kalerkantho

ইসরায়েল কি আর ‘গণতন্ত্রী’ আখ্যা পাবে

রবার্ট ফিস্ক

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসরায়েল কি আর ‘গণতন্ত্রী’ আখ্যা পাবে

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েল আরো বেশি দক্ষিণপন্থী হয়ে উঠবে—এমন চিন্তার অবকাশ নেই। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল চরম দক্ষিণপন্থী। বরং বলা যায়, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ—এ কথা বলে যে প্রচার-প্রচারণা এত দিন ধরে চালানো হচ্ছে তার অবসান হবে, এ ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।

আমার মনে হয়, ইসরায়েল এখন অনেকটাই তার আরব প্রতিবেশীদের মতো হয়ে উঠেছে; নিজ ভূখণ্ডে আরব সংখ্যালঘুদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। জেরুজালেমসহ ইসরায়েলের দখল করা ভূমির পরিমাণ পাঁচ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার, যা কুয়েতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নব্বইয়ের দশকে এই কুয়েত দখলের কারণে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম আমরা।

ইসরায়েলের চেহারাও প্রায় তেমনই হয়ে উঠেছে, যেন মধ্যপ্রাচ্যেরই আরেকটি দেশ। তারাও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর বোমা ফেলে, হুমকি দেয়। তুচ্ছ কারণে (ফিলিস্তিনি) রাজনীতিকদের কারারুদ্ধ করে তারা এবং খুুনি পুলিশ স্কোয়াড দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন চালায়। ২০ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর ছড়ি ঘোরায় তারা। অথচ দাবি করে, ফিলিস্তিনিদের ঘর-জমি দখল করেনি তারা। অন্যান্য আরব দেশের আচরণও প্রায় একই। রিয়াদ, দামেস্ক, কায়রো, বাগদাদ (সাদ্দামের আমলে) যেখানেই যাবেন, একই কথা শুনবেন।

ইসরায়েলিরা নেতানিয়াহু ও তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণাধীন জোটকে আবারও ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাঁর মাথার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত রয়েছে। নেতানিয়াহুর জয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় তা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী ইসরায়েলের সমালোচকদের এখন আর পাত্তা নেই। তবে ইসরায়েলে এখনো নেতানিয়াহুর নীতির সমালোচনাকারী কিছু লোক রয়েছে। হারেৎস পত্রিকার লেখক গিদিয়ন লেভি তেমনই একজন। পশ্চিমা সাংবাদিকরাও যে সত্য বলার সাহস দেখান না, তিনি তা দেখিয়েছেন।

লেভির মতে, নির্বাচনের পর নতুন অধঃপতিত ইসরায়েল প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। এই ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ তার পেছনের আঙিনায় (কর্তৃত্বাধীন আরব ভূমি ও অধিকৃত অঞ্চল) যা কিছু ঘটাবে প্রকাশ্যেই ঘটাবে, আর রাখঢাক করবে না। তার মূল চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবার। ‘প্রথম প্রজাতন্ত্র’ (চলমান ব্যবস্থা) বাস্তবতার সঙ্গে প্রতারণার সংমিশ্রণজাত নীতির ভিত্তিতে চলেছে—এটাই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্রের স্বভাব। এই গণতন্ত্রের রূপ দ্বিবিধ—এক. আরব অধ্যুষিত এলাকায় সামরিক সরকার আর দুই. অধিকৃত এলাকায় সামরিক একনায়কতন্ত্র। এখন দ্বিবিধ চরিত্রের প্রয়োজন আর থাকবে না।

লেভি বলেছেন, ইসরায়েল নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের সহায়ক শক্তি দাবি করে। বাস্তবতা হচ্ছে, সে-ই বিশ্বের সর্বশেষ ঔপনিবেশিক শক্তি। নিজেকে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র দাবি করে ইসরায়েল অথচ প্রায় সব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে সে। দেশের আইন ও সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বড় অহংকার তার। তবে সে সময় ফুরিয়েছে। তার শাসন আরো কঠোর হয়েছে; সে আরো জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী হয়েছে। একই সঙ্গে শিথিল হয়েছে গণতন্ত্র আর শাসনব্যবস্থা। গত ৯ এপ্রিলের ভোটে এই ইসরায়েলকেই ‘হ্যাঁ’ বলেছে ভোটাররা। ফলে সরকারের তৎপরতা আরো জোরালো হবে, বিস্তৃত হবে। শিগগির এর আঁচ পাবে গণমাধ্যম, মানবাধিকার গোষ্ঠী ও আরব সম্প্রদায়।

লেভির মন্তব্য, হারেৎস কিছু উপসম্পাদকীয় আগামী দিনে আর ছাপার অনুমতি পাবে না। কিছু বিষয়ে সমালোচনা আইন করে বন্ধ করা হবে, যেমন ইসরায়েলি সেনাদের সমালোচনা। অলাভজনক সংস্থাগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে। আরবদের সংখ্যা আরো কমানো হবে। পার্লামেন্ট হবে শুধু ইহুদিদের জন্য।

প্রতিবেশী আরব দেশগুলো হয়তো ইসরায়েলের এমন আচরণে অখুশি হবে না। কারণ কাউকে নিজের মতো হয়ে উঠতে দেখলে ভালোই লাগে। নেতানিয়াহু নৃশংস, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত একজন নেতা। কিন্তু তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গানজ ইসরায়েলি আরবদের ওপর কম নির্যাতন চালাননি। সম্ভবত তার খেসারত তিনি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে। নির্বাচনী প্রচারের সময় গানজ ইহুদি ভোটারদের সমর্থন পেতে গাজায় হামলার ভিডিও প্রদর্শন করেন। কোনো আরব দেশের নেতা এ কাজ করলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হতো। তবে ইসরায়েলে তা সম্ভব; কোনো আরব দেশও এ নিয়ে আপত্তি তোলেনি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ইয়েমেনে একটি আরব দেশের বোমাবর্ষণ মেনে নেয়, তাহলে গাজায় ইসরায়েলের হামলাকেও মেনে নেবে। যারা মানবাধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের জেলে পোরে, যারা সাংবাদিক হত্যা করে তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা গেলে ইসরায়েলের সঙ্গেও লেনদেন করা যাবে। কাজেই আর কোনো আড়াল নয়; নয় কোনো বিশেষ প্রতিশ্রুতি। আমরা আমাদের অবস্থান জানি। ইসরায়েলও তার অবস্থান সম্পর্কে জানে।

 

লেখক : দি ইনডিপেনডেন্টের

মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

সূত্র : দি ইনডিপেনডেন্ট (ইউকে)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য