kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

শুভ জন্মদিন

নতুন চেতনাপ্রবাহের প্রতীক তোয়াব খান

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নতুন চেতনাপ্রবাহের প্রতীক তোয়াব খান

তোয়াব খান এখন আর একটি নাম নয়, সাংবাদিকতায় একটি প্রতিষ্ঠান। পঞ্চাশের দশকে শুধু শিল্পী ও সাহিত্যিক নয়, যে তরুণ সাংবাদিকগোষ্ঠী বাঙালির নব রেনেসাঁর অগ্রদূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তোয়াব খান তাঁদের একজন। তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং আজ তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। এটা আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি বাংলা সাংবাদিকতায় নতুন চেতনাপ্রবাহের প্রতীক।

পঞ্চাশের দশকে সাংবাদিকতা ছিল একেবারেই শিশু সাংবাদিকতা। মাত্র দেশভাগ হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প শিল্প-সাহিত্য-সাংবাদিকতাকে আচ্ছন্ন করে আছে। ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। তার প্রভাব পড়ে দুই বাংলার সাংবাদিকতা জগতেও। সাম্প্রদায়িকতাকে তখন উসকানি দিচ্ছে সরকারদলীয় কিছু সংবাদপত্র। কলকাতার দৈনিক বসুমতী যদি খবর দেয় ‘ঢাকায় পাঁচজন হিন্দুকে খুন করা হয়েছে’, তাহলে ঢাকার দৈনিক আজাদ খবর দেয়, ‘কলকাতার বেহালায় দশজন মুসলমান তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে।’ এভাবেই প্রচারণা ও পাল্টা প্রচারণা দ্বারা দুই বাংলায়ই সাম্প্রদায়িক অশান্তি জিইয়ে রাখা হয়েছে। যার পরিণতি ১৯৫০ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা এবং নেহরু-লিয়াকত চুক্তি। এই সময় কলকাতা থেকে আগত কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক, যেমন—শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন, কে জি মুস্তাফা, খোন্দকার আবু তালেব, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদদীন, সৈয়দ নুরুদ্দীন, খায়রুল কবীর (শেষোক্ত তিনজন ঢাকায়ই ছিলেন) এক বৈঠকে মিলিত হয়ে সাংবাদিকতাকে কিভাবে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করা যায়, তা চিন্তা-ভাবনা করেন। তাঁদের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে বলিয়াদি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক সৈয়দ আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর প্রেস থেকে ‘দৈনিক ইনসাফ’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা বের করেন। এই পত্রিকার নীতি হিসেবে ঘোষিত হয়, ‘পত্রিকাটি সাম্প্রদায়িকতার তীব্র বিরোধিতা করবে এবং তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের গণবিরোধী সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে’। তখন পূর্ব পাকিস্তানে যে দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, পত্রিকাটি তার মুখপত্র হয়ে দাঁড়ায় এবং ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে অধিকারবঞ্চিত করে লিয়াকত আলী সংবিধানের যে খসড়া করেন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে আন্দোলন হয়, যার নাম ছিল বিপিসি (বেসিক প্রিন্সিপাল কমিটি) রিপোর্টবিরোধী আন্দোলন, পত্রিকাটি সেই আন্দোলনেরও মুখপত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তোয়াব খান এই তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিকতার তরুণতম প্রতিনিধি। তিনি এক জাত সাংবাদিক পরিবার থেকে এসেছেন। বাংলা সাংবাদিকতার এক কিংবদন্তি পুরুষ মোহাম্মদী, সেবক, আজাদ, ইংরেজি কমরেড পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আকরম খাঁর পরিবার থেকে এলেও এই পরিবারের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে তাঁর সাংবাদিক জীবনের সূচনা করেন ঢাকায় পঞ্চাশের নতুন সাংবাদিকতার একজন অগ্রদূত হয়ে।

