kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

প্রশ্নের সম্মুখীন ভারতের গণতন্ত্র!

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রশ্নের সম্মুখীন ভারতের গণতন্ত্র!

ভারতে গণতন্ত্র ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার নায়ক যদি হন জওয়াহেরলাল নেহরু, তা বাস্তবায়িত করেছিলেন এক ঢাকার বাঙালি। নাম সুকুমার সেন। ১৯৫০ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর ১৯৫২ সালে সারা দেশে যে নির্বাচন হয়, তার দায়িত্বে ছিলেন ঢাকার সুকুমার সেন, প্রথম নির্বাচন কমিশনার। মাঝে বিগত ৬-৭-এর দশকে আরেক বাঙালি বরিশালের শ্যামাপ্রসন্ন সেন। আর বর্তমানে যিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার তিনি সুনীল অরোরা। মোদির ঘনিষ্ঠ বলেই দিল্লির রাজনৈতিক মহলে সবাই জানেন। মোদি তাঁর দেশব্যাপী নির্বাচনী ভাষণে বলছেন, ‘যাঁরা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাঁরা পুলওয়ামাকাণ্ডের শহীদ এবং বালাকোট সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের জোয়ানদের নামে শপথ নিন ও আমাদের ভোট দিন। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারে তিনি সামরিক বাহিনীর নাম ব্যবহার করছেন, যা সংবিধানবিরোধী ও নির্বাচনী আইনবিরোধী। বিজেপিবিরোধী কংগ্রেসসহ সব নির্বাচনী দল নির্বাচন কমিশনের কাছে নালিশ জানিয়েছে। প্রতিদিন নালিশের পাহাড় জমছে নির্বাচন কমিশনের অফিসে। কিন্তু মোদি অমিতশাহ ও রাজনাথ শিংরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সব জনসভায় সামরিক বাহিনীকে টেনে আনছেন। বিরোধীদের অভিযোগের বিষয়ে সুনীল অরোরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, বিজেপি সামরিক বাহিনীকে ততই বেশি করে কাজে লাগাচ্ছে। এটা যে বিজেপি করবে তা অটল বিহারির রাজত্বের সময় এক অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক কথাচ্ছলে আমাকে বলেছিলেন, আমরা অর্থাৎ বিজেপি ও আরএসএস যদি ক্ষমতায় আসি তবে আমাদের হাতিয়ার হবে সামরিক বাহিনী। আগামী ৫০ বছর কোনো দলকে ক্ষমতায় আসতে দেব না। সেদিন তাঁর কথায় বিশ্বাস করিনি। এখন দেখছি তিনি যা বলেছিলেন সেটাই অক্ষরে অক্ষরে সত্য, আর এটাই ছিল বিজেপি ও আরএসএসের কর্মসূচি। ওই ভদ্রলোকের নাম অশোক রায়। অশোক রায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় ভারতের উপরাষ্ট্রদূত ছিলেন। সেই সুবাদে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা এখনো তাঁর নাম জানেন। তাঁর জামাই আরএসএসের তাত্ত্বিক নেতা। স্বপন দাশগুপ্ত আরএসএসের কোটায় রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য। আর অশোক রায়ের স্ত্রী কাজ করতেন দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে। সুতরাং তাঁদের পারিবারিক বিবাদ ঘটেছিল কি না জানা যায়নি, আর কখনো জানার চেষ্টাও করিনি।

ওই ইতিহাসটা এ জন্যই দিতে হচ্ছে যে সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি আরএসএস সব জনসভায়ই সামরিক বাহিনীকে টেনে আনছে। সামরিক বাহিনীকে টেনে আনা মানে দেশের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করা—এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অবরসপ্রাপ্ত তিন বাহিনীর ১৫৬ জন জল, স্থল ও অন্তরীক্ষ বাহিনীর অফিসার। বৃহস্পতিবার রাতে এই ১৫৬ জন একটি স্মারকলিপি রাষ্ট্রপতিকে পাঠিয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের আশঙ্কা মোদি ও শাহ যদি এ ধরনের আচরণ করতে থাকেন, তবে সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা রাখা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরীও আছেন। শঙ্কর বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, এটা কী হচ্ছে? সামরিক বাহিনীকে রাজনীতির কাজে ব্যবহার করা কেন? এর পরিণাম কি ভেবে দেখেছেন, যাঁরা ব্যবহার করছেন? বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, আপনারা যাঁরা নতুন ভোটার, তাঁরা রামলালার নামে শপথ নিন। আপনারা বিজেপিকে ভোট দেবেন। বিচারাধীন শীর্ষ আদালতে অযোধ্যা মামলা এখন ঝুলে আছে; কিন্তু শুক্রবার আরএসএসের পক্ষ থেকে অযোধ্যায় পূজার আয়োজন করার জন্য একটি আবেদন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে আরএসএসের ওই আবেদন তাত্ক্ষণিক খারিজ করে দেন। তাঁরা বলেছেন এখন পূজা হবে না।

