kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

সহিংসতার বদলে সহিংসতায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না

চারুদাত্তা একানায়েকে

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বেশির ভাগ লঙ্কাবাসীর জন্য এবারের ইস্টার সানডে অন্য সব রবিবারের মতোই শুরু হয়েছিল। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা, যাঁরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ, ইস্টার সকালের প্রার্থনা-সমাবেশে যোগ দিতে গির্জাগুলোতে দলে দলে জড়ো হচ্ছিলেন। স্কুলের শিক্ষার্থীরা তৈরি হচ্ছিল স্কুলে যাওয়ার জন্য—সিংহলি ও তামিল নববর্ষের ছুটির আগে ওই দিনই শেষ ক্লাস হওয়ার কথা ছিল। আর অন্যরা দীর্ঘ সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে শহরগুলোতে ফিরছিল। পর্যটকরা সকাল সকাল দিনের কার্যক্রম শুরু করা যথাযথ মনে করেছেন। সন্ধ্যাকালের বৃষ্টি এড়াতে হলে আগে বেরিয়ে আগে ফেরাই উত্তম।

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে ২১ এপ্রিল যে ভয়ংকরতম একটি কালো দিন হতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে আমাদের তেমন ধারণাই ছিল না। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট থেকে সকাল ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে রাজধানী কলম্বোর কয়েকটি চার্চে এবং বিলাসবহুল হোটেলে কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর আরো খবর আসতে শুরু করল : দ্রুত বিষয়টি স্পষ্ট হলো, লক্ষ্য শুধু একটি শহর নয়। রাজধানী থেকে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে পূর্ব উপকূলীয় শহর বাত্তিকালোয়ায় এবং কলম্বো থেকে উত্তরে ৪০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে পশ্চিম উপকূলের নেগোম্বো শহরে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে।

শ্রীলঙ্কাকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে দেশকে; আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে। উপরন্তু দক্ষিণাঞ্চলে সশস্ত্র মার্ক্সবাদী বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে হয়েছে দেশকে। ফলে কেউ যদি ভাবে, এত রক্তক্ষয় হয়েছে যে দেশে, সে দেশে আবার কোনো হামলার ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে তাকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না। আমরা যারা শান্ত এ দ্বীপে বাস করছি, তাদের কাছে কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যার বিষয়টি অতীত। আমরা অনেকে এ রকমই ভেবেছিলাম।

হামলার পর এ বিষয়ক খবর মানুষকে অবহিত করার জন্য অনেক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কর্মীরা, প্রতিনিধিরা তৎপর হলেন। তাঁদের কেউ কেউ খুব দ্রুত হামলার ঘটনাকে দেশের সহিংস অতীতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দিলেন; খাপছাড়া বা আংশিক রেকর্ডের ভিত্তিতে কাজটি করা হলো। হামলার ঘটনার আরো খবর আসতে থাকল; তাঁরাও ভাষ্য পরিবর্তন করলেন। তাঁরা তাঁদের প্রতিবেদনে এ হামলাকে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত করলেন; বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান মনোমালিন্যের বিষয়টিকে এর সঙ্গে জুড়ে দিলেন। এসব প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হলো; হতাহতের বেশির ভাগের অনুসৃত ধর্মের বিষয়টি তাঁদের চোখ এড়িয়ে গেল।

প্রতীয়মান হয়, রবিবারের ঘটনার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা; তাঁদের মধ্যে তামিল ও সিংহলি উভয় জাতির মানুষই রয়েছেন। গৃহযুদ্ধকালে কোনো সম্প্রদায়ের লোকই রেহাই পাননি; কিন্তু একটি সম্প্রদায়ের ওপর, বিশেষ করে খ্রিস্টানদের ওপর এমন সংঘটিত আক্রমণ হয়েছে বলে শোনা যায়নি। মনে হচ্ছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবেই খ্রিস্টানদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে; সম্ভবত নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার ঘটনার প্রতিশোধ নিতে। শ্রীলঙ্কায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী রয়েছেন, সন্ত্রাসী হুমকির বিষয়ে সতর্কতা কম এবং পর্যটনশিল্প বিকাশমান। মনে হয়, হামলাকারীরা তিনটি বিষয়কেই এক সূত্রে বাঁধতে পেরেছে।

ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, যারা এ ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটায় তাদের কাছে লক্ষিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ভুক্ত কি না সেটা বিবেচ্য নয়। শ্রীলঙ্কায় প্রায় এক দশকে বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। আঞ্চলিক পরিসরে শ্রীলঙ্কা অধিকতর শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটনশিল্পের যে উন্নতি হয়েছে তাতে বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে বিদেশিদের বিশেষ করে পশ্চিমাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক বিষয়। টার্গেট করার সময় এসব বিবেচিত হয়ে থাকতে পারে।

রবিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বলেন, দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারে আঁচ পেয়েছিল; কিন্তু তারা যথাসময়ে তাঁকে বা তাঁর মন্ত্রিসভাকে অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী তাঁর টুইটে ইনটেলিজেন্স মেমোর ফটোকপি দেখিয়েছেন, যাতে দেশি একটি চরমপন্থী মুসলিম গ্রুপের নাম রয়েছে, নাম তাওহিদ ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীও হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে এটির নাম উল্লেখ করেছেন। হামলার ভয়াবহতার মাত্রা ব্যাপক। কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা জড়িতদের দ্রুত আটক করবে এবং বিচারের সম্মুখীন করবে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতিকরা নিউজিল্যান্ডের জাসিন্ডা অরডার্নকে অনুসরণ করতে পারেন; উত্তেজনা, মতভেদ কমানোর স্বার্থে। সম্প্রীতি রক্ষা, উত্তেজনা নিরসন করতে ব্যর্থ হলে বিশ্বজুড়ে মুসলিমবিরোধী যে ভাষ্য প্রচারিত হচ্ছে, তা প্রকট হবে। সহিংসতার বদলে সহিংসতা হলে সহিংসতার চক্রই পুষ্ট হবে।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক

সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন (অনলাইন)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য