kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

লিবিয়া যুদ্ধের পরিণতি কী!

রিচার্ড গলুস্টিয়ান

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লিবিয়া যুদ্ধের পরিণতি কী!

এই গ্রীষ্মের মধ্যে যে-ই অধিকার করুক, অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে ত্রিপোলি তার জন্য বড় পুরস্কার নিঃসন্দেহে। অনেকের ধারণা, এরপর হয় স্থিতিশীলতা আসবে অথবা চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে—সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ বাধবে।

লিবিয়ার বিরুদ্ধ পক্ষগুলো শান্তি-সমঝোতা করবে, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বেশি আশা করার কিছু নেই। এ নৈরাশ্যের একটি কারণ, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের (এবং তাঁর লিবিয়াবিষয়ক দূত গাসান সালামির) ব্যর্থ ত্রিপোলি সফর।

মহাসচিব গত বৃহস্পতিবার ত্রিপোলিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। জাতিসংঘ মনোনীত ফায়েজ সিরাজের ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’-এর সঙ্গে এ মাসের মাঝামাঝি অনুষ্ঠেয় ‘জাতীয় সংহতি সম্মেলন’-এর বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তাঁরা ত্রিপোলিতে হাজির হয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গ উঠলে তাঁরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কারণ একই দিনে ফিল্ড মার্শাল খলিফা হাফতার তাঁর বাহিনী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (এলএনএ) ত্রিপোলির দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন।

লিবিয়া ছাড়ার সময় গুতেরেস যে কথা বলেন, তাতে নৈরাশ্য স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, ‘দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে এবং ভীষণ উদ্বিগ্ন অবস্থায় আমি লিবিয়া ছেড়ে যাচ্ছি। তার পরও আশা করি, ত্রিপোলি ও আশপাশে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব।’

‘প্রধানমন্ত্রী’ সিরাজ ও ফিল্ড মার্শাল হাফতার গত মাসে ক্ষমতা ভাগাভাগি বিষয়ক সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য আবুধাবিতে বসেছিলেন। যা হোক, বুধবার সন্ধ্যায় হাফতারের বাহিনী ও সিরাজের অনুগত মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। বৃহস্পতিবার সকালে এলএনএ জানায়, গারিয়ান শহর দখল করেছে তারা। শহরটি ত্রিপোলি থেকে প্রায় ৫০ মাইল দক্ষিণে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গুতেরেস সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানান। তিনি তাঁর অভিমত পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘চলমান গৃহযুদ্ধের কোনো সামরিক সমাধান নেই।’ প্রসঙ্গত, আট বছর ধরে লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে কোনো জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব নয়।’

হাফতার তাঁর বাহিনীকে ত্রিপোলি অভিমুখে ‘বিজয় অভিযান’ শুরুর নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘অন্যায়ের পক্ষের দখলে থাকা ভূমি কাঁপিয়ে দাও। ত্রিপোলির ডাক আমরা শুনতে পাচ্ছি।’ শান্তির শাসন কায়েম করা হবে; সাদা পতাকা যারা ওড়াবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত—এ কথা বলে তিনি ভাষণ শেষ করেন।

স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত, লিবিয়ায় মূল প্রতিপক্ষ দুটি; দুটি সরকার। একটি ফায়েজ সিরাজের সরকার, যার নাম জাতীয় ঐক্য সরকার। এটি আন্তর্জাতিক মহল কর্তৃক মনোনীত ও স্বীকৃত। হ্যাঁ, এটি জাতিসংঘ কর্তৃক মনোনীত, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত নয়। এর ভিত্তি ত্রিপোলি। প্রতিপক্ষ একটি সরকার আছে, যার ভিত্তি পূর্বাঞ্চলে—বেনগাজিতে (ও তবরুকে)। এটি নির্বাচিত সরকার (নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত)। ফিল্ড মার্শাল খলিফা হাফতার এ সরকারের সামরিক বাহিনীর প্রধান।

সাম্প্রতিক অভিযানের পর দক্ষিণের বিস্তৃত এলাকা হাফতারের বাহিনীর দখলে এসেছে। মূলত স্থানীয় মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমঝোতা করে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে; খুব বেশি যুদ্ধের প্রয়োজন পড়েনি। প্রশ্ন হচ্ছে, হাফতার জিনতান ও মিসরাতার মিলিশিয়াদের সঙ্গেও স্থায়ী ও ভরসাযোগ্য চুক্তি করবেন কি না বা করেছেন কি না। এসব মিলিশিয়া গোষ্ঠী এখন ত্রিপোলির শাসকদের বেতনভুক্ত। যদি এসব মিলিশিয়ার সঙ্গে স্থায়ী কোনো চুক্তি হয়, তাহলেই হাফতার ত্রিপোলি দখল করতে পারবেন; ধারণা করা যায় আগামী জুনের মধ্যে। তখন তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করতে পারবেন।

অনেকেই একটি বিষয় বুঝতে ভুল করে। হাফতারের বয়স এখন ৭৫ বছর, ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখার বাসনা তাঁর নেই। তিনি বরং আনুষ্ঠানিক প্রধানের পদ পেতেই পছন্দ করবেন, যেমন আলংকারিক প্রেসিডেন্ট পদ। তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য আবদুল হাকিম বেলহাজির মতো সাবেক জঙ্গি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নির্মূল করা। ত্রিপোলির প্রকৃত ক্ষমতা এখন এদের হাতেই।

ভুলে গেলে চলবে না, হাফতার মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পেয়ে যাচ্ছেন। এসব দেশের বিবেচনায় তিনিই লিবিয়ার সম্ভাব্য নেতা। সার্বিক বিবেচনায় রাশিয়া ও ফ্রান্সের ‘সমর্থন’ও পাচ্ছেন তিনি। এমন ধারণাও করা যেতে পারে, আগের সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রও তাঁকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

উপসংহারে বলা যায়, পশ্চিমের মিলিশিয়াদের নিষ্ক্রিয় করতে পারলে বা পক্ষে ভেড়াতে পারলে লিবিয়ার শেষ লড়াই ত্রিপোলিতেই হতে পারে। এ লড়াইয়ে হাফতার জয়ী হতে পারেন এবং আশা করা যায়, লিবিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

লেখক : বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিশ্লেষক

২০১১ সাল থেকে লিবিয়াবাসী

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য