kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ক্ষয়িষ্ণু এক সাম্রাজ্য ও অ্যাসাঞ্জ

জন ওয়াইট

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্ষয়িষ্ণু এক সাম্রাজ্য ও অ্যাসাঞ্জ

সাংবাদিক ও সত্যোদ্ঘাটক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করেছে লন্ডন মেট্রো পুলিশ। ঘটনার দিনটি ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার কালপঞ্জিতে একটি কলঙ্কজনক দিন হয়ে থাকবে।

ইকুয়েডর আশ্রিত-দশার অবসান ঘটিয়ে মেট্রো পুলিশকে দূতাবাসে প্রবেশ ও অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তারের অনুমোদন দেয়। সেখানকার ছোট্ট এক কক্ষে সাত বছর আত্মাবিনাশী এক অবস্থায় ছিলেন তিনি। তাঁকে মার্কিন মুলুকে পাঠানোর বিষয়টি অপেক্ষমাণ। হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জগৎ-কুখ্যাত, নিষ্ঠুর কারা-ব্যবস্থায় নিষ্পেষিত হতে হবে তাঁকে।

আত্মতুষ্ট উদারপন্থীরা এখন যে ঘণ্টাধ্বনি শুনছেন তা আসলে তাঁদের চৈতন্যের মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি। তাঁদের অনেকে গার্ডিয়ানের মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় লেখক। গার্ডিয়ান একসময় অ্যাসাঞ্জকে কাজে লাগিয়েছে এবং পরে পরিত্যাগ করেছে। এসব আত্মগর্বী লোকের (যারা সেই ব্যবস্থার পদাতিক সেনা, যে ব্যবস্থা গণতন্ত্রের আলখাল্লা পরে স্বৈরতন্ত্রের চর্চা করে) জন্য জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, চেলসিয়া ম্যানিং ও এডওয়ার্ড স্নোডেন ‘অসত্যের যুগে সত্যের দূত’ হিসেবে হাজির হয়েছিলেন।

এসব ব্যক্তির সাহসিকতা ও ভব্যতা মূলধারার গণমাধ্যমের লিলিপুটীয় বাস্তবতায় অবস্থান করছে, যে বাস্তবতায় বাস করে খর্বিত নীতির লোকজন। যিনি পশ্চিমা আধিপত্যের (পশ্চিমা গণতন্ত্র নয়) নামে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র, হর্তাকর্তাদের জঘন্য অপরাধের তথ্য জনসমক্ষে এনেছেন, তাঁর পক্ষে না দাঁড়িয়ে, প্রতিবাদ না জানিয়ে তারা কোনো যোগ-চর্চার ক্লাসে যোগদান বা লন্ডনের নাইটসব্রিজে (ইকুয়েডরের দূতাবাস যেখানে) কেনাকাটা করতে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি ভাবিত।

এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ড আমাদের যে শিক্ষা দেয় তা হলো, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিশ্বাস করা আর সেই পরিবেশসম্মত আচরণ করার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। সত্যিকার মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাস করলে যা করতে হয়, অ্যাসাঞ্জ, ম্যানিং ও স্নোডেন তা-ই করেছেন। এটা করতে গিয়ে তাঁরা ‘অদৃশ্য শক্তি’কে টেক্কা দিয়েছেন।

ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সত্য উদ্ঘাটনের মূল্য যদি এ-ই হয়, তাহলে ক্ষমতার নামে সংঘটিত অপরাধের ব্যাপারে চুপ থাকার মূল্য কী!—মানবাত্মার ধ্বংস। সাহসিকতা ও কাপুরুষতার পার্থক্য উইলিয়াম শেকসপিয়ারের বাণীতে রয়েছে—‘কাপুরুষ মরার আগে মরে হাজারবার, বীর মরে একবারই।’ শুধু মৃতচিত্ত সুবিধাবাদীরাই বলবে, অ্যাসাঞ্জ, ম্যানিং বা স্নোডেন শেকসপিয়ার কথিত বীরের পর্যায়ে পড়েন না।

