় পেলিক্যান রচিত একটি উৎস-লেখনী স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে দান করিলাম। তিনি ইহা পুত্র-পৌত্রাদিক্রমে ভোগ করিবার অধিকারিণী হইলেন। তিনি যদি ইহার পরিবর্তে তাঁহার কোনো একটি অক্ষুণ্ন লেখনী আমাকে দান করেন আমি অসংকোচে তত্ক্ষণাৎ তাহা গ্রহণ করিতে পারি, ইহা সর্বসমক্ষে স্বীকার করিলাম কদাচ অন্যথা হইবে না। চন্দ্র-সূর্য সাক্ষী।’

একেই বলে সময়ের দীর্ঘ অবসর নিয়ে সময় কাটানোর সরস খেলা। এ খেলায় কী আলাপচারিতায়, কী লেখায় রবীন্দ্রনাথ তুলনারহিত। প্রিয় শিষ্য-শিষ্যাদের সঙ্গে এ ধরনের হালকা কৌতুকে তাঁর কখনো দ্বিধা ছিল না। ক্বচিৎ তা নিয়ম-নীতির সীমা অতিক্রম করে যেত। কৌতুকের পাত্র-পাত্রীরা তাঁকে জানতেন বলে কিছু মনে করতেন না।

রবীন্দ্রনাথের মেয়ে দেখার সরস কাহিনিটি বহুজন কর্তৃক উদ্ধৃত। এর গূঢ় রসিকতাটি হলো—দীর্ঘদিন পর ওই পাত্রী-সাজানো মেয়েটির বিধবা হওয়ার খবর শুনে কবি গম্ভীরমুখে সরসভঙ্গিতে বলেন—‘যাক ভালোই হয়েছে, স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত।’

সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য ইতিহাসখ্যাত রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের অনুসারী। এটা কি জেনেটিক প্রভাব? অথচ এই স্বনামখ্যাত পিতামহকে দুর্বোধ্য কারণে তিনি পছন্দ করতেন বলে মনে হয় না—এমন তথ্যই তাঁর জীবনীকাররা দিয়েছেন। এমনকি বিদেশি জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসন ‘টেগোর : দ্য মিরিয়াড মাইন্ডেড ম্যান’।

কথাটি হলো ‘বাবু চেঞ্জেস হিজ মাইন্ড সো অফেন।’ কোনো না কোনো অজুহাত তৈরি করে, কারো না কারো ওপর দায় চাপিয়ে দিব্যি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি খাড়া করতেন রবীন্দ্রনাথ। তা বিদেশযাত্রা নিয়েই হোক কিংবা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে বসবাসের বায়নায়। ঘটনাগুলো বেশ সরস ভাষায় লিখেছেন রানী চন্দ তাঁর বইয়ে।

‘নিকটজনদের নিয়ে, নাম নিয়ে রসিকতা করে মজা পেতেন রবীন্দ্রনাথ। মৃণালিনী দেবীকে ‘বাঙাল’ বলে খেপাতেন। বাদ যেতেন না সেক্রেটারি ‘সুধা কান্ত বাবুও। এমনকি অতিপ্রিয় রানী চন্দের স্বামী অনিল চন্দ। অথচ এঁরা ছিলেন কবির প্রকৃত স্নেহের পাত্র, বনফুলের তীক্ষ রচনা পড়ে তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘বিছুটি’, তেমনি একজনকে ‘সজারু’।

নিজেকে নিয়েও একই রকম। সেখানে অবশ্য বয়সের ভার ও জীর্ণতা নিয়ে অন্তর্নিহিত বিষণ্নতার ভার। তাই টেবিলে ঝুঁকে পড়ে লিখছেন দেখে বনফুলের প্রশ্নের জবাবে যা বললেন, তার সরস মর্মার্থ হলো, অতিব্যবহারে কুঁজোর জল ফুরিয়ে এসেছে, তাই উপুড় না করলে তা থেকে জল গড়ায় না। অথচ একসময় বলতেন, লেখারা বেরোবার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছে। তাত্ক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত রচনায় অসামান্য স্রষ্টার জন্য এমন মন্তব্য ট্র্যাজিক। আসলে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ওটা কথার কথা। তাই মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও অসামান্য কবিতার প্রকাশ।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষাসংগ্রামী

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা