kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

শ্রীলঙ্কায় হামলা ও ঐক্যের আশাবাদ

অনলাইন থেকে

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইস্টার সানডের দিন কলম্বো ও এর আশপাশের এলাকার গির্জায় ও হোটেলে যে হামলা হয়েছে তাতে নিহত হয়েছেন প্রায় ৩০০ মানুষ। আহত হয়েছেন আরো কয়েক শ।

খ্রিস্টান ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিনে তিনটি গির্জায় হামলা হয়। একই সঙ্গে আক্রান্ত হয়েছে তিনটি হোটেলও। পুলিশ সন্দেহভাজনকে তাড়া করার সময় আরো দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে বোমা হামলাকারীর উদ্দেশ্য কী ছিল সে সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত করে কোনো মন্তব্য করার সময় আসেনি। উচিতও নয়। ঠিক এই মুহূর্তে এ ধরনের কোনো পূর্বানুমান শুধু বোকামিই নয়; বরং ভয়ংকর। কারণ শ্রীলঙ্কার মতো জাটিল ও সংকট জর্জরিত ইতিহাসসম্পন্ন একটি দেশে ধারণাভিত্তিক পূর্বানুমান সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট, যে বা যারাই এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে তারা সব ধর্মবিশ্বাসী লোকের ওপরই আঘাত হানতে চেয়েছে। শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে রেহাই দেওয়ার ইচ্ছা তাদের ছিল না। তারা আঘাত করতে চেয়েছে শ্রীলঙ্কান ও বিদেশি—সবার ওপর। আরেকটি বিষয়ও খুব স্পষ্ট, তারা সন্ত্রাসের বীজ বপন করে দেশে বিভাজন সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এমনিতেই শ্রীলঙ্কার অতীত নৃশংস সহিংসতায় পূর্ণ। দেশটিতে বহু ধর্ম-বর্ণ-জাত-গোষ্ঠীর লোক বাস করে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বৌদ্ধ। তবে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ধর্মের মানুষও ওই দেশে কম নেই।

তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা এটি। ওই যুদ্ধে বহু বেসামরিক লোক নিহত হয়। এক দশক আগে এই যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এই দ্বীপরাষ্ট্রটি বহুদিন থেকেই স্থায়ী শান্তির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সেই প্রচেষ্টায় এই হামলাকে বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ধারণা ছিল, সব নৃশংসতাকে বহু পিছে ফেলে এসেছে শ্রীলঙ্কা।’ এই বক্তব্য শুধু তাঁরই নয়, বরং শ্রীলঙ্কার সাধারণ সব মানুষই এমন মনে করেন।

এমন একসময় এ ঘটনা ঘটল, যখন রাজনৈতিকভাবেও শ্রীলঙ্কা অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা এবং প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের মধ্যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রনিল বিক্রমাসিংহেকে সরিয়ে দেওয়ার পর আবারও তাঁকে তাঁর পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট। সেই সংকট তাত্ক্ষণিক কেটে গেলেও তার প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি মনে করা হচ্ছিল যে সেই প্রভাবও কাটতে শুরু করেছে। সেই প্রভাব নিঃশেষ হওয়ার আগেই হামলার ঘটনাটি ঘটে গেল। শ্রীলঙ্কায় এ বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য সময় নির্ধারিত রয়েছে আগামী বছর।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে হামলার পর পুরো পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন। গত মাসেই নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলার ঘটনায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা অরডার্নকে সমবেদনা জানিয়ে বার্তা দেন রনিল। ওই ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল। মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে সেই একই পরিস্থিতির মধ্যে গিয়ে পড়ল শ্রীলঙ্কা।

শ্রীলঙ্কার পুলিশ জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে সন্দেহভাজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে। দোষীকে আটক করা এবং বিচারের মুখোমুখি করা আবশ্যকীয় কর্তব্য। তবে বিচার সম্পন্ন করার ব্যাপারে কর্মকর্তাদের মধ্যে একধরনের তাড়া থাকে। ভয়ের বিষয়টি হচ্ছে, সেই কাজটি তাড়াহুড়া করে করতে এবং দেখাতে গিয়ে অনেক সময় অবিচার হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা এমন একটি দেশ, যেখানে দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা অতীতে বহু অন্যায় কাজ করে পার পেয়ে গেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার সব স্তরের রাজনীতিবিদরা ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধির কথা বলছেন। তাঁদের দেওয়া এই অভিন্ন বার্তায় আশাবাদ রয়েছে। বাকি বিশ্বের নেতারাও একই আবেগের কথা বলেছেন। যদিও এ কথা সত্য যে এর মধ্যেও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিভাজনকে উৎসাহিত করতে চান। তার পরও এ কথা বলাই যায়, শ্রীলঙ্কার বিভাজিত জাতিগোষ্ঠী-ধর্মেও মানুষ এবার ঐক্যবদ্ধ হবে বলে প্রবল আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের জন্য রক্ত দিতে মানুষের যে ঢল নেমেছে বা বেঁচে যাওয়াদের সাহায্যে মানুষ যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা আশাজাগানিয়া। 

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য