ব্যক্তি অ্যাসাঞ্জের গুরুত্ব নিয়ে অতিকথনের কিছু নেই। আবার এ কথা বলারও সুযোগ নেই, উইকিলিকস ছাড়া ‘জোর যার মুলুক তার’ ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিভ্রমের পরিস্থিতিতে জনমানস, বিশেষ করে পশ্চিমা জনমানস ভালো থাকবে, সুরক্ষিত থাকবে— মর্যাদাবোধ ও বৌদ্ধিক সত্তার বিপরীতে দাঁড়ালে সুরক্ষিত থাকার অবকাশ নেই।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন মুলুকের লাখো লোক ‘হিলারি আশা ও প্রগতির স্মারক’, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকর্ত্রী’ এমন ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত দুর্ভোগের শিকার হবে। তিনি বরং ‘উদার বিশেষত্ববাদ’ এবং নীতিহীনতার স্মারক। এই বিশেষত্ববাদ ও নীতিহীনতার কারণে অনেক দেশ ধ্বংসপ্রায়; যুক্তরাষ্ট্রে ও বিশ্বের অন্যত্র অনেক প্রাণ ঝরে গেছে—প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এত প্রাণ ঝরে না, এত লোকালয় ধ্বংস হয় না।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ভাগ্যে কী লেখা রয়েছে! মার্কিন ঔপন্যাসিক টমাস উলফ একটি শব্দবন্ধ চালু করেছিলেন—‘গডস লোনলি ম্যান’। এটি একটি প্রবন্ধের শিরোনাম। তাতে তিনি বলেছিলেন, একাকিত্ব—যদিও অব্যক্ত—সমাজের প্রত্যেক সদস্যের সাধারণ নিয়তি। একাকিত্ব বিরল ও আগ্রহোদ্দীক কোনো প্রপঞ্চ নয়, বরং মানব-অস্তিত্বের কেন্দ্রীয় বিষয় এবং অনিবার্য সত্য।

সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ববিষয়ক ধারণা বারবার উদ্ঘাটিত হয়েছে। আলবেয়ার কামুর ‘দি আইটসাইডার’ উপন্যাসে বিচ্ছিন্নতা বোধ ব্যক্ত করা হয়েছে মূল চরিত্র ম্যাকসোর বয়ানে। সে আত্মরক্ষার্থে একজনকে খুন করেছিল। সমাজের দৃষ্টিতে এটা খুব বড় বিষয় নয়; বরং সমাজ যেটিকে বড় করে দেখেছে সেটি হলো—মায়ের মৃত্যুর সময় ও শেষকৃত্যের সময় তার মধ্যে বিচলন ছিল না; বা ভুল করার জন্য অনুশোচনা ছিল না। এই নিরাসক্তি সমাজের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক, যার মানে হলো, সে গোটা ব্যবস্থার জন্য, এর মূল্যবোধ ও নৈতিকতার জন্য হুমকি।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এক ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের, রাজনৈতিক ব্যবস্থার কিয়দংশ বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত করেছেন। ক্ষয়িষ্ণু আধিপত্য ধরে রাখার জন্য উন্মাদসম মানসিকতায় যেসব জঘন্য অপরাধ, অনাচার সংঘটিত করছে এই সাম্রাজ্য, যদি (ম্যাকসোর মতোই) সেসব বিষয়ে সে নিরাসক্ত থাকে, তাহলে কী পরিণতি হতে পারে সে ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। 

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এখন সেন্ট্রাল লন্ডনের কোথাও এক পুলিশ স্টেশনে আছেন; হয়তো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। এ মুহূর্তে তিনি প্রকৃত অর্থেই ‘গডস লোনলি ম্যান’। ঈশ্বর তাঁর সহায় হোন।

লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও রেডিও সঞ্চালক

সূত্র : আরটি অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য