kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক যুদ্ধ এবং বাস্তবতা

ফরিদুল আলম

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক যুদ্ধ এবং বাস্তবতা

একটি ঐতিহাসিক চুক্তির অপেক্ষায় গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মধ্যকার চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের লাগাম টেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলোর মেধাসম্পদ চুরির পাশাপাশি চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধ্য করছে। এই যুক্তিতে এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যের ওপর বর্তমান ১০ শতাংশ হারের শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। জবাবে চীনও ১১০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে বুয়েনস এইরেসে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি চিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে পরবর্তী তিন মাসের জন্য এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে তাঁরা একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এর আগে দুই দেশের পক্ষ থেকেই একে অপরকে দোষারোপ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন তাদের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন আনুক এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি পণ্য আমদানি করে দুই দেশের মধ্যকার ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনুক। এর জবাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে বলেছে যে তারা তাদের বাণিজ্যের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে। তবে চীনের নীতিনির্ধারকরা মুখে যা-ই বলুন না কেন, যদি তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো টেকসই বাণিজ্যচুক্তি করতে ব্যর্থ হন তবে তাঁদের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য যে দুই নেতার বেঁধে দেওয়া তিন মাস সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে উপনীত হতে পারেনি দুই দেশ। তবে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে দুই দেশের তরফে জানানো হয়েছে যে তারা দুই পক্ষই চুক্তি সম্পন্ন করার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছে এবং পরবর্তী চার সপ্তাহের মধ্যে এই চুক্তি করা সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে কিছুটা মতানৈক্য থেকে গেলেও তাঁরা চুক্তি থেকে খুব বেশি দূরে নন এবং সব প্রস্তুতি শেষে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য চীনের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে তিনি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের মধ্য দিয়ে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। তিনি বলেছেন, ‘এই চুক্তি সম্পন্ন হলে তা হবে মহাকাব্যিক ও ঐতিহাসিক।’ এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে যদি দুই দেশ তাদের একে অপরের পণ্যের ওপর শুল্ক প্রস্তাব বজায় রাখে, তবে এ বছর প্রত্যাশিত ৩.২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ০.৮ শতাংশ হুমকির মধ্যে পড়বে।

এই বাণিজ্য যুদ্ধ শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দুই দেশেরই তাগিদ রয়েছে। সম্প্রতি চীন তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যায় ১৯৯০ সালের পর দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস জানিয়েছে, এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০১৮ সালে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬.৬ শতাংশ, যদিও এটা তাদের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি, কিন্তু ২০১৭ সালে তা ছিল ৬.৮ শতাংশ, যা থেকে বোঝা যায় এই বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব ভালোভাবেই তাদের অর্থনীতিতে পড়েছে। এক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উত্তাপের কারণে বিনিয়োগকারীরাও আস্থার সংকটে ভুগছে। এরই মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী চীন থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে অন্যত্র চলে গেছে। অন্য বিনিয়োগকারীরাও অন্যত্র ব্যবসা খোঁজার প্রতি মনোযোগী হয়েছে। এদিকে বিশ্বের বৃহৎ টেলিকম নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন নির্মাতা হুয়াওয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের পশ্চিমা মিত্ররা এই মর্মে সন্দেহ পোষণ করছে যে কম্পানিটি তাদের ব্যবসার আড়ালে অন্যদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়ের পণ্য বর্জন করেছে এবং তার মিত্র দেশগুলোকেও বর্জন করার পরামর্শ দিচ্ছে। এটি হলে অর্থনীতিতে ক্ষতি আরো বাড়বে। কারণ হুয়াওয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার চাপ রয়েছে এই কারণে যে চীনসহ সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলছেন যে তাঁর প্রশাসনের সময়ে তাঁদের অর্থনীতি খারাপ হচ্ছে, তাঁরা বিদেশে ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। এর বাইরে সাধারণ মার্কিনরা মনে করছেন ট্রাম্প কড়া বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করলেও এই নীতির বলি হবে সাধারণ মানুষ। বেশি কর ধার্যের ফলে অতিরিক্ত মূল্যে তাদের অনেকেই চীনা পণ্য কিনতেই বাধ্য হবেন। কারণ কম মূল্যে এর বিকল্প মার্কিন পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পারবেন না ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যদি চীনের সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অর্থবহ চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়, তবে সে ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্য ক্ষতি হলেও তুলনামূলক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পাল্লা ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য যে চীনের বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলোর। এ ক্ষেত্রে চীন যদি তাদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতর নতুন কোনো আইন করে এসব বিদেশি কম্পানির খরচ বাড়িয়ে দেয়, তবে তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী চীন যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমায়, তবে এখানে তাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা অন্যান্য দেশ বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং অতিরিক্ত মার্কিন পণ্য আমদানির ফলে তাদের জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে তারা এটা বিবেচনায় নিতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক প্রস্তাবনা শুধু চীনের সঙ্গে নয়—কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেক্সিকোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অবনতি করতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে এ দেশগুলোকে নিয়ে নতুন বাণিজ্য জোট করার একটি সম্ভাবনা চীনের সামনে রয়েছে। সুতরাং চীনের কাছে এটাই শ্রেয় হতে পারে যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিকল্প বাণিজ্য জোটে নিজের নেতৃত্ব কায়েম করা। যুক্তরাষ্ট্র যেমন অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে ট্রান্স প্যাসিফিক জোটের কথা ভাবছে, দুই দেশের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীন হয়তো এর নেতৃত্বে চলে আসতে পারে। এরই মধ্যে গত এক বছরে চীন তাদের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্য হ্রাস করেছে। যার ফলে তাদের রপ্তানি পণ্যের দাম কমেছে এবং আমদানিকারকদের চীনা পণ্য কম মূল্যে আমদানি করার সুবিধা করে দিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই চীনের সঙ্গে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে, এর ফলে দুই দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় কোনো কোনো দেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে যে কিছু বিনিয়োগকারী যেমন চীন থেকে তাদের ব্যবসা প্রত্যাহার করেছে, তেমনি নতুন বিনিয়োগকারীরা চীনকে বাদ দিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ দেশে তাদের ব্যবসা স্থাপনের বিষয়ে মনোযোগী হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে উজ্জ্বল সম্ভাবনার দাবিদার। এরই মধ্যে সরকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক শিল্পনগরী স্থাপন করেছে, যার আকার দাঁড়াবে ৩০ হাজার একর। সেখানে জমি বরাদ্দের জন্য ২০১৭ সালে আবেদন আহ্বান করলে আশাতীত সাড়াও পাওয়া যায়। এরই মধ্যে ৫৬টি কম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যারা এক হাজার ২০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে। এদের মধ্যে ঝুঝাউ জিনইউয়ান নামের একটি চীনা কেমিক্যাল কম্পানি দুই কোটি ৮০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছে এবং আগামী জুন মাস থেকে উৎপাদনে যাবে বলে তারা জানিয়েছে। তাদের এ দেশে বিনিয়োগের মূল কারণ চীনা কেমিক্যালের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ। শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ এবং রপ্তানিমুখী এমন কম্পানিগুলোর বাণিজ্য যুদ্ধের স্রোতে বাংলাদেশের মতো দেশে আগমন বিশ্ব অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণেও ভূমিকা রাখবে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected] 

মন্তব্য