দৈনিক সংবাদ তখন মুসলিম লীগের মালিকানা থেকে মুক্ত হয়ে প্রগতিশীল বামপন্থী আন্দোলনের শক্তিশালী মুখপত্র। জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছাপা হয়। তোয়াব খান এই পত্রিকার বার্তা বিভাগে যোগদান করেন এবং এই পত্রিকারই বার্তা সম্পাদক হয়েছিলেন। দৈনিক সংবাদের ওপর তখন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সব প্রচারণার মুখে বাম ও প্রগতিশীল আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব। তোয়াব খান এই সময়ে সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা এবং তা পরিবেশনে অত্যন্ত মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় এই সময়েই। অত্যন্ত সুদর্শন এবং অমায়িক এই তরুণ সাংবাদিকের সঙ্গে শিগগিরই আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এবং দেখা গেল রাজনৈতিক মতামতের ক্ষেত্রেও আমরা অভিন্ন মত পোষণ করি। কিছুকাল পর আইয়ুবের আমলে সরকারি উদ্যোগে পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই ট্রাস্ট ঢাকা থকে দৈনিক পাকিস্তান নামে একটি বাংলা পত্রিকা বের করে। আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন হন এই পত্রিকার সম্পাদক। মোজাম্মেল হক বার্তা সম্পাদক এবং তোয়াব খান হন যুগ্ম বার্তা সম্পাদক। দৈনিক পাকিস্তান প্রকাশের কিছুকালের মধ্যেই কায়রো বিমান দুর্ঘটনায় মোজাম্মেল হক নিহত হলে তোয়াব খান পূর্ণ বার্তা সম্পাদক হন। দৈনিক পাকিস্তান আধাসরকারি পত্রিকা হলেও দেশের বামপন্থী সাংবাদিক-সাহিত্যিক যেমন—আহসান হাবীব, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ আলী আশরাফ এবং সর্বোপরি তোয়াব খান যোগদান করায় পত্রিকাটির চোহারাই পাল্টে যায়। পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তোয়াব খানের বার্তা সম্পাদনা গুণে পত্রিকাটি সরকারের প্রচারমাধ্যম হয়ে ওঠেনি। সব দল-মতের কাগজ বলে একটা ছাপ পাওয়া যেত। এ সময় সম্ভবত ইয়াহিয়া খানের সরকারের আমলে পার্লামেন্ট না থাকায় রাওয়ালপিন্ডিতে সে বছরের বাজেট অধিবেশন ডাকা হয়। এবং তাতে আমন্ত্রণ জানানো হয় পাকিস্তানের দুই অংশের সাংবাদিকদের। আমি, এনায়েতুল্লাহ খান, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও তোয়াব খান রাওয়ালপিন্ডি (পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী) গিয়েছিলাম। আমি ও তোয়াব খান একাই হোটেলে ছিলাম। সারা রাওয়ালপিন্ডি আমরা ঘুরেছি। ওই বাজেট অধিবেশনে তিনি সরকারি কাগজের সাংবাদিকের মতো কথা বলেননি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক পাকিস্তান দৈনিক বাংলায় রূপান্তরিত হয়। এ সময় আমি দেশে ফিরতেই তোয়াব খান আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘এই ৯ মাসের যুদ্ধের বিবরণ আপনাকে লিখতে হবে’। উল্লেখ করতে ভুলে গেছি তোয়াব খান একজন মুক্তিযোদ্ধাও; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সার্বক্ষণিক কর্মী। তোয়াব খানের চাপেই আমি ‘নিরুদ্দিষ্ট নয় মাস’ দৈনিক বাংলা কাগজে লিখতে শুরু করি। এই সময় তোয়াব খান ছিলেন দৈনিক বাংলার সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডেকে নিয়ে প্রেস সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে অসম্ভব ভালোবাসতেন ও বিশ্বাস করতেন। কোনো কারণে আমাকে দরকার হলে তোয়াব খানের মাধ্যমেই ডেকে পাঠাতেন। তিনি যখন আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যান, তখন আমিও সাংবাদিক-সহযাত্রী হয়ে যাই। আলজেরিয়ায় অবস্থানের সময় তোয়াব খানের সঙ্গে কাটাই। বঙ্গবন্ধুর কাছে কোনো বড় নেতা, যেমন—ইন্দিরা গান্ধী, ফিদেল কাস্ত্রো, আনোয়ার সাদাত, গাদ্দাফি, প্রিন্স সিহানুক প্রমুখ এলেই তোয়াব খান আমাকে ডেকে নিতেন। আমিও এসব বিশ্বনেতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। বঙ্গবন্ধু যখন আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন, তখন আমি ও তোয়াব খান যুক্তভাবে ডিকটেশন নেওয়ার দায়িত্ব পাই। কিন্তু সেই আত্মজীবনী শেষ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে আমি বিদেশে যাওয়ায় সেটি অর্ধসমাপ্ত থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুনভাব তাঁর বাবার আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন। এবং সেটি সারা দেশে আলোড়ন তুলেছে।

তোয়াব খান এখনো তাঁর পেশার ক্ষেত্রে সক্রিয়। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। তিনি আরো দীর্ঘকাল থাকুন—এটা আমাদের কামনা। আমি তাঁর সম্পাদিত কাগজের একজন নিয়মিত কলামিস্ট। ৮৫তম জন্মদিনে তাঁকে আরো একবার শুভেচ্ছা জানাই।

ঢাকা, ২২ মার্চ ২০১৯, সোমবার

 

মন্তব্য