kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের দায়িত্ব

ডা. এম এ করীম

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের দায়িত্ব

অনেক দিন ধরে লেখালেখি বন্ধ করেছি, যেদিন আমার বাল্যবন্ধু না ফেরার দেশে চলে যান সেদিন থেকে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুরা আমাকে লেখার জন্য অনুরোধ করছেন। তাঁদের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। আর এ লেখার জন্য আমার ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। বিগত ছয়-সাত মাস আমি ঢাকার বাইরে অবস্থান করেছিলাম, জায়গাটার নাম হলো গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রাজেন্দ্রপুরে। একা বসে বসে ভালো লাগছিল না বলে প্র্যাকটিস শুরু করতে লাগলাম। ফি নিতাম নামমাত্র। যে যা দিতে পারত তাই। আগে ওষুধের দোকানের ভেতরে ছোট্ট জায়গায় বসতাম। দু-এক দিন পরেই একজন লোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো। আমি প্রেসক্রিপশন প্যাড কাছে নিয়ে কলম হাতে নিয়ে বললাম আপনার নাম কী? বয়স কত? কী অসুবিধা? লোকটি বলল না স্যার, আমি রোগী নই, আমাদের একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। আপনি তো আলট্রাসনোগ্রাফিও করেন। আমাদের আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনও আছে। আপনি রোগীও দেখতে পারেন সঙ্গে আলট্রাসনোগ্রাফিও করতে পারবেন। আপনাকে ওই সেন্টারে বসার জন্য অনুরোধ করতে এসেছি। আমি মনে মনে এ রকম একটা জায়গা খুঁজছিলাম, ভদ্রলোক আমাকে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলাম। পরের দিন উনি এসে সেই সেন্টারে আমাকে নিয়ে গেলেন। মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, আলট্রাসনোগ্রাম করলে আমাকে রোগীপ্রতি কত টাকা দেবেন। উত্তরে বলল, ‘স্যার, আমরা কোনো কোনো আলট্রাসনোগ্রাফিতে ১০০০, ১২০০ ও সর্বনিম্ন ৬০০ টাকা নিই।’ আর ডাক্তারদের দিই প্রতি আলট্রাসনোগ্রাফিতে সর্বনিম্ন ১২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। আমি অবাক হয়ে গেলাম। এত কম কেন? তার উত্তরে মালিক বলেন, ওষুধের দোকানদার যারা রোগী পাঠায়, তাদের দিতে হয় আলট্রাসনোগ্রাফিতে ৩০ শতাংশ ও প্যাথলজিতে দিতে হয় ৫০ শতাংশ। আমি বললাম, বাবা আমি দেড় শ টাকায় আলট্রাসনোগ্রাম করব না। আমি কষ্ট করে ১৫০ টাকা আর  ওষুধের দোকানদার শুধু বলে পাঠাবে সেখানে ৩০০ টাকা—এটা হবে না। উত্তরে বলল, স্যার, এখানকার নিয়মই তাই। দোষ শুধু মালিকের নয়, দোষ আমাদের চিকিৎসকদের, দোষ সমাজের, দোষ এড়াতে পারে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকার। যদিও বর্তমান সরকারের আমলেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে, স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে ভালো হওয়া সত্ত্বেত্ত এবং সরকারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমাদের চিকিৎসক, আমলা ও স্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা ব্যবসা করেন তাঁদের অসহযোগিতার কারণে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দেশের সব মানুষের জন্য এখনো পারেনি মানসম্মত চিকিৎসা দিতে। বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণ দালাল, ফড়িয়া ও ‘পিসি-সিস্টেম’। এর ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিনা মূল্যে চিকিৎসা পেতে নানামুখী জটিলতা রয়েছে সরকারি হাসপাতালেও। এসবের কারণে দেশের জনগোষ্ঠীর এক বড় অংশ স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে। যদিও আমরা জানি, গ্রামাঞ্চলে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল ও নগর অঞ্চলে থাকা নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নগর প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ডেলিভারি সার্ভিসেস প্রজেক্ট, এবং মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সরকারিভাবে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে এ সরকারের আমলে পরমাণু চিকিৎসাব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। রোগ নির্ণয় ও রোগ নিরাময়ে পরমাণু চিকিৎসা বিশ্বে যে কত বড় বিপ্লব ঘটিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্যান্সার এক মরণব্যাধি। এ রোগ নির্ণয়ে ও নিরাময়ে পরমাণু চিকিৎসা যে কত বড় ভূমিকা রেখেছে তা সবার জানা না থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জানা আছে। স্পেক্ট-সিটি (Spect-CT) ও পেট সিটি (PET CT), পেট এমআরআই (PET MRI) মেশিন বড় ভূমিকা রাখে—যা আমাদের দেশে পরমাণু শক্তি কমিশনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। কিন্তু  গ্রামাঞ্চল বা জেলা শহরে এর কোনো বিস্তার নেই। যদিও সরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এসব আওতার বাইরে। এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘সমতা ও সংহতিনির্ভর সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ১০০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। এদের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে। ফলে এ অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে এর সংখ্যা হবে প্রায় চার কোটি ৮০ লাখ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। এ দেশের একজন রোগীকে নিজেই বহন করতে হয় প্রায় মোট অংশের ৬৭ শতাংশ। সরকারের ২৬ শতাংশ, বাকি এনজিও, প্রাইভেট সেক্টর ও ইনস্যুরেন্স কম্পানি বহন করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে প্রতিবছর স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বাজেট হ্রাস পাচ্ছে যদিও টাকার অঙ্ক বড় মনে হয়। ধরা যাক চলতি বছরের কথা, মোট বাজেটের ৫.২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। হিসাবে আমাদের দেশে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারিভাবে ৩৭ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কমপক্ষে প্রয়োজন ৮৫ থেকে ১১২ ডলার। আমরা যদি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকাই, তা হলে কী দেখতে পাই—ভারত জনপ্রতি ৬১ ডলার, থাইল্যান্ড ২৮৫ ডলার, মালয়েশিয়া ৮১০ ডলার ব্যয় করে। নেপাল ৩৬ ডলার আর পাকিস্তান ৩৯ ডলার। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। আমার বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা চান। আর তা করার জন্য স্বাস্থ্য খাতের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০১২ সালে কর্মসূচি শুরু করেন। যদিও শুরু হয় ২০১২ সালে, তবে বাস্তবে কাজ শুরু হয় মূলত ২০১৫ সালে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে তা এখনো পূরণ হয়নি। সরকার যে সংস্কারের কাজটা হাতে নিয়েছে তার শুরুতেই আছে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন। ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন বাড়াতে হলে আমার কিছু প্রস্তাবনা আছে।

