kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

রাকসু নির্বাচনের বাস্তবতা এবং একটি পর্যবেক্ষণ

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাকসু নির্বাচনের বাস্তবতা এবং একটি পর্যবেক্ষণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে তোড়জোড় লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে গত ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রস্তুতি শুরু হলেও নির্বাচনের পরিবেশ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হওয়ায় এখানে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে—এমন প্রত্যাশা থাকাটা স্বাভাবিক। আর সেই প্রত্যাশিত পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এরই মধ্যে রাকসু নির্বাচন সম্পর্কিত একটি কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ে সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। রাবি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনের আলো মিটমিট করে জ্বলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে আলো উদিত হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই নিভে না যায় সেই প্রত্যাশা গোটা দেশের ছাত্রসমাজের। আর সেই প্রেক্ষাপট থেকেই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ বছর পর ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির মাধ্যমে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়ার ভিত্তিতে ছাত্র নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রত্যাশা আমাদের সবার।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ছাত্রসংসদ নির্বাচন কেমন হয় সে বিষয়ে কোনো বাস্তব ধারণা মোটেই ছিল না। আর সেই বাস্তবতা এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ডাকসু নির্বাচনে সরকারদলীয়দের প্রাধান্যসহ যে প্রহসনের নির্বাচনের অভিযোগ উত্থিত হয়েছে, তা যেন রাকসুতে না হয় সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের যে উপলব্ধি নতুনভাবে শুরু হয়েছে, তা অঙ্কুরেই হোঁচট খেলে ভালো ও গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতির পুনর্জন্ম কোনোভাবেই ঘটবে না।

দীর্ঘদিন রাকসু নির্বাচন না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই জানে না যে রাকসু কী এবং কেন। এমনকি রাকসু ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথায় অবস্থিত, সেটিও অনেকেই জানে না। অনেকের কাছে রাকসু ভবনটি সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কারণ রাকসুর নিজস্ব কার্যক্রমের পরিবর্তে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ওই ভবনটিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় রাকসু ফি বাবদ একটি নির্দিষ্ট টাকা পরিশোধ করলেও এর যথাযথ সুফল আসেনি। অথচ সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের কাছে এই সংগঠনের অনেক তাৎপর্য রয়েছে। এ কথা স্বীকার্য যে একসময় ছাত্ররাজনীতি বড় বড় রাজনৈতিক নেতা তৈরির সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন তা আর হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্ররাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ ছাত্রসংসদ না থাকা, নির্বাচন না হওয়া। এমনকি যথাযথ প্রতিনিধিত্ব গড়ে না ওঠা। বিশেষ করে ক্ষমতার আধিপত্য, বড়াই-লড়াই, হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাটুকারিতা, পকেট নেতা তৈরি, প্রশাসনের অন্যায্য সমর্থন প্রভৃতি কারণে ছাত্ররাজনীতির যথাযথ বিকাশ হচ্ছে না। ছাত্রসংগঠনগুলোর কমিটি গঠনের জন্য এখন যোগ্যতার পাশাপাশি চলে লাখ লাখ টাকার রাজনৈতিক বাণিজ্য। এই অপরাজনীতির দাপটে ক্রমেই ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠছে অসৎ ও অশুভ। আর এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ছাত্রদের ওপর। নেতা নির্বাচনে যেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতের কোনো মূল্য নেই, সেহেতু অপতৎপরতা বন্ধ হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। আর এ কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ন্যায্য দাবি কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো কোনো সময় তাদের (সাধারণ শিক্ষার্থী) ওপর চলে জুলুম-অত্যাচার। এসব কারণে বর্তমান সময়ে মেধাবীরা ছাত্ররাজনীতি পরিহার করছে। ফলে ক্রমেই মেধাশূন্য হয়ে উঠছে ছাত্ররাজনীতি। আর রাবির ছাত্ররাজনীতিও উল্লিখিত পর্যবেক্ষণের বাইরে নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ ১৯৮৯-৯০ মেয়াদকালে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হওয়ার পর প্রায় তিন দশক ধরে বন্ধ রয়েছে রাকসু নির্বাচন। রাবির বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর এ বিষয়ে আলোচনার একটি উদার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এর পরপরই ২০১৭ সালের ১৬ মে রাকসু নির্বাচনসহ আরো ২৪ দফা দাবিতে বর্তমান উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছিলেন ছাত্রলীগের নেতারা। এর পর থেকে ক্রমেই রাকসু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই ইতিবাচক প্রবণতার পথ ধরেই দ্রুততম সময়ে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

১৯৬২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই গঠনতন্ত্রে উল্লেখ ছিল, ‘বাস্তব জীবনে কর্মদক্ষতা, যোগ্য নাগরিক ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুমোদিত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বক্তৃতা, লিখন, বিতর্ক ইত্যাদিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার জন্য শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে কাজ করবে রাকসু।’ এ ছাড়া মানবিক-সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আয়োজনও ছিল রাকসুর কর্মসূচিতে। কিন্তু রাকসু নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকায় সংগঠনের এসব কার্যক্রম আর লক্ষ করা যায় না। ফলে ক্যাম্পাসে গড়ে উঠছে অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির প্রতিযোগিতা।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ে রাবিতে লক্ষণীয় মাত্রায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে যে আবাসিক হলে বৈধভাবে সিট পাওয়া যত না কঠিন তার চেয়ে নিজের বৈধ সিটে উঠতে পারাটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর সহযোগিতা ছাড়া হলে উঠতে পারাটা খুব সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো কোনো হলের প্রাধ্যক্ষ নিজেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলে উঠতে পারার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে থাকেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সিট বাণিজ্যের মতো অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলেও তা প্রকাশ করার সামর্থ্য অনেকেরই নেই।

উল্লেখ্য, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মানের নির্বাচন হলে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটব্যাংক ছাড়া কোনো ছাত্রনেতার নির্বাচনে বিজয় অর্জন করার কোনো সম্ভাবনা নেই। নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে কিংবা নির্যাতন করলে চলবে না, বরং শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণের মাধ্যমেই ছাত্রনেতারা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিতে পারেন। মূলত ছাত্রনেতাদের লক্ষ রাখতে হবে, কিভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয় করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যায়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য