kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

দেশ-জাতি নিয়ে দীর্ঘ সংলাপ

মোস্তফা মামুন

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশ-জাতি নিয়ে দীর্ঘ সংলাপ

জাভেদ ভাইয়ের সঙ্গে একটা লম্বা আড্ডার পরিকল্পনা চলছিল অনেক দিন ধরে। কথা হয় সব সময়ই কিন্তু যাকে বলে একেবারে দীর্ঘ আলোচনা, সেটা আর হয়ে উঠছিল না। গরম, ট্রাফিক, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে এখন এই শহরে একান্ত লেনদেনের ব্যাপার না হলে কেউ আর কারো কাছে যায় না। সেদিন হঠাৎ মনে হলো, দেনা-পাওনা নেই বলেই কি জাভেদ ভাইয়ের কাছে যেতে আমি তাগিদটা কম বোধ করছি! কথাটা মাথায় আসতেই এমন লজ্জা লাগতে শুরু করল যে সোজা গিয়ে হাজির।

জাভেদ ভাই নোনাধরা দেয়ালের ঘরটির বইয়ের স্তূপের মধ্যে যথারীতি নিমজ্জিত। বইয়ের পাহাড়ের মাঝখানে কয়েক হাত ফাঁকা জায়গা কোনোভাবে অক্ষুণ্ন আছে। এতেই তাঁর শরীরটা এঁটে যায় এবং এতেই তাঁর চলে যায়।

জাভেদ ভাইয়ের নিয়ম হচ্ছে চা বানানোর আগে কোনো কথা নয়। চা শুরু হবে। আর শুরু হবে আড্ডা। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শুরুতেই জানতে চাই, ‘হঠাৎ করে কী হলো বলো তো? চারদিকে সব নৈতিক অবক্ষয়ের গল্প।’

‘মাদরাসা-স্কুলের শিক্ষকদের কথা বলছ?’

‘হ্যাঁ। শিক্ষকদের আমরা ধরে নিই সবচেয়ে উঁচু নৈতিকতার মানুষ। বাচ্চাদের তাদের কাছে মনে করি নিরাপদ।’

‘হুঁ। এই ধরে নেওয়াতেই সমস্যা।’

‘মানে কী? শিক্ষকদের কাছে দেওয়ার সময়ও ভাবব নাকি যে বাচ্চার একটা ক্ষতি সে করে বসবে!’

‘না, আমি যেটা বলতে চাইছি, আমরা যে নিরাপদ ভাবি এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ওদের জন্য একটা সুযোগ। ধরো, অন্য কোনো মানুষের ক্ষেত্রে তুমি যে ধরনের নিরাপত্তার কথা ভাবো, শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সেটা ভাববে না। এমনকি শিক্ষকের প্রাথমিক দু-একটা আপত্তিকর আচরণও তুমি ক্ষমা করে দেবে। ওদের মধ্যে যারা দুষ্ট, তারা এই সুযোগটাই নেয়।’

‘কিন্তু একটা সমাজে শিক্ষকরা যদি নৈতিকতার এই স্তরে নেমে যায়, তাহলে আর আশা থাকে কোথায়?’

‘আশা থাকে কি না সেটা অন্য আলোচনা কিন্তু মনে রাখতে হবে শিক্ষকরাও এই সমাজের মানুষ। সমাজ যেখানে পচে যাচ্ছে, সেই পচনশীলতা তাদের গায়েও লাগবে। তা ছাড়া শিক্ষক নিয়োগের সময় নৈতিকতার কোনো আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হয় না; নৈতিক মানসম্পন্ন লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়—এমন ব্যাপারও তো নেই। কাজেই সমাজ যে রকম, সে রকম শিক্ষকই তৈরি হবে।’

মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, ‘কিন্তু সমাজটা এই জায়গায় গেল কেন? চারদিকে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। মানুষের হাতে কাজের কত সুযোগ। আমাদের সময় সুযোগের অভাবে, আর্থিক অনটনে মানুষ নষ্ট হতো। এখন তো আর সে রকম নয় ব্যাপারটা।’

