kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

কৃষ্ণবিবরের মুখোমুখি হলো মানবসভ্যতা

ড. কানন পুরকায়স্থ

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কৃষ্ণবিবরের মুখোমুখি হলো মানবসভ্যতা

১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হিচকক বক্তৃতায় স্টিফেন হকিং উল্লেখ করেছিলেন, ‘কৃষ্ণবিবর (Black Hole) এখন বিজ্ঞানের বিষয়, এটি আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। কৃষ্ণবিবরের অস্তিত্ব আছে। আমাদের ছায়াপথেই কয়েকটি আছে এবং অন্যান্য ছায়াপথে তার চেয়ে বেশি আছে।’ ১০ এপ্রিল ২০১৯ সালে ‘দ্য এস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল লেটারসের বিশেষ সংখ্যায় ছয়টি প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে The Event Horizion Telescope (EHT) বা ঘটনা দিগন্ত দুরবিন প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা জানালেন যে তাঁরা কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ছায়ার ছবি ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের উপসংহারে উল্লেখ করা হয় যে কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ছায়া তড়িৎ-চৌম্বক তরঙ্গ ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এর তাৎপর্য এই যে কৃষ্ণবিবরের অস্তিত্ব এত দিন গণিতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; কিন্তু মহাকাশে এ ধরনের ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু যে রয়েছে, তা প্রমাণিত হলো। জ্যোতির্বিদ্যার  মাধ্যমে এ ধরনের বস্তুকে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব এবং এ ধরনের ঘটনা দিগন্তের অস্তিত্ব মহাকাশের অন্যান্য ছায়াপথেও রয়েছে।

উল্লিখিত গবেষণাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি একই দিনে EHT-এর প্রকল্প পরিচালক শেফার্ড ডোলিম্যান (Sheperd Doeleman), যিনি হার্ভার্ড ও স্মিথমোনিয়ানের জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞান  কেন্দ্রে  কর্মরত, এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করলেন যে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দুই শতাধিক গবেষকের একটি দল গত দুই বছরের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে মেসিয়ার ৮৭ (M87) নামক ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি কৃষ্ণবিবরের ছবি ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ছবিটি তিনি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। বস্তুত ২০১৪ সালে  EHT সহযোগিতা প্রকল্প শুরু হয়। তবে প্রথম উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় ২০১৭ সালে। এই কৃষ্ণবিবর পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। মাইলের হিসাবে এই দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ৩৩০ ট্রিলিয়ন মাইল এবং এর ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন গুণ বেশি। মজার ব্যাপার হলো, এর আগে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে এই কৃষ্ণবিবর সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তার সঙ্গে EHT-এর মাধ্যমে ধারণকৃত ছবি প্রায় হুবহু মিলে যায়। তাই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা এই ফলাফলে অত্যন্ত উল্লসিত হন।

কৃষ্ণবিবরের ধারণা, প্রায় দুই শত বছরের অধিক পুরনো। ১৭৮৩ সালে জন মিচেল নামে কেমব্রিজের এক অধ্যাপক ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ফিলোসফিক্যাল ট্রানজ্যাকশনে এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন যে একটি নক্ষত্রের যদি যথেষ্ট ভর ও ঘনত্ব থাকে, তাহলে তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এত শক্তিশালী হবে যে আলো সেখান থেকে নির্গত হতে পারবে না। কারণ ওই নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত আলোকে মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে বেশিদূর যাওয়ার আগেই পেছনে টেনে নিয়ে আসবে। এ রকম অনেক নক্ষত্র মহাকাশে থাকতে পারে বলে মিচেল তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন এবং যাদের আমরা দেখব না। কারণ কোনো আলো তা থেকে নির্গত হতে পারে না; কিন্তু তাদের মহাকর্ষীয় বলকে অনুভব করা যাবে। সেসব বস্তুপিণ্ডকেই আমরা এখন কৃষ্ণবিবর বা ব্ল্যাকহোল বলি, যা পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার (John wheeler) ১৯৬৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন।

শেফার্ডের দল কিভাবে কৃষ্ণবিবরের ছবি ধারণ করল, সে বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। EHT প্রকল্পের আওতায় মোট ৮টি দুরবিন যন্ত্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা হয়। এ অঞ্চলগুলো হলো হাওয়াই, মেক্সিকো, আরিজোনা, স্পেনের নেভাদা, চিলি ও অ্যান্টার্কটিকা। সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণের কঠিন কাজটি সম্পাদন করেন জার্মানির  ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউট ফর রেডিও অ্যাসট্রোনমি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির হে স্টক অবজারভেটরি। তা ছাড়া ১৩টি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে।

যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এই দুরবিনযন্ত্রসমূহ মহাকাশকে পর্যবেক্ষণ করে, তাকে বলা হয় Very Long Baseline in Interferometry বা সংক্ষেপে VLBI. এই পদ্ধতি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের দুরবিনযন্ত্রের মধ্যে এককালবর্তী (synchronize) করে। পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১.৩ মিমি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে মহাকাশকে এই পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আপাতদৃষ্টে মনে হবে পৃথিবীর আকারের সমান একটি বৃহৎ দুরবিনযন্ত্র মহাকাশকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই দুরবিনের বিশ্লেষ ক্ষমতা (rcsolution) ২০ মাইক্রো আর্ক সেকেন্ড। গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী ১ আর্ক সেকেন্ড হচ্ছে এক ডিগ্রির ৩৬০০ ভাগের ১ ভাগ। সুতরাং ২০ মাইক্রো আর্ক সেকেন্ড হবে ২০–১০-৬ আর্ক সেকেন্ড। তুলনামূলকভাবে বলা যায় এই দুরবিন যন্ত্র দিয়ে ঢাকার বাতিঘর বইয়ের দোকানে বসে লন্ডনের ফয়েলস (Foyles) বইয়ের দোকানের বই পড়া যাবে। এ রকম হচ্ছে এর বিশ্লেষ ক্ষমতা। প্রতিদিন একেকটি দুরবিনযন্ত্র ৩৫০ টেরাবাইট উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

উপরিউক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে ধারণকৃত যে ছবি আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি তা হচ্ছে কৃষ্ণবিবরের ছায়া। কৃষ্ণবিবরকে মানুষের চোখে দেখা সম্ভব নয়। কারণ এ থেকে কোনো আলো বিচ্ছুরিত হয় না। কৃষ্ণবিবরের যে সীমান্ত রেখা, যাকে বলা হয় ঘটনা দিগন্ত (event horizon), তার আকার আমরা যে ছায়া দেখি তার চেয়ে ২.৫ গুণ ছোট। দৈর্ঘ্যের হিসাবে তা ৪০ বিলিয়ন কিমি। কৃষ্ণবিবরের আকার তার ভরের সমানুপাতিক। কৃষ্ণবিবরের ভর যত বেশি, তার ছায়া তত বড়। মেসিয়ার ৮৭ ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত কৃষ্ণবিবরের আকার ও ভর সম্পর্কে তাত্ত্বিকভাবে যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।

উল্লেখ্য, আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাকর্ষ বল আলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটন সূর্যগ্রহণ নিয়ে পরীক্ষা করে আইনস্টাইনের এই তত্ত্বের প্রমাণ পান। তার ১০০ বছর পর ২০১৯ সালে কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্ত নিয়ে আইনস্টাইনের আরেকটি তত্ত্ব প্রমাণিত হলো। ১৯০৫ সালে প্রণীত আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিত তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো বস্তুকণা আলোর চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন হতে পারবে না, অর্থাৎ সর্বোচ্চ গতি প্রতি সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটারের বেশি নয়। তাই একটি নক্ষত্র ধীরে ধীরে মহাকর্ষ বলের কারণে সংকুচিত হলেও তা থেকে নিঃসৃত আলোর গতি সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটারের বেশি হয় না। যার ফলে একপর্যায়ে কোনো কিছুই নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এ কারণই EHT থেকে প্রাপ্ত ছবির কেন্দ্রে আমরা কালো আংটি দেখতে পাই। কিন্তু তার পাশে রয়েছে উজ্জ্বল অংশ। এই অংশের ব্যাসার্ধ কার্ল সোয়াজ চাইল্ড গাণিতিকভাবে পরিমাপ করেছেন। স্টিফেন হকিং গাণিতিকভারে দেখিয়েছেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কারণে কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্ত থেকে বিকিরণ বেরিয়ে আসতে পারে, যাকে আমরা বলি ‘হকিং রেডিয়েশন’। এই কারণেই হকিং বলেছেন, ‘কৃষ্ণবিবর কৃষ্ণ নয়’। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী কার্লো রভেল্লি (Corlo Rovelli) উল্লেখ করেছেন, কৃষ্ণবিবরের ভর এত বেশি যে এটি সময়কে শ্লথ করে এমনভাবে যে ঘটনা দিগন্তে সময় সম্পূর্ণরূপে স্থির হয়ে যায়।

কৃষ্ণবিবর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের বর্তমান সময়ের দিকে যেতে হবে, যা অসম্ভব। কারণ আমরা সব সময় ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি। সর্বোপরি EHT প্রকল্পের একটি লক্ষ্য হচ্ছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের কোনো সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখা। শেফার্ড জানিয়েছেন যে এ পর্যন্ত তারা যে উপাত্ত পেয়েছেন তাতে প্রমাণিত হয় যে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব সঠিক। এই প্রকল্পের পরবর্তী কাজ হচ্ছে ‘সেগিটারিয়াস-এ’ ছায়াপথের কেন্দ্রে যে কৃষ্ণবিবর রয়েছে তার ছবি সংগ্রহ করা। এটি মেসিয়ার ৮৭-এর কৃষ্ণবিবর থেকে এক হাজার গুণ ছোট এবং এর মধ্যের পদার্থসমূহ ঘটনা দিগন্তে অনেক দ্রুতগতিতে আবর্তিত হচ্ছে। এর ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চিত হলে কৃষ্ণবিবর সম্পর্কে আরো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

লেখক : গ্রন্থকার, বিজ্ঞানী ও উপদেষ্টা, যুক্তরাজ্য

মন্তব্য