kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

চিন্তাশক্তির বিকাশই হোক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চিন্তাশক্তির বিকাশই হোক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

শিক্ষা মানুষকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের ভেতরের চিন্তাশক্তিকে বের করে আনতে না পারি, তবে সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা দর্শন বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ‘শিশুকাল হইতেই কেবল স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া সঙ্গে সঙ্গে যথাপরিমাণে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে। ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই-চার পাত কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তারপর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়। শিশুদের জ্ঞানশিক্ষাকে বিশ্বপ্রকৃতির উদার রমণীয় অবকাশের মধ্য দিয়া উন্মেষিত করিয়া তোলাই বিধাতার অভিপ্রায় ছিল। সেই অভিপ্রায় যে পরিমাণে ব্যর্থ করিতেছি সেই পরিমাণেই ব্যর্থ হইতেছি।’ এই শিক্ষা দর্শন থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে শিক্ষাকে এমনভাবে সাজানো দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে নিজের ভেতরের সুপ্ত মেধাশক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারে।

অনেকেই ভাবেন, শিক্ষা থাকলে পরীক্ষা থাকতে হবে। পরীক্ষা ছাড়া যেন মেধার মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বিষয়টি লজিক্যাল ও যুক্তিপূর্ণ নয়। কারণ পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার মূল্যায়ন, কল্পনাশক্তি সৃষ্টি ও চিন্তাশক্তির বিকাশ সম্ভব নয়। সারা বছর কোনো একটি বিষয় পড়ে এক দিনের তিন ঘণ্টার একটি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করা যাবে এটি অবাস্তব। এ ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির সৃষ্টির জায়গাটিতে চাপ সৃষ্টি করে বরং তা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। যেখানে মেধার মূল্যায়ন পরীক্ষায় কে কত বেশি মার্কস পেল এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়, সেখানে নতুন চিন্তাশক্তি সৃষ্টির পরিবর্তে না বুঝে বিষয়টি মুখস্থ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা শিক্ষার্থীর মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে তার শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এখানে একজন শিক্ষার্থী অন্য আরেকজন শিক্ষার্থীকে বন্ধু না ভেবে তার প্রতিযোগী হিসেবে ভাবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে  বিষয়গুলো শেয়ার করার পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে যার প্রভাব আমাদের সামাজিক, মানবিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরূপভাবে পড়ে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা বলছেন। এই পরিবর্তনের প্রধান দিকটি হচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এই তিন শ্রেণিতে কোনো ধরনের পরীক্ষা থাকছে না।

শিশুর ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমাতে ফিনল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের আদলে শিক্ষাব্যবস্থা সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ১৩ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুকে পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ না দিতে অভিভাবক, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি এটুকুই বলব, কোনোমতেই যেন কোমলমতি শিশুকে কোনো অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া হয়। তাহলেই দেখবেন তারা ভেতরে একটা আলাদা শক্তি পাবে। আর তাদের শিক্ষার ভিতটা শক্তভাবে তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী শিশুর পাঠদান সম্পর্কে নিজস্ব অভিব্যক্তি সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে গিয়ে আরো বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই সাত বছরের আগে শিশুকে স্কুলে পাঠায় না। আমাদের দেশে অনেক ছোটবেলা থেকেই বাচ্চারা স্কুলে যায়। কিন্তু তারা যেন হাসতে, খেলতে, মজা করতে করতে পড়াশোনাটাকে নিজের মতো করে করতে পারে, সে ব্যবস্থাটাই করা উচিত। সেখানে অনবরত ‘পড়ো’, ‘পড়ো’, ‘পড়ো’ বলাটা বা ধমক দেওয়াটা বা আরো বেশি চাপ দিলে শিক্ষার ওপর তাদের আগ্রহ কমে যাবে, একটি ভীতির সৃষ্টি হবে। শিক্ষার প্রতি সেই ভীতিটা যেন সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমি আমাদের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের অনুরোধ করব।