জাভেদ ভাই হাসে, ‘তোমার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। সমাজের অর্থনৈতিক উন্নতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে আসে নৈতিক অবক্ষয়। যখন সমাজ টাকাসর্বস্ব হয়ে পড়ে, তখন সবাই সেই দৌড়ে শামিল হয়ে যায়। টাকা করার এই পাগুলে দৌড়ে আর কেউ ন্যায়-অন্যায় নিয়ে ভাবে না। নৈতিকতার মান নেমে আসে নিচে। ওদিকে অর্থনীতির দৃশ্যমান উন্নতিতে তলায় পড়ে যাওয়া সততা-নীতি সবারই চোখ এড়িয়ে যায়। তারপর একসময় সমাজের চেহারাটা কঙ্কাল হয়ে বের হয়। এখন যেমন আমাদের হচ্ছে।’

‘অর্থনৈতিক উন্নতি হলেই নৈতিকতা নেমে যাবে?’

‘উন্নতি অনেক কিছু থেকে চোখ সরিয়ে রাখে। এই যেমন দেখো, আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে ছাত্ররা সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—এসব পড়ত। কিন্তু এখন বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখবে এসব বিষয়ই নেই। তুমি হয়তো বলবে, এগুলো করে তো চাকরি পাওয়া যাবে না। চাকরি আর টাকার জন্য সবাই পড়ে বিবিএ-এমবিএ। এই যে বিষয়গুলো, দর্শন-সাহিত্য-সমাজবিজ্ঞান এগুলো যারা পড়ত, এরা হয়তো আমাদের অঙ্ক অনুযায়ী খুব আগাতে পারত না; কিন্তু এই এরাই জ্ঞানের কথা, দর্শনের কথা বলে সমাজে ভারসাম্যটা বজায় রাখত। বন্ধুদের আড্ডায়ও হয়তো দু-চারটা নীতির কথা বলত। সাংস্কৃতিক আর শুভবোধের প্রবাহটা থাকত। এখন এসব আর কেউ বলে না। শোনেও না।’

তাই কি? এভাবে তো ভেবে দেখিনি কখনো। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয় নেই। নেই বলে কারো আফসোসও তো বিশেষ নেই।

জাভেদ ভাই বলে, ‘আমাদের সমস্যা হলো, সমাজটা নিয়ে আর কেউ ভাবে না। গবেষণা নেই, পরের প্রজন্মের ভাবনা সম্পর্কে সেই অর্থে অনুসন্ধান নেই। সুযোগ নিয়ে বিকৃত চিন্তার বাণিজ্যমুখীরা তরুণ প্রজন্মের চাহিদা বলে যা-তা সমাজের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তাতে আমরা আরো বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হচ্ছি।’

হতাশার এই প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলি, ‘যা হোক, নুসরাতের হামলার তো বিচার হচ্ছে। এটা এত কিছুর মধ্যে ভালো খবর।’

‘ভালো খবর!’ জাভেদ ভাই হাসে। ‘অদ্ভুত ব্যাপার, একটা দেশ একটা নৃশংস অপরাধ করার কারণে কিছু মানুষের বিচার হচ্ছে, এটাই আমাদের কাছে মনে হচ্ছে ভালো খবর। এটা তো একটা সভ্য সমাজের প্রাথমিক মানদণ্ড—অপরাধীর বিচার হবে। ভাবা যায়, একটা দেশে একটা ব্যক্তিগত পর্যায়ের অপরাধের জন্য পুরো দেশের মানুষকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও নির্দেশনা দিতে হচ্ছে।’

‘তুমি তো আর বাংলাদেশকে এক দিনে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ বানিয়ে ফেলতে পারবে না। এই বিচারগুলো হলে মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে। পরের অপরাধীরা সাবধান হবে।’

