kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

আগামী দিনের বিপণনব্যবস্থা ই-কমার্স

অসীম দাশগুপ্ত

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আমাদের জীবনাচরণ এমন এক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার অধীনে চলে এসেছে, যার বাইরে আমাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, ভ্রমণ, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র আজ তথ্য-প্রযুক্তির আশীর্বাদধন্য। এরই হাত ধরে উন্মেষ ঘটেছে ই-কমার্সের। উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর ই-বাণিজ্য বা ই-কমার্স ক্রমেই বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিনিয়ত স্ফীত হচ্ছে এর পরিসর। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার দ্রুততা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার কারণে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।

আমাদের দেশে নগদ টাকায় কেনাবেচার আধিপত্য থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের ডিজিটালব্যবস্থা ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। কাগজের নোট, চেক, ড্রাফট প্রভৃতির ইলেকট্রনিক ভার্সন আইনি স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটে যাচ্ছে।

 ই-বাণিজ্যে ক্রেতা-বিক্রেতা ইন্টারনেট বা ডিজিটাল যেকোনো মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত হয়ে পণ্য বা সেবা বিকিকিনির জন্য চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে এবং পরিশোধপ্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। ইলেকট্রনিক বা ইন্টারনেট মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার কেনাবেচা ও লেনদেন দ্রুততম সময়ে সম্পাদিত হচ্ছে। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সুবিধা ও মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস আসার পর এর বিস্তার সহজ ও দ্রুততর হয়েছে। 

ই-কমার্সের যাত্রা শুরু মাত্র ২৫ বছর আগে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। আমাদের দেশে ই-বাণিজ্যের সূত্রপাত আরো কিছুকাল পরে। এখন এর ব্যাপ্তি বিশাল। আমরা বিলম্বে যাত্রা শুরু করলেও দ্রুতই ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ই-কমার্সের প্রসার ঘটছে। বিগত পাঁচ বছরে বড় উল্লম্ফন ঘটেছে ই-বাণিজ্যে। এখন বার্ষিক লেনদেন এক হাজার কোটি টাকার ওপরে। ব্যবসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পাঁচ বছর পরে বাংলাদেশের ই-বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে আট হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা। আর এরূপ পূর্বাভাস রয়েছে যে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আমাদের দেশে ই-কমার্স শুরু হয় এ শতকের গোড়ার দিকে। তবে ই-কমার্সের মূল অনুষঙ্গ অনলাইন পরিশোধ ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ই-কমার্সের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলারের মাধ্যমে, যার মূল বিষয় ছিল এ রকম : অনলাইনে গ্রাহক কর্তৃক নিজ হিসাব থেকে প্রাপকপক্ষের ব্যাংক হিসাবে ইউটিলিটি বিল এবং ই-কমার্স ব্যবস্থায় ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য ক্রেতার ব্যাংক হিসাব থেকে বিক্রেতার ব্যাংক হিসাবে পরিশোধ বা আদায় করা যাবে বা ক্রেডিট কার্ডে ইন্টারনেটে স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ  করা যাবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় অনলাইন পরিশোধের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৩ সালে। এতে বিদেশ থেকে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার, ই-বুক প্রভৃতি ক্রয়ের জন্য প্রতিবারে ১০০ মার্কিন ডলার করে সাকল্যে এক হাজার ডলার পর্যন্ত পরিশোধের অনুমতি দেওয়া হয়। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ উপার্জনের পথও প্রশস্ত করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউস প্রতিষ্ঠা করে পরিশোধব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করেছে। এ ব্যবস্থায় চেকের ডিজিটাল প্রতিচ্ছবিকে চেক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটি এবং আরটিজিএস ব্যবস্থায় কাগজের চেক বা ড্রাফটের স্থান নেই, আদ্যোপান্ত লেনদেন নিষ্পত্তি হয় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায়। পরিশোধব্যবস্থা সহজ ও দ্রুতগতির হওয়ায় বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠানের তারল্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহজ হয়েছে। এ কারণে পণ্য ও সেবার জোগানদাতারা ক্রমেই ই-কমার্সের প্রতি ঝুঁকছে।  

আমাদের দেশে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং সামগ্রিক পরিশোধ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্মার্ট করেছে। প্রকৃতপক্ষে একটি আধুনিক পরিশোধ ব্যবস্থাই হলো ই-বাণিজ্যের পূর্বশর্ত, যা আমরা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। সরকারের সহায়ক ডিজিটাল নীতি, অর্থনীতির উচ্চ প্রবৃদ্ধি, ইন্টারনেট প্রযুক্তিপ্রিয় তরুণ শ্রেণির অভ্যুদয় ই-বাণিজ্য প্রসারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। 