রাফেল মামলা নিয়ে শীর্ষ আদালত ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য বিচারের জন্য গ্রহণ করেছেন। এই মামলাটি করেছেন বাজপেয়ি মন্ত্রিসভার দুই প্রবীণ মন্ত্রী সাংবাদিক অরুণ শৌরী, অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা এবং দিল্লির প্রবীণতম আইনজীবী প্রশান্তভূষণ। শীর্ষ আদালতের এই মনোভাব দেখে গেরুয়া বাহিনী তামাম রাষ্ট্রে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার জন্য জোর কদমে উঠেপড়ে লেগেছে। আর আক্রমণের লক্ষ্য একমাত্র রাহুল গান্ধী। রাহুল গান্ধী নির্বাচনী সভাগুলোতে বলেছেন, মোদি ও অমিত শাহরা যতই চেষ্টা করুন, ভারতকে আর বিভক্ত হতে দেব না, হিন্দু রাষ্ট্র করতে দেব না। এদিকে মোদি তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো নেহরু-গান্ধী পরিবারকে ভারতের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চান, যেমন ১৯৮৪ সালে রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয় ও রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধী ১৯৯১ সালের মে মাসে নির্বাচনী প্রচারে গেলে তাঁকেও হত্যা করা হয়। গত বুধবার (১০ এপ্রিল ২০১৯) রাহুল যখন আমেথিতে মনোনয়ন পেশ করে রোড শো করছিলেন, তখন সাতবার রাহুলের ওপরও আক্রমণ করা হয়। এই খবরে সারা দেশে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়।

এখন দেখা যাক ১০ এপ্রিল কী হয়েছিল। সেদিন রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তায় ফাঁক তৈরি হয়েছিল। রাহুল গান্ধী আমেথিতে মনোনয়নপত্র পেশ করার পর যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর মাথায় সাতবার লেজারের সবুজ আলো এসে পড়ে। ওই আলো ‘স্নাইপার গানের’ লেজার হতে পারে, কংগ্রেস নেতাদের তেমনই আশঙ্কা। যে স্নাইপার গান থেকে দূরে লক্ষ করে গুলি ছোড়া যায়, সেখানেই লেজারের ব্যবহার করা হয়। এ বিষয়ে কংগ্রেস নেতা আহমেদ প্যাটেল, জয়রাম রমেশ ও রণদীপ সুরজেওয়ালা একসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখে দাবি করেন, কোনো বিপদ থাকলে তার তদন্ত হোক। তাঁরা মনে করেন, এ ব্যাপারে উত্তর প্রদেশের পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি আছে। নিরাপত্তার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। যদিও কংগ্রেসের দাবি রাহুল গান্ধীর নিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তথা কেন্দ্রীয় সরকারের। কংগ্রেসের এই অভিযোগ খারিজ করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তবে সবুজ আলো পড়ার ব্যাপারটি খতিয়ে দেখতে সিপিজির ডিরেক্টরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, রাহুলের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি ছিল না, যদিও কংগ্রেস এই উত্তরে খুশি নয়।

প্রচারে আবার এসে গেছে নাগরিকপঞ্জি। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্যে এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের বাদ দিয়ে অন্য সব সম্প্রদায়ের মানুষকে এ দেশ থেকে বের করে দেব। তিনি বলেন, প্রথমেই বিদেশিদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়াব, হিন্দু ও বৌদ্ধদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তারা আমাদের সহোদর, তারা অনুপ্রবেশকারী নয়। অমিত শাহ আরো বলেছেন, ভয় পাবেন না; হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের আমরা এ দেশের সন্তান বলেই মনে করি।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরা বিজেপির নির্বাচনী নিয়ম ভঙ্গ করার কোনো দোষই দেখতে পাচ্ছেন না—এ অভিযোগ বিরোধীদের। সরকারি অনুমোদন না নিয়ে ‘নমঃ’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে মোদির জীবনী নিয়ে। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ভারতীয় কাঠামোর মূল অংশ। এখানে জাতপাতের কোনো অংশ নেই। গণতন্ত্রকে বজায় রাখা নাগরিকদের পবিত্র কর্তব্য ও দায়িত্ব। সুনীল অরোরা কি তা পালন করছেন? এ প্রশ্ন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবীদের। সুকুমার সেনের পথ কেন বর্তমান কমিশনাররা অনুসরণ করছেন না—এ প্রশ্ন ভারতবর্ষের বিশিষ্ট আইনজীবীদের।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিশ্লেষক

মন্তব্য