‘তা হওয়া উচিত। কিন্তু নুসরাত হত্যার বিচার কবে হবে? স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গেলে ট্রায়াল কোর্টে বছর দুয়েক অন্তত। তারপর হাইকোর্টে আরো বছরখানেক। আপিল-রিভিউ মিলিয়ে আরো বছরখানেক। কম করে হলেও শাস্তি কার্যকর হওয়া বছর পাঁচেকের ব্যাপার। তত দিনে নুসরাত হত্যার নৃশংসতার ঝাঁজটা জনমানসে অনেক কমে আসবে। হয়তো অপরাধীদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে কিন্তু সেই প্রভাবটা সমাজে আর থাকবে না।’

‘এটা আর কী করা? চাইলেই তো আর কাউকে শাস্তি দিয়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া অপরাধীদেরও তো বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।’

‘তুমি কি জানো আমাদের আইনব্যবস্থায় আসলে দুই পক্ষেরই শাস্তি হয়।’

‘আমার তো মনে হয় অভিযোগকারীরই শাস্তি হয়। দীর্ঘদিন মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, থানা-পুলিশ-উকিল।’

‘ওদের তো এক রকম শাস্তি হচ্ছেই। অপরাধী যারা তারাও কিন্তু বিচার হওয়া পর্যন্ত, মানে পাঁচ-সাত বছর জেল খেটে ফেলে। তারপর বিচারে হয়তো দেখা গেল সে নির্দোষ; কিন্তু মাঝখান দিয়ে শাস্তি তো তারও হলো। আবার অভিযোগকারীরাও উকিলকে পয়সা দেওয়া, কোর্টে দৌড়ানোর শাস্তি পেল।’

‘কী করতে হবে তাহলে?’

‘বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। সংস্কার করতে হবে আইনেরও। বেশির ভাগ আইনই শ-দেড় শ বছরের পুরনো। তখন অপরাধের মাত্রা এত বহুমুখী ছিল না বলে অনেক ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট কিছু লেখা নেই। ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে। সে সুযোগ নিয়ে ব্যাপারটা ঝোলানো হয়। দক্ষ আইনজীবীরা সেই সুযোগটা নেনও। ভাবা যায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে কত বছরের জেল সেটা এখনো নির্ধারিত নয়। দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর এ নিয়ে কোর্টে মামলা চলছে। তা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার আছে। যেহেতু অপরাধীরা প্রভাবশালী থাকে এবং তাদের ক্ষেত্রে হারানোর ব্যাপার বেশি বলে ওরা সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপায় মামলায়। যখন অভিযোগকারীর জীবন আছে, অন্য ব্যস্ততা আছে। এখনকার ব্যস্ত জীবনে সাক্ষী দেওয়ার ঝামেলাতেও বিশেষ কেউ যেতে চায় না। ফলে পুরো ব্যবস্থাটাকে সময়োপযোগী করতে হবে। নইলে দুই পক্ষেরই শাস্তি হবে এবং আমাদের মনে হবে আসলে কারো শাস্তি হলো না।’

এসবের বাস্তবায়ন দীর্ঘ, সময়সাপেক্ষ এবং আসলে অসম্ভব। তাই আর খুব আশা দেখি না। মরিয়া হয়ে জানতে চাই, ‘তাহলে তোমার কাছে এসব ঠিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

‘আছে।’

‘আছে!’

‘যদি তুমি-আমি ঠিক হয়ে যাই।’

‘আমরা তো ঠিকই আছি। পারতপক্ষে কোনো ভুল করি না। তুমিও করো না।’

‘নিজে ভুল না করাই নাগরিকের একমাত্র কাজ নয়। সুনাগরিক হলে অন্য কেউ যেন ভুল না করতে পারে সেটার দিকেও মনোযোগ থাকতে হবে।’

‘তাহলে কি আমাদের সবাইকে পুলিশ হতে হবে?’

‘না, প্রতিবাদী হতে হবে। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে চাপ তৈরি করতে হবে।’

ঠিক এই সময় আমার মনে পড়ে আজকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে একজনের কাছে। একটু দেরি হলে আর ওকে পাওয়া যাবে না। উঠে পড়ি।

দেশ-জাতি নিয়ে আমাদের বেশির ভাগ আলোচনা বোধ হয় সেই জায়গায় এসে শেষ হয়, যখন নিজের কিছু করার দায় তৈরি হয়। 

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

মন্তব্য