এখন মূল বিষয় দাঁড়াচ্ছে, পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে কোন ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হবে। শিক্ষা নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাঁরা বিভিন্ন ধরনের মেধাশক্তি যাচাইয়ের মডেল দিয়েছেন। মারিয়া মন্তেসেরি তাঁর শিক্ষাপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে বলেন, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের কোনো শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না, আনুষ্ঠানিক কোনো পরীক্ষা থাকবে না, কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না। স্কুলের পরিবেশ খোলামেলা হবে এবং স্কুলকে শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়ি বলে মনে করবে। শিক্ষাকে আনন্দের অনুসর্গ হিসেবে প্রকাশ করতে তিনি কাঠের তৈরি বর্ণমালা তৈরি করেন, যার আকার-আকৃতি শিক্ষার্থীরা স্পর্শ করে সেগুলো নিয়ে বিভিন্নভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করবে। স্টেইনার তাঁর শিক্ষাপদ্ধতিকে আধ্যাত্মিক জগতের উন্মোচন বলে মনে করতেন। তিনি শরীর, মন ও আত্মার বিকাশের মাধ্যমে শিশুদের চিন্তাশক্তিকে বের করে আনার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শিশুরা নিজের ভাষায় জ্ঞানার্জন করবে এবং শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য তাদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নিজেদের মনের বিকাশ ঘটাবে। হার্কনেসের শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনো কারিকুলাম নেই। এ পদ্ধতিতে ক্লাসের মাঝখানে একটি গোলটেবিল রাখা থাকে। সেই গোলটেবিলের চারপাশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে বসে খোলামেলাভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে। আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে। ফ্রয়েবেল তাঁর শিক্ষাপদ্ধতিতে শিশুর স্বাধীনভাবে ভাবার ও আগ্রহের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ, সংগীতের মাধ্যমে মনের বিকাশ, নাচের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে চিন্তাশক্তির প্রকাশ ঘটানোই ছিল এই শিক্ষাপদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। রিগিও এমিলা তাঁর শিক্ষাপদ্ধতিতে পিতা-মাতার ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। এই পদ্ধতিতে স্কুলগুলো বাড়ির মতো করে ডিজাইন করা হতো। কোনো কারিকুলাম বা লেসনপ্ল্যান এই পদ্ধতিতে নেই। শিশুদের বিভিন্ন ছবি সরবরাহ করে সেখান থেকে শিশুরা নিজেরা কী মনে করে—এ বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। শিশুদেরও বিভিন্ন বিষয়ে আঁকতে হতো। শিক্ষকরা এ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু ধারাবাহিক মেধাশক্তির মূল্যায়ন করতেন।

বাংলাদেশেও পরীক্ষাবিহীন শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। ইবাদ আলী তাঁর গবেষণার মাধ্যমে শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষাপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষাপদ্ধতি হবে মৌলিক ও গবেষণাধর্মী। বিজ্ঞান এ শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুদের মধ্যে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। তাঁর মতে, শিশুরা প্রধানত তিনটি বিষয়কে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং প্রথমে তারা যে বিষয়টি দেখে বা শেখে সেটিকে তার চিন্তাশক্তি বিকাশের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। এই তিনটি বিষয় হলো—বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যা বলেন শিশুরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, শিশুদের পাঠ্য বইয়ে যা লেখা থাকে সেটি তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, টেলিভিশনের মাধ্যমে যা দেখে, বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের কার্টুন সেগুলোর অনুকরণ তারা করতে চায়। শিশুশিক্ষা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ তিনটি বিষয়কে মূল্যায়ন করে তিনি শিক্ষার কিছু মৌলিক বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ জীবনের প্রথম পর্যায়ে বস্তুর নাম শেখে, বর্ণের নাম নয়।

প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিছু সফটওয়্যার আছে, আর এগুলো বাহ্যিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়। ক্লাসের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি কয়েকটি উপাদানের কথা বলেছেন। যেমন—শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার, সময়ানুবর্তিতা, আচরণ ও মানবিক ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ও এর চর্চা, কোনো কিছু বোঝার মানসিক ক্ষমতা ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক কাজ। এ ছাড়া পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে আরো অনেক শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। এ ধরনের গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষামুক্ত রাখতে হবে। মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশের ভিত্তি হিসেবে মানসিক শক্তির বিকাশকে প্রাধান্য দিতে হবে; তবেই শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করবে, দেশকে আলোকিত করবে।

লেখক: অধ্যাপক,  ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

মন্তব্য