kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

সামাজিক অপরাধ দূর করা যাবে যেভাবে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সামাজিক অপরাধ দূর করা যাবে যেভাবে

নুসরাত জাহান রাফি থেকে শারমিন আক্তার লিজা। ফেনীর সোনাগাজীতে রাফিকে কিছু ব্যক্তি কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে আর গাজীপুরে লিজাকে এক বখাটে প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। প্রতিদিনকার পত্রিকার খবর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের সামাজিক অপরাধের ধরন ও মাত্রা কতটা ভয়াবহ। যে দুটি ঘটনার কথা আমরা এখানে বললাম, তাদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়। রাফির ঘটনা দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সারা দেশ জেগে উঠেছে। স্বয়ং রাষ্ট্রের কর্ণধার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন এবং পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা ও বিচারের ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আশা করি, দ্বিতীয় ঘটনাটিও আলোড়ন সৃষ্টি করবে এবং সবাই জেগে উঠবে; কিন্তু যারা এমন সব জঘন্য অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে—জেগে ওঠা তাদের কি কোনো বার্তা দিতে পারছে? এমন সামাজিক অপরাধ ভবিষ্যতে যারা করতে চাইবে তাদের মধ্যে ভয়ের কোনো সঞ্চার তৈরি হবে কি, নাকি প্রতিনিয়ত এমন জঘন্য অপরাধ আমরা অবলোকন করতেই থাকব? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কোনো কিছুই অপরাধীদের লাগাম টেনে রাখতে পারছে না। তাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করছে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ ও খুনের মতো জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটত না। ধরে নিলাম সাগর-রুনি, তনু ও মিতু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, এমনকি হত্যার কূলকিনারা পর্যন্ত আজও উদ্ঘাটিত হয়নি; কিন্তু এ কথাও তো সত্য, কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার আইনে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তাতেও অপরাধীদের অপরাধজগৎ থেকে দূরে রাখা যাচ্ছে না।

অপরাধ নির্মূলে আমাদের মতো দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও বিচার প্রক্রিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা, দীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনুধাবন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মোদ্দা কথা, অপরাধ করলে যে বিচার হয় না কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের কাছে নতুন মনে হতে পারে; কিন্তু আমাদের কাছে নতুন নয়। তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অপরাধের কারণ ও স্বরূপ নির্ণয়ে সহজ হতে পারে; কিন্তু বিচারহীনতার যে সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, তা থেকে উত্তরণ না করতে পারলে ভুক্তভোগী পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আগামী প্রজন্ম কোনোভাবেই রেহাই পাবে না। অধিকন্তু অপরাধের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাও কোনোভাবে সম্ভব হবে না।

ধর্ষণ, খুন, উত্ত্যক্ত, টিজিং ও শ্লীলতাহানির মতো অপরাধমূলক ঘটনার সূত্রপাত এবং হত্যায় পরিসমাপ্তি হওয়ার মধ্যে বেশ সময় থাকে। এ সময়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তার পরিবার প্রথমে আইনের আশ্রয় না নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করে। যারা আইনগত প্রতিষ্ঠানের বাইরে সমঝোতায় যুক্ত থাকে তারা সুযোগ নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাগুলোকে গুরুত্বসহকারে, দায়িত্ব নিয়ে এবং সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে চায় না। সূত্রপাত থেকে যদি কঠোরভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ মোকাবেলা ও সাবধানতা অবলম্বন করা হয়, তাহলে অনেক ঘটনার করুণ পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়ায় না। দ্রুত ও সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কোনো কিছু না লুকিয়ে আইনগত প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

সামাজিক অপরাধের পেছনে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণকে আমরা বরাবরই প্রাধান্য দিয়ে আসছি। কেননা এদের ছাড়া উন্নত সমাজ ও ভালো মানুষ তৈরি করা দুরূহ। কিন্তু যাদের মধ্যে এরই মধ্যে বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে তাদের জন্য সংশোধন দরকার। শাস্তি সংশোধনের একটি বড় ধরন হলেও আমাদের সমাজে চরম শাস্তিহীনতা বিরাজ করায় অনেকে অপরাধমূলক কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। অপরাধ ও শাস্তি দুটি পরিপূরক শব্দ; কিন্তু অপরাধীর কাছে যদি তা মনে না হয়, তাহলে অপরাধের জগৎ থেকে তাদের বের করা মুশকিল। শুধু গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলে চলবে না, বরং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামোর বাইরে যাঁরা সালিস বিচার ও সমঝোতায় যুক্ত থাকেন, তাঁদের ভূমিকা আজ দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁরা যেন অপরাধীদের পক্ষ নিচ্ছেন। রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতি ও অবহেলা। ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য। এভাবে অবহেলা, অবজ্ঞা এবং গুরুত্বহীন মনোভাবের কারণে প্রতিটি ঘটনার পরিণতি মৃত্যুতে গিয়ে শেষ হচ্ছে।

অতীতের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে মানুষ চরমভাবে জেগে উঠেছিল। এখনো উঠছে এবং উঠবে। বিচারহীনতাকে দূর করতে কঠোর হতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকেও কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। সমঝোতায় নিয়োজিত ব্যক্তি ও আইনের লোকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য