এক. চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে স্বাস্থ্যসেবাকে সামাজিকীকরণ। তার লক্ষ্যে প্রাথমিক কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

ক) স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির ব্যয় কমানো। খ) অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাণিজ্যিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধির ওপর নজরদারি করা। গ) যত্রতত্র মেডিক্যাল কলেজ  (বেসরকারি) ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনে কড়াকড়ি আরোপ করা। ঘ) বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল কর্তৃক নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়া প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে না দেওয়া। এ ব্যাপারে কঠিন আইন প্রয়োগ করা। সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে (বিশেষজ্ঞদের) ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস করার সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করা। চিকিৎসকদের ফি যোগ্যতা অনুযায়ী নির্ধারণ করা। বর্তমানে যে প্রথা চালু আছে (রেফারেল ফি) তা বন্ধ করা এবং সেই ফি রোগীর কাছ থেকে না নেওয়া। ওষুধ কম্পানি ওষুধ বিক্রির জন্য যেসব বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে তা কমিয়ে এনে ওষুধের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা। আমাদের দেশে যেসব ওষুধের দোকান আছে তার ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতিপত্র নেওয়া। একমাত্র ভিটামিন ছাড়া সব ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ করা। মেডিক্যাল শিক্ষা কারিকুলাম নতুন করে ঢেলে সাজানো। পরমাণু চিকিৎসা বিষয়ে সম্যক ধারণার জন্য (আন্ডার গ্র্যাজুয়েট লেভেলে) পরমাণু চিকিৎসাব্যবস্থা মেডিক্যাল শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা। সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি (যা আজও হয়নি) প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তাতে জাতি উপকৃত হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য