kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

তুরস্ক ইরান কাতার জোটে ক্ষিপ্ত সৌদি

দারিয়ুস শাহতামাসেবি

৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তুরস্ক ইরান কাতার জোটে ক্ষিপ্ত সৌদি

কাতার, তুরস্ক ও ইরান নতুন সহযোগিতামূলক জোট গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। জোর সম্ভাবনা রয়েছে এই জোট রাশিয়া ও চীনের সমর্থন আদায় করতে পারবে। পুরো বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরব। সিরিয়ার গত আট বছরের লড়াই ওই অঞ্চলের হিসাব পাল্টে দিয়েছে। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও এর সহযোগীরা কখনোই এমন পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারেনি। ফাঁস হয়ে যাওয়া এক নথিতে দেখা যায়, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল আসাদ সরকারকে অস্থিতিশীল করার মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব কমিয়ে আনা (চূড়ান্তভাবে তাদের লক্ষ্য ছিল আসাদ সরকারকে ফেলে দেওয়া)।

তা তো হয়ইনি, উল্টো সিরিয়া-ইসরায়েল সীমান্তে ইরান সমর্থিত বাহিনী ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশটির নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, পুরো পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া। আট বছরের সিরিয়া যুদ্ধ দেখার পর আমরা এখন বুঝতে পেরেছি যে ওই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শক্তি ক্ষয়ের পাশাপাশি তাদের সবচেয়ে শক্তিধর আঞ্চলিক মিত্র সৌদি আরবের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে উঠেছে।

কাতার, ইরান ও তুরস্কের এই জোট সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। এ ব্যাপারে বলির পাঁঠা বানানোর জন্য আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না তারা। কারণ দোষ তাদেরই। এর আগেই সৌদি আরব সুন্নি দেশগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ে তোলে। ইয়েমেনে হামলার পাশাপাশি এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কাতারকে কোণঠাসা করা। ২০১৭ সালের জুন মাসে কাতারকে অসম্মানজনক কিছু শর্ত দেয় সৌদি আরব। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের চাপের মুখে কাতারও নিজের জন্য সহযোগী খুঁজে নেয়। এই সহযোগীরাই এখন জোট গড়ে তুলেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে। এই জোটের পারস্পরিক সমঝোতা অত্যন্ত দৃঢ়। সিরিয়ার লড়াইয়ে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এশিয়া টাইমসের একটি নিবন্ধের শিরোনামে পরিস্থিতির যথাযথ চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া বিপর্যয় যতটা দেখা যায় তার চেয়েও জঘন্য।’

সৌদি আরব যখন কাতারের স্থলসীমান্ত অবরুদ্ধ করে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের বন্দর থেকে দোহায় পণ্যের চালান বন্ধ করে দেয় তখন কাতারকে দুই হাত বাড়িয়ে সহায়তা করে ওমান, তুরস্ক ও ইরান। সে সময় ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার করে কাতারের বিমানগুলো। তুরস্ক সেনা পাঠিয়ে কাতারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। ফলে অবরোধের ছাপ কাতারের দৈনন্দিন জীবনে সেভাবে পড়েনি। তার মানে এই নয় যে কাতারকে কোনো ধরনের সংকটেই পড়তে হয়নি।

২০১৭ সালের শেষ নাগাদ কাতারের সঙ্গে তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি করে, যা এই চারটি দেশের জন্যই লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হয়। ‘কাতার সংকট’ শুরু হওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান-কাতার বাণিজ্য ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা জানান, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের কারণে সৃষ্ট সংকটের সমাধানের পরও ইরানের সঙ্গে কাতারের বাণিজ্য একইভাবে অব্যাহত থাকবে। কাতার, ইরান ও তুরস্ক গত বছর একটি স্থল পরিবহন চুক্তিও সই করে। সৌদি আরবের অবরোধের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তুরস্কে কাতারের বিনিয়োগও কম নয়, দুই হাজার কোটি ডলার। আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, দুটি দেশ পরস্পরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা এই সংখ্যা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

সম্প্রতি মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্ক ও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নস্যাতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে একটি বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত আরব জোটের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে কাতার-তুরস্ক-ইরান জোট; যদিও এরই মধ্যে পাকিস্তানকে নিজের দিকে টানতে পেরেছে সৌদি আরব। জটিলতা এখানেও রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে ইরানের। আর তেহরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। বেইজিংয়ের ওপর ইসলামাবাদের নির্ভরশীলতার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। ফলে এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে দিয়ে ঠিক কতটুকু কাজ উদ্ধার হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বাস্তবতা হচ্ছে কাতার-তুরস্ক-ইরান জোট রাশিয়ার সমর্থন পাবে। ইরানবিরোধী জোটের একটা বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই জোটের সামরিক শক্তি। সবাই জানে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাসের মজুদ রাশিয়া, ইরান ও কাতারে। তা ছাড়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র ইরান ও কাতারেই। এটাও সৌদি ব্লকের একটা বড় উদ্বেগ। সৌদি গণমাধ্যম এরই মধ্যে এই জোটের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে। সম্প্রতি আল-আরাবিয়া এক নিবন্ধে লিখেছে—কী করে ইরান, তুরস্ক ও কাতার জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মার্কিন স্বার্থকে বিঘ্নিত করছে। তাদের আশঙ্কা, কাতার আরব কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইনের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তারা জানায়, কাতারের সঙ্গে ইরানের আঁতাত অতীতে গোপনে থাকলেও এখন তারা প্রকাশ্যেই বের হয়ে এসেছে। কাতার আগুন নিয়ে খেলছে। রাশিয়ার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাতেহন জানায়, ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কাতারের শক্তিকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। অর্থনৈতিক শক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই কাতারের পক্ষে শক্তিমান সৌদি আরবের মোকাবেলা করা কঠিন কিছু না। তবে কাতার জোট ভবিষ্যতে কতটা শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর। নিশ্চিতভাবেই এই জোট ভাঙার চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

 

লেখক : নিউজিল্যান্ডভিত্তিক আইন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূত্র : আরটি অনলাইন

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা