kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

সর্বজন সুবিধার বাজেট ও উন্নয়ন জরুরি

সালেহউদ্দিন আহমেদ

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সর্বজন সুবিধার বাজেট ও উন্নয়ন জরুরি

নতুন অর্থবছরের নতুন বাজেট সমাগতপ্রায়, জুনের আগেই এবার বাজেটটি দেওয়া হবে। এরই মধ্যে সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের নানা মহলে বাজেট নিয়ে বিভিন্ন রকম চিন্তাভাবনা চলছে। ট্যাক্স ইত্যাদি নিয়ে কথা হচ্ছে। ওদিকে ব্যবসায়ীরা বাজেট নিয়ে কথা বলছেন। তাঁদের দাবিদাওয়া ও সুবিধা-অসুবিধার কথা বলছেন। অতএব এখন নতুন অর্থবছরে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে—আগের বছরগুলোতে আমাদের পারফরম্যান্স কেমন ছিল, এবারে কিভাবে আমরা এগিয়ে যাব ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। এসব নিয়ে আমরা আলাপ করতে পারি।

বাজেট সরকারের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু বাজেট সাধারণভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও সার্বিকভাবে এর বাইরেও কতগুলো বিষয় আছে, যেগুলো আপামর জনসাধারণ ও ব্যবসায়ী—সবাইকে স্পর্শ করে। এদিক থেকেও বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমেই দেখতে হবে, আমাদের উদ্দেশ্যগুলো কী। আমরা এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছি এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে পৌঁছেছি। এই দুটিই আমাদের মাইলস্টোন। এটা অর্জন করতে কিন্তু ৪৭ বছর সময় লেগেছে। যদিও আশপাশের অন্য দেশগুলো—ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তারা কিন্তু আমাদের আগেই বেশ এগিয়ে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের লক্ষ্য হবে উন্নয়নের গতি যেন ত্বরান্বিত করতে পারি। কম সময়ের মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে পারি। উন্নয়নশীল দেশ থেকে দ্রুত সময়ে উন্নত দেশে যেতে পারি। সময়টা—আগের মতো কালক্ষেপণ করলে চলবে না। কাজেই আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির গতিটাকে বাড়ানো।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নয়নের ফসলটা যেন আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে। আমাদের অনেক কাজ হয়েছে, উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু দিন দিন আমাদের আয়ের বৈষম্য বাড়ছে। আয় এবং সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এত দিন আমরা সম্পদ ও আয়ের বণ্টনটা ভালো করে নজরে আনিনি। এখন সেই সময়টা এসেছে। আপামর জনসাধারণ যদি উন্নয়নের ফসলটা আপেক্ষিকভাবে বেশি না পায়, হয়তো কিছুটা পাচ্ছে, কিন্তু সম্পদের বিশাল একটা অংশ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে রয়ে গেছে, বাকিরা সবাই অবহেলিত। বণ্টনের দিকটা খেয়াল করলে দেখব, বণ্টনের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। বাইরের দেশেও দরিদ্র মানুষ আছে। কিন্তু তাদেরও একটা লেভেল আছে। আমাদের এখানে সেই জিনিসটা অত্যন্ত নিচু। কাজেই এখন যেটা করতে হবে—অসম উন্নয়নটা বেশিদিন চলতে দেওয়া যাবে না। এটা কোনোভাবেই বাঞ্ছনীয় হবে না। আমাদের এখন মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া প্রয়োজন সমতাভিত্তিক উন্নয়ন। যারা কাজ করবে তারা উন্নয়নের ফসল পাবে এবং সার্বিকভাবে সুফলটা সবাই লাভ করবে। এটা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আরেকটি জরুরি বিষয় হচ্ছে সুশাসন। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য গণতন্ত্রের দিকে সুনজর দিতে হবে। সরকার ও দেশ পরিচালনায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কারণ উন্নয়ন যতই ভালো হোক, দেশ পরিচালনায় যদি মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো না যায়, তার ফল ভালো হয় না। কারণ উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যদি না ঘটে, তাহলে লাভ হবে না। আর এটা একমাত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ই সম্ভব। এটার বাস্তবায়ন হলে কী হবে—দেশে যে বড় প্রকল্পগুলো হবে, সেগুলোর মনিটরিং করা যাবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সম্পদের সুসম বণ্টন ও উন্নয়নের সুফল জনসাধারণের জন্য নিশ্চিত করা যাবে।

এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হলে কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে কিন্তু কর্মসংস্থান সেভাবে হচ্ছে না। আমাদের বিশাল একটা অংশ তরুণসমাজ, তাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম, অপ্রতুল। আমরা তাদের সেভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। এটা উন্নয়নের জন্য একটা বাধা। মানুষের যে মৌলিক আয় সেটা তো তার কর্ম থেকেই আসবে। হতে পারে সেটা ব্যবসা বা চাকরি কিংবা অন্য কোনো কর্ম। আমাদের কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী—শিক্ষিত তরুণের একটা বড় অংশ বেকার। আমরা তাদের কর্মস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি। শিক্ষিত তরুণ তো একধরনের শক্তি, অথচ এই শক্তিকে আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। এই শক্তিকে ব্যবহার করতে পারলে আমরা আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে পারব। এখন যেটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

আমাদের যে দেশি বিনিয়োগ, সেখানে খেয়াল করলে দেখব, একটা স্থবিরতা চলে এসেছে। কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন দেখলাম, বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ নেমে এসেছে ১২ শতাংশে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল যে ১৬ শতাংশ হবে। তার মানে এ খাতে বাংলাদেশ অতটা এগোতে পারছে না। বিনিয়োগের একটি অসুবিধা হচ্ছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নেই। ব্যবসায়ীদের দিক থেকে যে অভিযোগ বা দাবি, তাঁরা পরিবেশ পাচ্ছেন না এবং যথাযথ অর্থের সংস্থান পাচ্ছেন না। ফলে বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। এতে উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া বা সার্বিকভাবে সাফল্য অর্জনও হবে না। সুতরাং এ খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা আগের চেয়ে ভালো। কিন্তু সেসব অপ্রতুল। আবার মানের বিষয়ও আছে। এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভালো রাস্তা নেই। রাস্তা ভেঙে গেছে। রাস্তা নির্মাণের পর বেশিদিন টিকছে না। আবার বিদ্যুৎও প্রচুর উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু বিতরণের দিকে নজর দিলে দেখব বেশ ঘাটতি আছে। প্রায়ই লোডশেডিং হয়, বন্ধ থাকে। এখন গ্রামেও বিদ্যুৎ গেছে। এটা ভালো দিক, কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয় এবং প্রায়শই অনিয়মিত। বিদ্যুৎ খাতে আরো মনোযোগ দিতে হবে।

একটি জরুরি বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। ভারতের তুলনায় আমাদের মাতৃমৃত্যু হার কমেছে। কিন্তু এটা প্রাইমারি হেলথ। তবে দ্বিতীয় ধাপের যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সেখানে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। কারণ গরিব মানুষেরও তো হৃদরোগ হয়, ক্যান্সার হয়, কিডনির সমস্যা হয়। এগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু বাংলাদেশে সাশ্রয়ী চিকিৎসা নেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে। এখন চিকিৎসা সেবার বিশাল অংশ বেসরকারি খাতে চলে গেছে। সেখানে গেলে দেখা যাবে, এমন অর্থ প্রদান করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে শিক্ষার মান কি বেড়েছে? ভালো শিক্ষা নিতে হলে কিন্তু টাকা খরচ করতে হবে। আমরা যখন ছোটবেলায় পড়াশোনা করেছি, তখন কিন্তু ঢাকা ও ঢাকা শহর এবং ঢাকার বাইরের পড়াশোনার একটা মান ছিল—যে মানটা বলা যেতে পারে অনেকটা কাছাকাছি। এখন কিন্তু সেই অবস্থা নেই। এখন বড় বড় শহরে বা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, তারা কিন্তু ভালো শিক্ষাটা গ্রহণ করতে পারছে। শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। কারণ শিক্ষা মানুষের জীবনে সমতা নিয়ে আসে। আমরা বলি, ইকুয়েলাইজার। কোনো মানুষের যদি সম্পদ না থাকে, বিত্ত না থাকে—শিক্ষার ফলে সে কিন্তু ওপরে উঠে যাবে। শিক্ষাটা নিজের সম্পদ। এটা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিপাত করতে হবে।

সবশেষে যে কথাটি বলতে চাই, আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এটা খুবই আশার কথা। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে। আরো উন্নয়ন দরকার। কিন্তু উন্নয়নটা কেন্দ্রীয়ভাবে যেন আটকে না থাকে। ঢাকা শহরে প্রচুর উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু অন্য শহরগুলোতে সেভাবে উন্নয়ন হয়নি। এখন দরকার উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ। প্রশাসনের ক্ষেত্রেও এটা করতে হবে। সারা দেশ থেকে মানুষের ঢাকার দিকে ছুটে আসার প্রবণতা কমাতে হবে। না হলে তো সাধারণ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত থেকে যাবে। এর জন্য উন্নয়নের ধারাটা ছোট-বড় সব শহর ও গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে দিতে হবে। তার মানে ঢাকা শহরের সব সুবিধা ও চাকচিক্য অন্য সব শহর এবং গ্রামে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, ব্যাপারটা তা নয়। যদি দেশের সব জনপদে শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, আইটি সুবিধা এবং কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে সার্বিকভাবে উপকার হবে। মানুষ তখন ঢাকায় আসার জন্য মুখিয়ে থাকবে না। নিজের গণ্ডির ভেতরে যদি কাজ পায়, সেখানেই তারা থাকবে। বৃহৎ পরিসরে কোনো কাজে ঢাকায় আসবে, আবার নিজস্ব বাসভূমে ফিরে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় থাকবে। কিছুসংখ্যক ব্যক্তি নগরায়ণের সুবিধা নিতে শহরগুলোতে বসতি স্থাপন করবে কিন্তু অভিগমনের বর্তমান উচ্চগতি ও হার কমাতে হবে।

বাজেট নিয়ে সরকার ব্যবসায়ী এবং নির্বাচিত মানুষের সঙ্গে বসে আলাপ করে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিন্তু আলাপ করা হয় না। সার্বিকভাবে যদি আপামর জনসাধারণের চাওয়া ও সুবিধাগুলো বিবেচনা করা সম্ভব হয়, তাহলে ভালো হতো। বাজেটের লক্ষ্য ও রাজস্ব, নতুন সম্ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে একটা সার্বিক মতামত ও পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করতে পারলে কার্যকর একটি বাজেট দেওয়া সম্ভব। আর গণতন্ত্র ও উন্নয়ন যেন পাশাপাশি দুটি পায়ের ওপরই ভর দিয়ে চলতে থাকে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর; অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য