ব্যস্ত জীবনে মানুষ চায় নির্ঝঞ্ঝাট ও সময়সাশ্রয়ী পণ্য ও সেবা পেতে। ই-কমার্স সে সুবিধা এনে দিয়েছে। অনলাইনে অর্ডার করলে বাসায় চলে আসছে তৈরি খাবার, চাল, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংসসহ যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদা, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, মোবাইল ফোনসেট, বাহারি তৈরি পোশাক, চলে আসছে রাইড শেয়ারিং গাড়ি, মোটরসাইকেল। নেটে বসে বিভিন্ন সাইটে ঘুরে বুকিং দিতে পারছে দেশ-বিদেশের হোটেল রুম, ভ্রমণ প্যাকেজ এবং  বিমান, রেল, বাসের কিংবা সিনেমার টিকিট। আমার দেশ ই-শপ ডটকম নামের একটি ই-কমার্স সাইট অনলাইনে কোরবানির গরু বিক্রি করে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল। মানুষ হাতের কাছে প্রযুক্তি পেয়ে সময়সাশ্রয়ী হতে শিখেছে। যানজটের ভোগান্তি ও বিরক্তি থেকে মানুষ পরিত্রাণের একটা উপায় পেয়েছে।

ই-কমার্সকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন বিপণন ব্যবস্থা বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ই-কমার্স ব্যবসায় বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে আসছে আলি বাবার মতো জায়ান্ট কম্পানিগুলো। আসছে অর্থ প্রেরণ ও পরিশোধের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পে প্যাল।

ই-কমার্স ব্যবস্থা ভোক্তা, ব্যবসায়ী, সরকার সবাইকে সংযুক্ত করেছে। বর্তমান বাজারব্যবস্থাকে ক্রমান্বয়ে ইলেকট্রনিক বাজার ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটাচ্ছে ই-কমার্স। আমরা বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য যেসব সরকারি সেবা গ্রহণ করি, তা-ও চলে আসছে ই-কমার্সের আওতায়। অনেক সরকারি পরিষেবার মূল্য এখন অনলাইনে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং বা কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে।

ই-কমার্সের উদ্যোক্তারা সাধারণত ই-কমার্স সাইট খুলে ব্যবসার সূচনা করেন। আমাদের দেশে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে ই-কমার্স। এ রকম পূর্বাভাস রয়েছে যে পরবর্তী সময় ১০ বছরে এ খাতে যুক্ত হবে ১০ লাখ মানুষ।

আমাদের দেশে জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইটগুলো হচ্ছে দারাজ ডটকম, সহজ ডটকম, চালডাল ডটকম, বাগডুম ডটকম, মুক্তবাজার ডটকম, এখানেই ডটকম প্রভৃতি। এর মধ্যে মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে সবচেয়ে বড় দারাজ ডটকম। এদের মার্কেট শেয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ। 

আমাদের ই-কমার্সের বড় দুর্বলতার দিক হলো ভোক্তাদের ৬০ শতাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক, তার অর্থ হলো এখনো সারা দেশে ই-কমার্সের উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেনি এবং ঢাকার বাইরে মানুষজন এখনো ই- কমার্সের জন্য তেমনভাবে প্রস্তুত নয়। তা ছাড়া ই-কমার্সে যেখানে অনলাইন পেমেন্ট মূলকথা, সেখানে ৯০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ হয় পণ্য ডেলিভারির পর, যার বেশির ভাগ আবার নগদে। ই-কমার্সে ভোক্তার প্রত্যাশা হচ্ছে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্যের সময়মতো সরবরাহের নিশ্চয়তা। কিন্তু তা সব ক্ষেত্রে ঘটছে না, ভোক্তা প্রতারিত হচ্ছে। এ কারণে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়, যা ই-কমার্স প্রসারের অন্তরায়। বাজারে টিকে থাকতে হলে ভোক্তার বিশ্বাস ও আস্থার বিকল্প নেই।   

আমাদের পরিশোধব্যবস্থা এখন বিশ্বমানের। ইএফটিএন, আরটিজিএস, এনপিএস, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ক্রমবর্ধমান কার্ডভিত্তিক লেনদেন আমাদের পরিশোধব্যবস্থাকে ই-কমার্সবান্ধব করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ ব্যাংক ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারে উদার দৃষ্টিভঙ্গি, শৌখিনতা এবং বিশ্বায়ন আমাদের ই-বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করে রেখেছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন ও কুরিয়ার কম্পানিগুলোর ত্বরিত ও উন্নত সেবা ভোক্তাদের ই-কমার্সের মাধ্যমে কেনাকাটায় উৎসাহিত করে। সেদিন হয়তো খুব দূরে নয়, যখন ই-বাণিজ্যই হবে বাণিজ্যের মূলধারা, লেনদেন হবে অনলাইনে ইলেকট্রনিক মুদ্রায়। কালস্রোতে হারিয়ে যাবে নগদ লেনদেন। কড়ির মতো কাগজের মুদ্রার স্থান হবে জাদুঘরে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হিসেবে। 

লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

 

মন্তব্য